বাংলাদেশে কোনো আদিবাসী গোষ্ঠী নেই, এবং বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে আদিবাসী শব্দটি অপ্রাসঙ্গিক — স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ ও তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপনের এমন বক্তব্যের তীব্র প্রতিবাদ ও উদ্বেগ জানিয়েছে জাতীয় আদিবাসী পরিষদ কেন্দ্রীয় কমিটি।এক যৌথ বিবৃতিতে জাতীয় আদিবাসী পরিষদ কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি গনেশ মার্ডি ও সাধারণ সম্পাদক বিমল চন্দ্র রাজোয়াড় বলেন, বাংলাদেশের ভূখণ্ডে বসবাসকারী সাঁওতাল, ওরাঁও, মুন্ডা, মাহাতো, ভূমিজ, পাহাড়িয়া, মাহালী, কোচসহ বিভিন্ন জাতিসত্তার মানুষের নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি, সামাজিক রীতি, ঐতিহ্য ও ঐতিহাসিক পরিচয় রয়েছে। তাদের জাতিগত পরিচয়কে অস্বীকার করা কেবল একটি শব্দের ব্যবহার নিয়ে বিতর্ক নয়; এটি তাদের আত্মপরিচয়, ইতিহাস, সাংস্কৃতিক অধিকার ও মর্যাদার প্রশ্ন।
বাংলাদেশের নাগরিকনএবং ‘আদিবাসী —দুটি পরিচয় পরস্পরবিরোধী নয়। একজন ব্যক্তি একই সঙ্গে বাংলাদেশের নাগরিক এবং কোনো একটি আদিবাসী জাতিসত্তার সদস্য হতে পারেন। নাগরিকত্ব রাষ্ট্রের সঙ্গে একজন মানুষের আইনগত সম্পর্ক নির্ধারণ করে, আর জাতিসত্তার পরিচয় নির্ধারিত হয় মানুষের ইতিহাস, সংস্কৃতি, ভাষা, ঐতিহ্য, সামাজিক বন্ধন ও আত্মপরিচয়ের মধ্য দিয়ে। ফলে বাংলাদেশের নাগরিক পরিচয় প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে কোনো জাতিসত্তার স্বতন্ত্র পরিচয় অস্বীকার করা সমিচীন নয়। বাংলাদেশের সমতল ও পার্বত্য অঞ্চলে বসবাসকারী বিভিন্ন আদিবাসী জাতিসত্তা দীর্ঘদিন ধরে নিজেদের স্বতন্ত্র পরিচয় বহন করে আসছে। তারা নিজেদের ভাষা, সংস্কৃতি, ধর্মীয় ও সামাজিক আচার, উৎসব এবং ঐতিহ্য প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ধারণ করে চলেছেন। রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো এই বহুত্বকে অস্বীকার না করে সাংবিধানিক সমতা, মর্যাদা ও অধিকার নিশ্চিত করা।বিবৃতিতে বলা হয়, দেশের বিভিন্ন সরকারি নীতি, আইন ও শিক্ষানীতিতে বিভিন্ন সময়ে ‘আদিবাসী’, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ও ‘ক্ষুদ্র জাতিসত্তা’সহ বিভিন্ন পরিভাষা ব্যবহৃত হয়েছে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান আইন, ২০১০, জাতীয় শিক্ষানীতি, ২০১০ এবং বিদ্যমান ভূমি-আইনের বিভিন্ন বিধানে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী ও তাদের অধিকার, সংস্কৃতি বা ভূমি-স্বার্থের বিষয় উঠে এসেছে। জাতীয় আদিবাসী পরিষদের মতে, এসব রাষ্ট্রীয় নথি ও নীতিতে বিভিন্ন পরিভাষার ব্যবহারই প্রমাণ করে যে বিষয়টি নিছক শব্দের বিতর্ক নয়, বরং রাষ্ট্রের নীতি ও বাস্তবতার সঙ্গে এর গভীর সম্পর্ক রয়েছে।
আদিবাসী শব্দটি নিয়ে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে মতপার্থক্য থাকতে পারে। কিন্তু কোনো জাতিসত্তার মানুষ নিজেদের যে পরিচয়ে পরিচিত করতে চান, সেই আত্মপরিচয়কে অস্বীকার বা অবমূল্যায়ন করা কোনো গণতান্ত্রিক ও বৈষম্যহীন রাষ্ট্রের নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। রাষ্ট্রের উচিত পরিচয় নিয়ে বিরোধ তৈরি না করে সংবিধানের সমতা, বৈষম্যবিরোধী নীতি এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার নীতির আলোকে বিষয়টির সমাধান করা।দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সাঁওতাল, ওরাঁও, মুন্ডা, মাহাতো, ভূমিজ, পাহাড়িয়া/মালপাহাড়িয়া, মাহালী, কোল, কোচ, তুরি, রাজোয়াড়, বাগদি, বেদিয়া, কুর্মি, গঞ্জু, গড়াইত, কোচ,কোল ডালু,মালোসহ বিভিন্ন জাতিসত্তার মানুষ বসবাস করছেন। তাদের প্রত্যেকের নিজস্ব সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাস রয়েছে। কোনো একটি রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক বক্তব্য দিয়ে তাদের অস্তিত্ব, ইতিহাস কিংবা আত্মপরিচয় মুছে দেওয়া সম্ভব নয়।
