
বাংলাদেশ রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপকের (জিএম) সরকারি বাংলোয় দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে এক রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর (আরএনবি) সদস্যকে অভিযোগ ছাড়াই প্রত্যাহারের ঘটনায় রেল প্রশাসনে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, সংরক্ষিত সরকারি স্থাপনায় প্রচলিত নিরাপত্তা বিধি অনুসরণ করতে গিয়ে তিনি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অসন্তোষের মুখে পড়েন। এ ঘটনার পর পূর্বাঞ্চলের জিএম প্রকৌশলী মো. সুবক্তগীনের অতীতের বিতর্কিত ২০১৮ সালের ওয়েম্যান ও খালাসি নিয়োগ প্রক্রিয়াও নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
রেলওয়ের ১১শ ১৩ জন বিতর্কিত ওয়েম্যান নিয়োগের ২০১৮ সালের আহ্বায়ক সেই সুবক্তগীন এখন পূর্বাঞ্চলের জিএম। তার বাংলোতে নারী প্রবেশ করতে বাধা দেওয়ায়,
কোনো লিখিত অভিযোগ বা বিভাগীয় তদন্ত ছাড়াই সাদ্দাম হোসেন নামের এক নিরাপত্তার কর্মীকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।বিষয়টি নিয়ে পূর্বাঞ্চল রেলওয়েসহ সমগ্র রেলওয়েতে আলোচনা ও সমমালোচনা চলছে।
গত বুধবার (২৯ জুলাই) চট্টগ্রামের সিআরবিতে অবস্থিত বাংলাদেশ রেলওয়ে (পূর্ব) মহাব্যবস্থাপকের সংরক্ষিত বাংলোয় এঘটনা ঘটে।
পূর্ব রেলের জিএম প্রকৌশলী সুবক্তগিনের ২০১৮ সালের ওয়েম্যান নিয়োগ জালিয়াতি :-
২০১৮ সালের বাংলাদেশ রেলওয়ের ওয়েম্যান (Wayman) ও খালাসি নিয়োগ প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে বড় ধরনের নিয়োগ জালিয়াতি এবং অনিয়মের অভিযোগ ওঠে, যা পরবর্তীতে আদালত এবং গণমাধ্যমে ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়। মূলত ১,১১৩ জন ওয়েম্যান এবং ৮৬৫ জন খালাসি পদের এই নিয়োগের ফলাফল প্রকাশের পর থেকেই চাকরিপ্রার্থীরা বিভিন্ন অনিয়মের বিরুদ্ধে আন্দোলনে নামেন।
এই নিয়োগ জালিয়াতির প্রধান দিক এবং অভিযোগগুলো :-
১. একই ব্যক্তিকে দুই সিরিয়ালে নিয়োগ (একক জালিয়াতি),তদন্ত ও গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে দেখা গেছে, চূড়ান্ত নিয়োগের তালিকায় একজন ব্যক্তিকে দুটি ভিন্ন সিরিয়াল ও পরিচিতিতে চাকরি দেওয়া হয়েছিল।
যেমন:চূড়ান্ত তালিকার ১৩৩ নম্বর ক্রমিকে এমরান মিয়া (পিতা: শাহাব উদ্দিন, রোল নং-কিশোর/১০২) নামের এক প্রার্থীর নাম আসে।একইভাবে, ওই একই তালিকার ১০২২ নম্বর ক্রমিকে আবার সেই একই ব্যক্তি এমরান মিয়ার নাম (পিতা: মৃত শাহাব উদ্দিন, রোল নং-কিশোর/১০২) অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এই ঘটনাটি নিয়োগে বড় ধরনের প্রশাসনিক কারচুপি ও জালিয়াতির স্পষ্ট প্রমাণ হিসেবে সামনে আসে।
২. পোষ্য কোটা ও নীতিমালার লঙ্ঘন:-
