রেলওয়ের মহাপরিচাক আফজাল হোসেনের প্রত্যক্ষ প্রভাব ও সরাসরি হস্তক্ষেপেই উচ্চমূল্যে স্পেয়ার পার্টস কেনার এ অনিয়ম সংঘটিত হয়েছে। দুদক নথিপত্র তলব করার পরও তিনি প্রধান সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রকের ওপর সংশ্লিষ্ট প্রভাবশালী ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে দ্রুত চুক্তি স্বাক্ষরের জন্য ক্রমাগত চাপ প্রয়োগ করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
সূত্রগুলোর দাবি, তদন্ত চলমান থাকা অবস্থায় তড়িঘড়ি করে চুক্তি সম্পাদিত হলে সরকারি অর্থের সম্ভাব্য ক্ষতির পাশাপাশি দুদকের অনুসন্ধানও বাধাগ্রস্ত হতে পারে। তাই অনুসন্ধান শেষ না হওয়া পর্যন্ত কার্যাদেশ ও চুক্তি স্বাক্ষরের সব কার্যক্রম স্থগিত রাখার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
তবে দুদকের প্রকাশিত চিঠিতে মহাপরিচালক আফজাল হোসেনের নাম বা তাঁর বিরুদ্ধে চাপ প্রয়োগের অভিযোগ উল্লেখ নেই।
বাংলাদেশ রেলওয়ের জন্য প্রায় এক কোটি টাকা আন্তর্জাতিক বাজারমূল্যের ডিজেল ইঞ্জিন ডয়েজের স্পেয়ার পার্টস আট কোটি টাকায় কেনার উদ্যোগ নিয়ে বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশের পর বিষয়টি অনুসন্ধানে নেমেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। সংবাদ প্রকাশ ও দুদকের হস্তক্ষেপের ফলে সরকারের প্রায় সাত কোটি টাকার সম্ভাব্য আর্থিক ক্ষতি প্রতিরোধ হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো দাবি করেছে।
দুদকের প্রধান কার্যালয় থেকে গত ২২ জুন ২০২৬ তারিখে বাংলাদেশ রেলওয়ের প্রধান সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রক, পাহাড়তলী, চট্টগ্রাম বরাবর পাঠানো এক চিঠিতে আলোচিত ক্রয়প্রক্রিয়ার সব ধরনের নথি ও তথ্য তলব করা হয়েছে।
দুদকের চিঠিতে উল্লেখ করা অভিযোগের সংক্ষিপ্ত বিবরণ অনুযায়ী, প্রায় এক কোটি টাকা বাজারমূল্যের ভারতীয় ডিজেল ইঞ্জিনের স্পেয়ার পার্টস আট কোটি টাকায় কেনার উদ্যোগ নেওয়ায় সরকারের প্রায় সাত কোটি টাকা ক্ষতির আশঙ্কা সৃষ্টি হয়। সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার এবং রেলওয়ের কয়েকজন কর্মকর্তা পরস্পরের যোগসাজশে দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার ও সরকারি অর্থ আত্মসাতের উদ্দেশ্যে এ ক্রয়প্রক্রিয়া এগিয়ে নিয়েছেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
অভিযোগটি অনুসন্ধান করে প্রতিবেদন দাখিলের জন্য দুদকের একজন সহকারী পরিচালককে অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। দুর্নীতি দমন কমিশন আইন ও বিধিমালার সংশ্লিষ্ট ধারায় এসব রেকর্ড তলব করা হয়।
দুদকের চিঠিতে বাংলাদেশ রেলওয়ের সরঞ্জাম বিভাগের একাধিক টেন্ডার আইডির মাধ্যমে ডিজেল ইঞ্জিন ডয়েজের স্পেয়ার পার্টস কেনার জন্য খোলা চারটি ক্রয় নথির সত্যায়িত অনুলিপি চাওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে দরপত্র আহ্বান ও অনুমোদনের নথি, বাজারদর যাচাই, অনুমোদিত বার্ষিক ক্রয় পরিকল্পনা, কারিগরি স্পেসিফিকেশন, বিডিং ডকুমেন্ট, দরপত্র উন্মুক্তকরণ সংক্রান্ত তথ্য, দরপত্র মূল্যায়ন প্রতিবেদন এবং কার্যাদেশ প্রদানের নথি।
এ ছাড়া সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের ট্রেড লাইসেন্স, আয়কর ও ই-টিআইএন সনদ, ভ্যাট নিবন্ধন বা বিআইএন, জাতীয় পরিচয়পত্র, অভিজ্ঞতার সনদ, নোটিফিকেশন অব অ্যাওয়ার্ড বা এনওএ, চুক্তিপত্র, মালামাল সরবরাহ ও গ্রহণসংক্রান্ত কাগজপত্রসহ যাবতীয় নথি চাওয়া হয়েছে। আগামী ২২ জুলাই ২০২৬ তারিখের মধ্যে অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তার কাছে এসব তথ্য সরবরাহের নির্দেশ দেওয়া হয়।
রেলওয়ের সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, আলোচিত আট কোটি টাকার কার্যাদেশটি সাবেক সংসদ সদস্য ফজলে করিম চৌধুরীর পুত্র ও শ্যালকের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নামে-বেনামে পরিচালিত প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছিল। দুদকের অনুসন্ধান শুরু এবং নথি তলবের পর কার্যাদেশটি বাতিলের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও গুঞ্জন উঠেছে।
তবে দুদকের প্রকাশিত চিঠিতে ফজলে করিম চৌধুরীর পুত্র, শ্যালক কিংবা কোনো নির্দিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের নাম উল্লেখ করা হয়নি। এসব ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ তদন্তের মাধ্যমে প্রমাণিত হওয়ার অপেক্ষায়।
রেল সংশ্লিষ্টদের মতে, জাতীয় সংবাদমাধ্যমে অনিয়মের তথ্য প্রকাশ না হলে অতিরিক্ত মূল্যে পণ্য কেনার মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ সরকারি অর্থ অপচয়ের আশঙ্কা ছিল। দুদকের দ্রুত পদক্ষেপের ফলে ক্রয়প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত হওয়ার পাশাপাশি জনগণের প্রায় সাত কোটি টাকা সম্ভাব্য দুর্নীতির হাত থেকে রক্ষা পেয়েছে বলে তারা মনে করছেন।