জাতীয় আদিবাসী পরিষদের সভাপতি গনেশ মার্ডি ও সাধারণ সম্পাদক বিমল চন্দ্র রাজোয়াড় বলেন, আমরা বাংলাদেশের নাগরিক,একই সাৈ আদিবাসী জাতিসত্তার মানুষ, জাতিসত্তার পরিচয় হারিয়ে নয়। বাংলাদেশ বহুত্বের দেশ এই বহুত্বই বাংলাদেশের শক্তি।রাষ্ট্র যদি সত্যিই বৈষম্যহীন ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশ গঠন করতে চায়, তাহলে আদিবাসী জাতিসত্তাগুলোর পরিচয় ও অধিকার নিয়ে সংলাপের পথ বেছে নিতে হবে। কোনো জনগোষ্ঠীর পরিচয়কে অপ্রাসঙ্গিক ঘোষণা না করে তাদের বক্তব্য শুনতে হবে এবং ঐতিহাসিকভাবে বঞ্চিত জনগোষ্ঠীর ভূমি, শিক্ষা, ভাষা, সংস্কৃতি, কর্মসংস্থান ও রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের প্রশ্নে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।
১১ আগস্টের গোলটেবিল বৈঠকের বক্তব্য প্রসঙ্গে বিবৃতিতে বলা হয়, গত ১১ আগস্ট ২০২৬, মঙ্গলবার, ঢাকায় আয়োজিত ‘বাংলাদেশের জন্য আদিবাসী পরিচয় অপ্রাসঙ্গিক’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ বক্তব্য দেন। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত বক্তব্য অনুযায়ী, তিনি বাংলাদেশের ভূখণ্ডে বসবাসকারী নাগরিকদের অভিন্ন জাতীয় পরিচয়ের ওপর গুরুত্বারোপ করেন এবং দেশে কোনো ‘আদিবাসী’ গোষ্ঠী নেই—এমন বক্তব্য দেন।একই অনুষ্ঠানে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ‘আদিবাসী’ শব্দটি অপ্রাসঙ্গিক বলে মন্তব্য করেছেন বলে জাতীয় আদিবাসী পরিষদের বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়।জাতীয় পরিচয়ের সঙ্গে জাতিসত্তার পরিচয়কে মুখোমুখি দাঁড় করানো উচিত নয়। বাংলাদেশি নাগরিক হিসেবে অভিন্ন রাষ্ট্রীয় পরিচয়ের পাশাপাশি বিভিন্ন জাতিসত্তার সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক পরিচয় স্বীকৃত থাকতে পারে। বরং রাষ্ট্রের বৈচিত্র্যময় জনগোষ্ঠীর পরিচয়কে মর্যাদা দেওয়ার মাধ্যমেই একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক জাতীয় পরিচয় আরও শক্তিশালী হয়।
জাতীয় আদিবাসী পরিষদ কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি গনেশ মার্ডি ও সাধারণ সম্পাদক বিমল চন্দ্র রাজোয়াড় যৌথ বিবৃতিতে- স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রীর বক্তব্য প্রত্যাহার, বাংলাদেশের বিভিন্ন আদিবাসী জাতিসত্তার স্বতন্ত্র আত্মপরিচয় ও সাংস্কৃতিক অস্তিত্বের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি নিশ্চিত , আদিবাসী’ শব্দের ব্যবহার নিয়ে বিভাজন সৃষ্টি না করে সংশ্লিষ্ট জাতিসত্তাগুলোর সঙ্গে অর্থবহ ও সম্মানজনক সংলাপের আহ্বান জানান, সমতল ও পার্বত্য অঞ্চলের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ভূমি, ভাষা, সংস্কৃতি, শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও মানবাধিকারের সুরক্ষা,আদিবাসীদের নিয়ে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পর্যায়ে বিভ্রান্তিকর বা অবমাননাকর বক্তব্য পরিহার করার আহ্বান, বৈষম্যহীন ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশ গঠনের লক্ষ্যে সংবিধান ও রাষ্ট্রীয় নীতিতে আদিবাসী জাতিসত্তাগুলোর পরিচয়, মর্যাদা ও অধিকার নিশ্চিত করার কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ,বাংলাদেশ কারও একক পরিচয়ের দেশ নয়, এই দেশ বাঙালি ও বিভিন্ন আদিবাসীসহ নানা জাতিসত্তা, ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের মানুষের। তাই কাউকে বাদ দিয়ে নয়, সবাইকে মর্যাদা ও অধিকার দিয়ে বাংলাদেশ গড়তে হবে।