সংসারের অভাব, পুঁজির সংকট আর প্রতিদিনের অনিশ্চয়তার মধ্যেও ছোট ছোট পুকুরকে ঘিরে বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখেন গ্রামের অনেক মৎস্যচাষি। কারও কাছে পুকুর পরিবারের শেষ ভরসা, কারও কাছে মাছ চাষ সন্তানদের মুখে দুবেলা খাবার তুলে দেওয়ার সংগ্রাম। এমন প্রান্তিক মানুষের হাতে সরকারি সহায়তার উপকরণ পৌঁছে গেলে তা শুধু মাছ চাষের সামগ্রী থাকে না; হয়ে ওঠে নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর শক্তি।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে ইউনিয়ন পর্যায়ে মৎস্য চাষ প্রযুক্তি সেবা সম্প্রসারণ প্রকল্পের তৃতীয় পর্যায়ের আওতায় রাজশাহীর পবা উপজেলায় গৃহস্থলী পুকুরে প্রদর্শনীর উপকরণ সামগ্রী বিতরণ করা হয়েছে। বুধবার (৮ জুলাই) সকালে পবা উপজেলা পরিষদ চত্বরে পাঁচজন সুফলভোগীর হাতে এসব উপকরণ তুলে দেন উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. ইবনুল আবেদীন। সিনিয়র উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তার কার্যালয়, পবার আয়োজনে এ কার্যক্রম অনুষ্ঠিত হয়।
প্রতিজন সুফলভোগীকে চার হাজার কৈ মাছের পোনা, ৪০ কেজি মাছের খাদ্য, সাইনবোর্ড ও দুটি খুঁটি, ৩০ কেজি চুনসহ লাউ, চালকুমড়া, লেবু, মরিচ, ওল ও পেঁপের চারা দেওয়া হয়। প্রতিজনের জন্য ৩০ হাজার টাকা মূল্যমানের উপকরণ বরাদ্দ করা হয়েছে। সে হিসাবে পাঁচজন সুফলভোগীর মাঝে মোট ১ লাখ ৫০ হাজার টাকার উপকরণ বিতরণ করা হয়।
উপকরণ হাতে পেয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন বড়গাছী ইউনিয়নের মৎস্যচাষি সুফিয়া বেগম। তিনি বলেন, তাঁর ৩০ শতক আয়তনের গৃহস্থলী কাজে ব্যবহৃত পুকুরে তেলাপিয়া মাছ চাষের প্রদর্শনী খামার রয়েছে। সংসারের অভাব-অনটনের মধ্যেও অনেক কষ্ট করে মাছ চাষ ধরে রেখেছেন তিনি। কারণ এই পুকুরই তাঁর পরিবারের বেঁচে থাকার বড় ভরসা। তিনি আরও বলেন, “অনেক সময় পুঁজি ও প্রয়োজনীয় উপকরণের অভাবে চোখের সামনে স্বপ্ন ভেঙে যেতে দেখেছি। আজ এই উপকরণ হাতে পেয়ে মনে হচ্ছে, কষ্টের দিনগুলো কিছুটা হলেও কমবে। এই সহায়তা আমার মতো সাধারণ মৎস্যচাষির জন্য নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর সাহস।”
দর্শনপাড়া ইউনিয়নের তিসলাই এলাকার মৎস্যচাষি মো. রফিকুল ইসলামও একইভাবে কৃতজ্ঞতা জানান। তাঁর ৪০ শতক আয়তনের গৃহস্থলী পুকুরে তেলাপিয়া মাছ চাষের প্রদর্শনী খামার রয়েছে। তিনি বলেন, “ঋণ আর সংসারের টানাপোড়েনের মধ্যেও মাছ চাষ ধরে রেখেছি। প্রয়োজনীয় উপকরণের অভাবে অনেক সময় মাছের ক্ষতি হতে দেখেছি। আজ মনে হচ্ছে, আমাদের মতো সাধারণ মৎস্যচাষির কষ্টের কথা কেউ শুনেছে।”
উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. ইবনুল আবেদীন বলেন, প্রান্তিক মৎস্যচাষিদের উৎপাদন বৃদ্ধি ও অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করে তুলতেই সরকারের এ উদ্যোগ। গৃহস্থলী পুকুরগুলো সঠিকভাবে কাজে লাগানো গেলে পারিবারিক পুষ্টি চাহিদা পূরণের পাশাপাশি বাড়তি আয়ও সম্ভব। তিনি বলেন, “সুফলভোগীরা প্রশিক্ষণ ও পরামর্শ অনুযায়ী এসব উপকরণ ব্যবহার করলে সফল প্রদর্শনী খামার গড়ে উঠবে। এই সহায়তা তাঁদের জীবনে বাস্তব পরিবর্তন আনুক, সেটিই আমাদের প্রত্যাশা।”
অনুষ্ঠানে জেলা মৎস্য দপ্তরের সিনিয়র সহকারী পরিচালক ড. অসীম কুমার ঘোষ, সহকারী পরিচালক আয়েশা খাতুন, পবা উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক সুলতান আহমেদ, সিনিয়র উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. ওয়ালী উল্লাহ মোল্লাহ এবং সিনিয়র উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তার কার্যালয়ের ফিল্ড অ্যাসিস্ট্যান্ট তাকির হোসেন উপস্থিত ছিলেন।
সংশ্লিষ্টরা জানান, গৃহস্থলী পুকুরভিত্তিক প্রদর্শনী কার্যক্রম সফল হলে স্থানীয় পর্যায়ে মাছ উৎপাদন বাড়বে, পরিবারভিত্তিক পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে এবং প্রান্তিক মৎস্যচাষিদের আয়ের নতুন পথ তৈরি হবে।