চাকরিপ্রার্থীদের প্রধান অভিযোগ ছিল যে, রেলওয়ের প্রচলিত ৪০% পোষ্য কোটা (railway ward quota) সঠিকভাবে পূরণ না করেই এই চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশ করা হয়েছিল। কোটা বঞ্চিত প্রার্থী ও তাদের পরিবারগুলো দাবি করেন যে, যোগ্য পোষ্য প্রার্থীদের বাদ দিয়ে অনিয়মের মাধ্যমে অন্য ব্যক্তিদের এই পদগুলোতে নিয়োগের জন্য নির্বাচিত করা হয়েছে।
৩. আন্দোলন এবং অনশন:-
নিয়োগের এই ফলাফল বাতিলের দাবিতে ভুক্তভোগী ও চাকরিপ্রার্থীরা ২০১৯ সালের মাঝামাঝি সময়ে রেলভবনের সামনে এবং বিভিন্ন স্থানে আমরণ অনশন ও বিক্ষোভ সমাবেশ করেন। তারা পুরো নিয়োগ প্রক্রিয়াটি পুনরায় তদন্ত করার এবং জালিয়াতিমুক্ত নতুন ফলাফল প্রকাশের দাবি জানান।
৪. আইনি পদক্ষেপ ও হাইকোর্ট:-
নিয়োগে এমন নজিরবিহীন জালিয়াতি ও কোটা লঙ্ঘনের বিষয়টি নিয়ে বঞ্চিত প্রার্থীরা পরবর্তীতে বাংলাদেশ হাইকোর্টে রিট পিটিশন দায়ের করেন। আদালত এই নিয়োগ প্রক্রিয়ার নথিপত্র তলব করে এবং অনিয়মের বিষয়ে তদন্তের নির্দেশ দেয়।
প্রকৌশলী মোঃ সুবক্তগীন হলেন একজন ধুরন্ধর ব্যাক্তি।২০১৮ সালে ওয়েম্যান নিয়োগ জালিয়াতি করেও তিনি এখন বাংলাদেশ রেলওয়ের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা, যিনি বর্তমানে বাংলাদেশ রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক (GM - East) হিসেবে কর্মরত আছেন।
২০১৮ সালের আলোচিত ওয়েম্যান ও খালাসি নিয়োগের সময় তিনি এই নিয়োগ কমিটির অন্যতম আহ্বায়ক (Convener) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন, যার কারণে পুরো নিয়োগ জালিয়াতির বিতর্কে তাঁর ভূমিকা ও দায়বদ্ধতা নিয়ে তীব্র সমালোচনা তৈরি হয়।
★সুবক্তগীনের কর্মজীবন, নিয়োগ বিতর্ক:-
১. নিয়োগ কমিটির আহ্বায়ক হিসেবে ভূমিকা
২০১৮ সালে রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলে ১,১১৩ জন ওয়েম্যান এবং ৮৬৫ জন খালাসি নিয়োগের জন্য যে কমিটি গঠন করা হয়েছিল, তৎকালীন প্রধান প্রকৌশলী (পূর্ব) মোঃ সুবক্তগীন সেই কমিটির প্রধান বা আহ্বায়ক ছিলেন। তাঁর নেতৃত্বাধীন কমিটির অধীনেই লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষা সম্পন্ন করে চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশ করা হয়।
২. জালিয়াতি ও অনিয়মের অভিযোগ:-
চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশের পর যখন একই রোল নম্বর দুইবার আসা, পোষ্য কোটা বাড দেওয়া এবং ব্যাপক আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ ওঠে, তখন চাকরিপ্রার্থীরা সরাসরি নিয়োগ কমিটির প্রধান হিসেবে সুবক্তগীনের দিকে আঙুল তোলেন।
আন্দোলনকারীদের অভিযোগ ছিলো নিয়োগ কমিটির শীর্ষ কর্মকর্তা হিসেবে ফলাফল পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই না করেই চূড়ান্ত তালিকায় স্বাক্ষর করা হয়েছে।কোটা পদ্ধতি লঙ্ঘন এবং প্রশাসনিক কারচুপির ক্ষেত্রে তাঁর অবহেলা বা পরোক্ষ প্রশ্রয় ছিল।
৩. তাঁর আত্মপক্ষ সমর্থন:-
