খরাপ্রবণ বরেন্দ্র অঞ্চলে তীব্র পানি সংকট, নিরাপদ খাদ্য ও ভূমির অবক্ষয় মোকাবিলায় টেকসই কৃষি সমাধান এবং নীতিগত সহায়তার আহ্বান জানিয়েছেন তরুণ নেতৃত্ব। আজ বিশ্ব যুব দিবসে বরেন্দ্র ইয়ুথ ফোরাম, গ্রিন কোয়ালিশন ও বারসিকের যৌথভাবে আয়োজিত ‘ভিন্ন বাস্তবতা, অভিন্ন আকাক্সক্ষা, যুবদের কণ্ঠে ন্যায়ভিত্তিক ও টেকসই বরেন্দ্র’ শীর্ষক জলবায়ু ন্যায্যতা ও খাদ্য সার্বভৌমত্ব অর্জনে কমিউনিটির উদ্যোগ বিষয়ক অংশগ্রহণমূলক কর্মশালা থেকে এই দাবি জানানো হয়েছে।
কর্মশালায় তরুন কৃষক-কৃষানী, শহর ও গ্রামের বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক, পরিবেশবাদী সংগঠনের প্রতিনিধিরা অংশগ্রহণ করেন। বরেন্দ্র অভিন্ন আকাক্সক্ষা ল্যাব (ইধৎরহফ ঈড়সসড়হ অংঢ়রৎধঃরড়হং খধন)-এ বরেন্দ্রের বিভিন্ন বাস্তবতা থেকে আসা তরুণরা পানি, কৃষি, প্রাণ-প্রকৃতি, জলবায়ু, সামাজিক ও পরিবেশ ন্যায়বিচার, কমিউনিটি উদ্যোগ এবং যুব উদ্ভাবন নিয়ে অংশগ্রহণমূলক আলোচনা করেন। বরেন্দ্রে অঞ্চলের তরুন কৃষক, শহুরে তরুণ, নারী, জেলে, আদিবাসী কিংবা শিক্ষার্থীর বাস্তবতা আলাদা; কিন্তু তারা সবাই নিরাপদ খাদ্য, পানি, সুস্থ পরিবেশ, সম্মানজনক জীবিকা, খাদ্য সার্বভৌমত্ব এবং সুন্দর ভবিষ্যৎ চায়।
আয়োজকরা বলেন, বরেন্দ্রের কৃষি সংকটকে শুধু কৃষি উৎপাদনের সংকট হিসেবে দেখলে এর প্রকৃত চিত্র পাওয়া যাবে না। কৃষির সঙ্গে পানি, মাটি, প্রাণবৈচিত্র্য, খাদ্য ব্যবস্থা, কৃষকের মর্যাদা, স্থানীয় বীজ, জলবায়ু এবং মানুষের জীবিকার সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য। ফলে বরেন্দ্রের জন্য প্রয়োজন এমন একটি নীতি, যা উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ, কৃষকের অধিকার, নিরাপদ খাদ্য ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের পরিবেশগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে।
পবা উপজেলার এগ্রোইকোলজি চর্চাকারী তরুন কৃষক মো. রিদয় বলেন, ‘আমি ৫৫ শতাংশ জমিতে পেয়ারা চাষ করেছি একদম বিষমুক্ত উপায়ে। আমার পেয়ারার ফলন আমার এলাকায় যারা কীটনাশক ও রাসায়নিক দিয়ে চাষ করেছে তাদের চেয়ে অনেক ভালো হয়েছে। সরকারের উচিৎ পরিবেশ বান্ধব কৃষি চর্চায় কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করা, এবং মারাত্বক ক্ষতিকর কীটনাশকের ব্যবহার বন্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা।’
আদিবাসী যুব পরিষদের সাধারণ সম্পাদক সাবিত্রী হেমব্রম বলেন, ‘কোনো কৃষি বা উন্নয়ন নীতি তখনই ন্যায়ভিত্তিক হবে, যখন তার সুবিধা ও পরিবেশগত ব্যয়ের বণ্টন ন্যায্য হবে। কৃষক, নারী, আদিবাসী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী এবং স্থানীয় জনগণের ওপর কোনো নীতির অসম প্রভাব তৈরি হচ্ছে কি না, তা নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের সময় বিবেচনা করতে হবে।’
বরেন্দ্র ইয়ুথ ফোরামের সভাপতি মো. আতিকুর রহমান বলেন, ‘আমরা এমন একটি উন্নয়ন কাঠামো চাই, যেখানে কৃষি উৎপাদন, পানি নিরাপত্তা, প্রাণ-প্রকৃতি ও মানুষের অধিকারকে সমন্বিতভাবে দেখা হবে। বরেন্দ্রের বাস্তবতার আলোকে এখনই একটি পরিবেশবান্ধব ও এগ্রোইকোলজি-ভিত্তিক কৃষিনীতি প্রয়োজন, যেখানে কৃষকের উৎপাদনের পাশাপাশি পানি, মাটি, কৃষিপ্রাণবৈচিত্র্য ও স্বাস্থ্য সুরক্ষাও নিশ্চিত হবে।’
নৃবিজ্ঞানী, পরিবেশ আইন গবেষক ও বারসিক রাজশাহীর আঞ্চলিক সমন্বয়কারী মো. শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘বরেন্দ্রের লোকায়ত কৃষিজ্ঞান, স্থানীয় বীজ ও কৃষকের নিজস্ব অভিযোজন কৌশলকে উন্নয়ন পরিকল্পনায় যথাযথ গুরুত্ব দিতে হবে। আধুনিক বিজ্ঞান ও স্থানীয় জ্ঞানকে সমন্বিত করে জলবায়ু পরিবর্তনের উপযোগী নীতি প্রণয়ন করতে হবে, যেখানে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অভিজ্ঞতাও গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত হবে।’