ইতিহাস গড়ার দ্বারপ্রান্তে ছিল মিশর। তবে ৭৮ মিনিট পর্যন্ত ২-০ গোলে পিছিয়ে থাকা বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা জাদুকরী পারফরম্যান্সে ৩-২ ব্যবধানে জিতে কোয়ার্টার ফাইনাল নিশ্চিত করেছে। তবে ম্যাচটিতে রেফারি ফ্রাঁসোয়া লেটেক্সিয়ের এবং ভিএআর (ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি)–এর সিদ্ধান্ত নিয়ে চলছে বিতর্ক। বিশেষ করে উভয় দলের গোলের আগমুহূর্তে ফাউল হলেও, কেবল মিশরের গোল বাতিল করা হলো কেন সেই প্রশ্ন উঠেছে।
প্রায় একই বিষয়ে কেন দুটি ভিন্ন সিদ্ধান্ত এলো সেটাই ব্যাখ্যা করেছেন ইংলিশ ফুটবলের শীর্ষ পর্যায়ে এক যুগের বেশি সময় রেফারিং করা এবং ভিএআর হিসেবেও দায়িত্ব পালন করা অ্যান্ডি ডেভিস। ক্রীড়াভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ইএসপিএন আর্জেন্টিনা-মিশর ম্যাচের বিতর্কিত সিদ্ধান্ত নিয়ে এই বিশ্লেষণ দাঁড় করিয়েছে।
যে কারণে মিশরের গোল বাতিল
তখন ১-০ গোলে এগিয়ে মিশর। ৬২ মিনিটে তাদের অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার মোস্তফা জিকো দারুণ এক গোলে দ্বিগুণ লিডের উল্লাসে মেতেছিলেন। কিন্তু ভিএআর দেখে সেই গোল বাতিলের সিদ্ধান্ত জানান রেফারি। মূলত মিশরের আক্রমণে যাওয়ার আগমুহূর্তে তাদের ডিফেন্ডার মারওয়ান আত্তিয়া ফাউল করেছিলেন আর্জেন্টিনার লিসান্দ্রো মার্টিনেজকে। ভিএআর থেকে রেফারিকে দৃশ্যটি মনিটরে দেখতে বলা হলেও, তিনি রিভিউ শেষে গোল বাতিলের রায় দেন।
গোল বাতিলের ব্যাখ্যায় ভিএআর বলছে– ফাউলের সময় মার্টিনেজের জার্সি টেনে ধরে তার পায়ের ওপর পা দিয়ে চেপে ধরেছিলেন আত্তিয়া। যা ফাউল হিসেবে বিবেচিত হয় এবং ভিএআরের সেই সিদ্ধান্তে একমত হওয়া সাপেক্ষে ফরাসি রেফারি লেটেক্সিয়ে গোল বাতিল করে দেন।
ডেভিসের ব্যাখ্যা : আর্জেন্টিনা আক্রমণ বিনষ্ট হওয়ার পেছনে ভূমিকা ছিল আত্তিয়ার স্পষ্ট ফাউল। সেই ফাউলের সরাসরি ফল হিসেবেই মিশর গোলটি করেছিল। তাই নিয়ম অনুযায়ী গোলটি বাতিল করাই সঠিক সিদ্ধান্ত। যদিও ঘটনাটি বক্সের বেশ বাইরে মিশরের অর্ধে ঘটেছিল বলে এ নিয়ে বিতর্ক হতে পারে। কিন্তু একই আক্রমণপর্বে যদি কোনো ফাউলের সরাসরি পরিণতিতে গোল হয়, তাহলে সেই গোল বাতিল করতে হয়। রেফারিকে যখন একসঙ্গে জার্সি টানা ও পায়ে পা রাখার দৃশ্য দেখানো হয়, তখন তার পক্ষে আগের সিদ্ধান্ত (গোল) বহাল রাখা অসম্ভব ছিল।
আর্জেন্টিনার গোল যেভাবে বৈধ
শেষদিকে দুটি ফাউলের আবেদন জানায় মিশর। দুটিই ছিল আর্জেন্টিনার বক্সের ভেতর। যার মধ্যে একটি যোগ করার সময়ের দ্বিতীয় মিনিটে এবং তাদের দাবি করা ফাউলের পরই এনজো ফার্নান্দেজের গোলে ৩-০ ব্যবধানে লিড নেয় আর্জেন্টিনা। প্রথম ফাউলের ঘটনায় মিশরের হামদি ফাতির জার্সি টেনে ধরতে দেখা যায় আর্জেন্টাইন মিডফিল্ডার অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টারকে। তিনি পড়ে গেলেও রেফারি ফাউল ধরেননি। এরপর আর্জেন্টিনার পেনাল্টি এলাকায় ঢোকার সময় মোহামেদ সালাহকে ফাউল করেন হুলিয়ান আলভারেজ। সেটিও ফাউল হিসেবে বিবেচিত হয়নি।
পরে ভিএআর ঘটনা দুটির ব্যাখ্যায় জানিয়েছে, ম্যাক অ্যালিস্টারের ঘটনাটি মাঠের যেখানে ঘটেছিল, সেখানে এক অদ্ভুত ‘দ্বিমুখী পরিস্থিতির’ তৈরি হয়। সেখানে রেফারি কোনো সিদ্ধান্ত বদলালে তার প্রভাব একসঙ্গে দুটি ক্ষেত্রে পড়ত। আর্জেন্টিনার গোল বাতিল এবং মিশরের পেনাল্টি প্রাপ্তি। তবে আর্জেন্টাইন ফুটবলারদের (অ্যালিস্টার ও আলভারেজ) আচরণ ও খেলার ধরন বিশ্লেষণ করে ভিএআর নিশ্চিত হয় যে, কোনো সিদ্ধান্তেই হস্তক্ষেপ করার মতো বড় কোনো ভুল হয়নি। তাই তারা দুটি ঘটনাই পরীক্ষা করে রেফারির আগের সিদ্ধান্তই বহাল রাখেন।
ডেভিসের যুক্তি : রেফারি ও ভিএআরের জন্য ম্যাচের শেষ অংশটি কঠিন ছিল। তবে দুটি ক্ষেত্রেই তারা সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে মতামত ডেভিসের। প্রথমত, ম্যাক অ্যালিস্টার ফাতির জার্সি ধরে ঝুঁকি নিয়েছিলেন। কিন্তু সেটি ছিল খুবই অল্প সময়ের জন্য। এতে ফাতির বল পাওয়ার সম্ভাবনা বা আক্রমণে অংশ নেওয়ার ওপর উল্লেখযোগ্য প্রভাব পড়েনি। তাই এটিকে পেনাল্টি দেওয়ার মতো ফাউল বলা যায় না।
একইভাবে সালাহকে পেনাল্টি না দেওয়ার সিদ্ধান্তও সঠিক। ওই ঘটনায় সালাহ ফাউলের চেয়ে পেনাল্টি আদায়ের চেষ্টা বেশি করেছেন। আলভারেসের পক্ষ থেকে স্পষ্ট কোনো ফাউল ছিল না। দুজনের বুট একে অপরের সঙ্গে লাগে এবং দুজনের গতির কারণেই সেই সংস্পর্শ তৈরি হয়। সালাহ অপ্রয়োজনীয়ভাবে মাটিতে পড়ে যান।