নিয়োগ সংক্রান্ত বিতর্ক ও পরবর্তীতে রেলের আউটসোর্সিং বা ঠিকাদার-নির্ভর বিভিন্ন প্রকল্প নিয়ে প্রশ্ন উঠলে সুবক্তগীন গণমাধ্যমের কাছে তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি দাবি করেন যে, কোনো কোনো মহল উদ্দেশ্যমূলভাবে তাঁর নাম জড়ানোর চেষ্টা করছে এবং তিনি প্রচলিত বিধিবিধান ও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুযায়ীই দায়িত্ব পালন করেছেন।
৪. বর্তমান অবস্থান ও পদোন্নতি:-
নিয়োগের এই বড় বিতর্ক এবং বিভিন্ন মহলে সমালোচনার পরেও মোঃ সুবক্তগীনের প্রশাসনিক ক্যারিয়ারে কোনো বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়েনি। তিনি একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পেয়েছেন।
তার মধ্যে আখাউড়া-লাকসাম ডাবল লাইন নির্মাণ প্রকল্প এবং চট্টগ্রাম-দোহাজারী রেললাইন প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক (Project Director) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
২০২৪ সালের ডিসেম্বর মাসে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের আদেশে তাঁকে বাংলাদেশ রেলওয়ের অন্যতম শীর্ষ পদ মহাব্যবস্থাপক (পূর্বাঞ্চল) হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। বর্তমানেও তিনি চট্টগ্রামের সিআরবি (CRB) কার্যালয়ে এই পদে বহাল থেকে রেলের বড় বড় প্রকল্প ও সংস্কার কার্যক্রম তদারকি করছেন।
★২০১৮ সালের রেলওয়ের ওয়েম্যান ও খালাসি নিয়োগ জালিয়াতির ঘটনার তদন্ত প্রতিবেদন:- দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) আইনি অবস্থান, হাইকোর্টের নির্দেশনা এবং প্রকৌশলী মোঃ সুবক্তগীনের সামগ্রিক পরিস্থিতির বিস্তারিতভাবে বিশ্লেষণ :-
১. তদন্ত প্রতিবেদন ও অনিয়মের প্রমাণ:-
নিয়োগের ফলাফল প্রকাশের পর চাকরিপ্রার্থীদের তীব্র আন্দোলনের মুখে রেলপথ মন্ত্রণালয় ও রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ অভ্যন্তরীণ তদন্ত কমিটি গঠন করতে বাধ্য হয়।
২,প্রশাসনিক অবহেলা ও ত্রুটি::-
তদন্তে দেখা যায়, তৎকালীন প্রধান প্রকৌশলী (পূর্ব) ও নিয়োগ কমিটির আহ্বায়ক মোঃ সুবক্তগীনের নেতৃত্বাধীন কমিটি ফলাফল তৈরিতে চরম খামখেয়ালিপনা করেছে। একই রোল নম্বর দুইবার চূড়ান্ত তালিকায় আসা এবং যোগ্য পোষ্য কোটার প্রার্থীদের বাদ দেওয়ার পেছনে কোনো যৌক্তিক ব্যাখ্যা কমিটি দিতে পারেনি।
৩.পরোক্ষ দায়:-
তদন্ত কমিটি সরাসরি কাউকে এককভাবে অপরাধী না করলেও নিয়োগ কমিটির শীর্ষ কর্মকর্তা হিসেবে সুবক্তগীনের "তদারকি ও যাচাইকরণের ঘাটতি" (Supervisory Failure) এবং "দায়িত্বে অবহেলা"র বিষয়টি প্রতিবেদনে উঠে আসে।
দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অবস্থান
বাংলাদেশ রেলওয়ের নিয়োগ ও কেনাকাটায় দুর্নীতি নিয়ে দুদক দীর্ঘ সময় ধরে অনুসন্ধান চালিয়েছে।
★দুদকের ১০ খাতের প্রতিবেদন: -
দুদক সমন্বিতভাবে বাংলাদেশ রেলওয়ের নিয়োগ, ক্রয় ও প্রকল্প বাস্তবায়নসহ ১০টি প্রধান খাতে দুর্নীতির উৎস চিহ্নিত করে রেল মন্ত্রণালয়ে ১৫ দফা সুপারিশ জমা দেয়।
