বাংলাদেশ রেলওয়ের প্রশাসনিক কাঠামোয় শুরু হয়েছে বড় ধরনের পুনর্বিন্যাস। দীর্ঘদিন ধরে কেন্দ্রীভূত ক্ষমতার কাঠামো ভেঙে শীর্ষ পর্যায়ের সিদ্ধান্ত গ্রহণে নতুন নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা চালু করছে রেলপথ মন্ত্রণালয়। মহাপরিচালক (ডিজি) থেকে শুরু করে অতিরিক্ত মহাপরিচালক, পরিচালক ও সহকারী মহাপরিচালক পর্যায়ে একের পর এক রদবদল, দায়িত্ব পুনর্বণ্টন এবং বাধ্যতামূলক বদলির মাধ্যমে রেল প্রশাসনে নতুন সমীকরণ তৈরি হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, প্রশাসনিক জবাবদিহি বাড়ানো, মাঠপর্যায়ের কার্যক্রমে গতি ফিরিয়ে আনা এবং দীর্ঘদিন ধরে একই দপ্তরে কর্মরত কর্মকর্তাদের প্রভাব কমাতেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সাম্প্রতিক বিভিন্ন প্রশাসনিক আদেশে এর প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে।
সবচেয়ে আলোচিত পরিবর্তন এসেছে মহাপরিচালকের প্রশাসনিক ক্ষমতায়। এতদিন কর্মকর্তা বদলি ও গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে মহাপরিচালকের প্রভাব ছিল প্রধান। নতুন ব্যবস্থায় সেই ক্ষমতার একটি অংশ রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সরাসরি তদারকির আওতায় আনা হয়েছে। ফলে গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে এখন মন্ত্রণালয়ের ভূমিকা আরও বাড়ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
বর্তমানে বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন প্রকৌশলী মো. আফজাল হোসেন। একই সঙ্গে অতিরিক্ত মহাপরিচালক (রোলিং স্টক) হিসেবে ফকির মো. মহিউদ্দিন এবং অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অবকাঠামো) হিসেবে আল ফাত্তাহ মো. মাসউদুর রহমান দায়িত্ব পালন করছেন। রেলওয়ের সরকারি কর্মকর্তাদের তালিকায় এ তথ্য উল্লেখ রয়েছে।
প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাসের অংশ হিসেবে যান্ত্রিক, অবকাঠামো ও পরিচালনাসংশ্লিষ্ট শাখাগুলোতে নতুন দায়িত্ব বণ্টন করা হয়েছে। চলমান উন্নয়ন প্রকল্পের গতি বাড়ানো, অপারেশনাল দক্ষতা বৃদ্ধি এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে সমন্বয় জোরদারের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়।
এদিকে রেলভবনের বিভিন্ন দপ্তরে দীর্ঘদিন একই পদে কর্মরত পরিচালক, উপপরিচালক ও সহকারী পরিচালকদেরও পর্যায়ক্রমে অন্যত্র বদলি করা হচ্ছে। একই সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের নতুন দায়িত্ব দিয়ে মাঠপর্যায়ে পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রশাসনিক স্থবিরতা দূর করে সিদ্ধান্ত গ্রহণের গতি বাড়ানোই এই পুনর্বিন্যাসের অন্যতম লক্ষ্য।
রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে,বর্তমানে বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন প্রকৌশলী মো. আফজাল হোসেন। সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন মেগা প্রকল্প ও টেন্ডার কার্যক্রম নিয়ে তাঁর বিরুদ্ধে বিভিন্ন গণমাধ্যমে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ প্রকাশিত হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের চূড়ান্ত তদন্ত বা বিচারিক সিদ্ধান্ত এখনো প্রকাশিত হয়নি। এ অবস্থায় মহাপরিচালকের কার্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক কার্যক্রমে মন্ত্রণালয়ের তদারকি আরও জোরদার করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।
এদিকে অতিরিক্ত মহাপরিচালক (রোলিং স্টক) পদে ফকির মো. মহিউদ্দিনকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। ট্রেন পরিচালনা, রোলিং স্টকের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং রানিং স্টাফদের বিভিন্ন সমস্যা দ্রুত সমাধানের মাধ্যমে অপারেশনাল কার্যক্রমে গতি আনাই তাঁর প্রধান দায়িত্ব বলে জানা গেছে।
অবকাঠামো শাখার অতিরিক্ত মহাপরিচালক পর্যায়েও নতুন দায়িত্ব বণ্টন করা হয়েছে। চলমান উন্নয়ন প্রকল্পের বাস্তবায়ন ত্বরান্বিত করা, এডিপিভুক্ত প্রকল্পের অগ্রগতি বাড়ানো এবং দীর্ঘদিনের অডিট আপত্তি নিষ্পত্তির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
সহকারী মহাপরিচালক, পরিচালক ও উপপরিচালক পর্যায়ে সবচেয়ে বেশি পরিবর্তন আনা হয়েছে। রেলভবনের বিভিন্ন দপ্তরে টানা তিন বছরের বেশি সময় একই পদে কর্মরত কর্মকর্তাদের বাধ্যতামূলক বদলির সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হচ্ছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ শাখার পরিচালক ও উপপরিচালকদের দায়িত্ব পুনর্বিন্যাস করা হয়েছে, যাতে মাঠপর্যায়ে প্রশাসনিক কার্যক্রম আরও কার্যকর হয়।
রেলওয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, "শুধু পদ পরিবর্তন নয়, প্রশাসনিক সংস্কৃতিতেও পরিবর্তনের চেষ্টা চলছে। এখন মূল চ্যালেঞ্জ হবে নতুন কাঠামো কত দ্রুত কার্যকর করা যায়।"
তবে প্রশাসনিক পর্যবেক্ষকদের মতে, কেবল রদবদলই যথেষ্ট নয়; স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং নিয়মিত তদারকি নিশ্চিত করা গেলে তবেই এই পরিবর্তনের সুফল যাত্রীসেবা ও প্রকল্প বাস্তবায়নে দৃশ্যমান হবে।