★মামলা ও সুবক্তগীনের অবস্থান:-
রেলের বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তা, যেমন সাবেক পূর্বাঞ্চল জিএম ও নিরাপত্তা বাহিনীর কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দুদক সরাসরি মামলা করলেও, মোঃ সুবক্তগীনের বিরুদ্ধে কোনো সরাসরি ফৌজদারি মামলা বা এফআইআর (FIR) দায়ের করেনি। তবে নিয়োগে অনিয়মের ঘটনায় সংশ্লিষ্ট কমিটির প্রধান হিসেবে তাঁর ওপর বিভাগীয় নজরদারি ছিল।
★হাইকোর্টের হস্তক্ষেপ ও আইনি পরিণতি;-
বঞ্চিত প্রার্থীদের রিট পিটিশনের প্রেক্ষিতে হাইকোর্ট এই নিয়োগ প্রক্রিয়ার ওপর দীর্ঘ শুনানি করে।
নথি তলব ও স্থগিতাদেশ:-
আদালত বিভিন্ন সময়ে এই বিতর্কিত নিয়োগের চূড়ান্ত প্যানেল ও কার্যবিবরণী তলব করে। কিছু পদের নিয়োগের ওপর সাময়িক স্থগিতাদেশও দেওয়া হয়েছিল।
★বাস্তব পরিস্থিতি: -
প্রশাসনিক ও আইনি দীর্ঘসূত্রতার কারণে পুরো নিয়োগ প্রক্রিয়াটি বাতিল করা সম্ভব হয়নি। তবে আদালতের কঠোর অবস্থানের কারণে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ পরবর্তীতে তাদের অভ্যন্তরীণ নিয়োগ কার্যক্রমে সফটওয়্যার এবং বুয়েটের (BUET) মাধ্যমে খাতা মূল্যায়নের মতো কিছুটা স্বচ্ছ প্রক্রিয়া বেছে নিতে বাধ্য হয়।
★সুবক্তগীনের বর্তমান প্রকল্প ও বিতর্ক:-
মোঃ সুবক্তগীন ডাবল লাইন নির্মাণ ও দোহাজারী রেললাইন প্রকল্পের পরিচালক (PD) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। রেলের এই বড় প্রকল্পগুলোর ক্ষেত্রেও বিভিন্ন সময়ে বেশ কিছু অভিযোগ উঠেছে।
★ব্যয় ও সময় বৃদ্ধি:-
নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ না হওয়ায় প্রকল্পের মেয়াদ বারবার বৃদ্ধি এবং এর ফলে বাজেট বা ব্যয় কয়েক গুণ বেড়ে যাওয়া নিয়ে সমালোচনা হয়।
★ঠিকাদার ও আউটসোর্সিং বিতর্ক: -
ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান নির্বাচন এবং প্রকল্প এলাকার জমি অধিগ্রহণে ধীরগতির কারণে রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয়ের অভিযোগ ওঠে। তবে তিনি সবসময়ই দাবি করেছেন যে, বৈশ্বিক পরিস্থিতি এবং স্থানীয় প্রশাসনিক জটিলতার কারণেই প্রকল্পগুলোতে বিলম্ব হয়েছে।
★সামগ্রিক মূল্যায়ন:-
কেন কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি?
রেলওয়ের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এবং শক্তিশালী প্রশাসনিক লবিংয়ের কারণে মোঃ সুবক্তগীনের বিরুদ্ধে কোনো দৃশ্যমান শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বরং জ্যেষ্ঠতার (Seniority) ভিত্তিতে এবং বড় প্রকল্পগুলো সফলভাবে পরিচালনার লজিস্টিক ক্রেডিট দেখিয়ে তিনি রেলপথ মন্ত্রণালয়ের আদেশে ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক (GM) হিসেবে পদোন্নতি পান। বর্তমানেও তিনি বাংলাদেশ রেলওয়ের অফিশিয়াল পোর্টালে এই শীর্ষ পদেই বহাল আছেন।