
কর্নেল অলি আহমেদ বীরবিক্রম।নামের পাশে এই বীরবিক্রম শব্দটি কোনো দয়ার দান নয়,কোনো রাজনৈতিক তকমা নয়। এটা রক্ত দিয়ে কেনা এক উপাধি। ১৯৭১ সালের রণাঙ্গনে যখন পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে এই ভূখণ্ডের দামাল ছেলেরা জীবন বাজি রেখেছিল, তখন সামনের সারিতে ছিলেন তিনি। তাঁর সাহস, তাঁর রণকৌশল, তাঁর নেতৃত্ব অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। ইতিহাস তাঁকে সেই সম্মান দিয়েছে, জাতি তাঁকে সেই সম্মান দিয়েছে বলেই আজও তাঁর নাম উচ্চারণের সময় শ্রদ্ধায় মাথা নত হত। কিন্তু ইতিহাস বড় নির্মম এক বিচারক। সে শুধু জন্ম দেখে না, সে শেষটাও দেখে।
আজকের অলি আহমেদকে দেখলে ১৯৭১ সালের সেই তরুণ মেজর অলিকে চেনা যায় না। কোথায় যেন এক ভয়ংকর ব্যবধান তৈরি হয়ে গেছে। যে আদর্শের জন্য একদিন অস্ত্র হাতে তুলে নিয়েছিলেন, যে পতাকার জন্য জীবন দিতে গিয়েছিলেন,যে শক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিলেন, আজ রাজনীতির হিসেব-নিকেশে তিনিই তাদের পরম মিত্র। যাদের বিরুদ্ধে তাঁর যুদ্ধ ছিল, আজ তাদের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে তিনি রাজনীতি করছেন। এই দৃশ্য দেখে একজন সাধারণ মুক্তিযোদ্ধার বুকে রক্তক্ষরণ হয়, একজন সাধারণ নাগরিকের মনে প্রশ্ন জাগে-কেন? কেন এমন হলো?
এর উত্তর খুঁজতে আমাদের খুব বেশি দূরে যেতে হয় না। এর উত্তর লুকিয়ে আছে মানুষের চিরন্তন দুটি রিপুর মধ্যে- দাম্ভিকতা আর লোভ। 'আমি কে হনুরে' এই মানসিকতা বড় বীরকেও গ্রাস করে ফেলে। যখন একজন মানুষ মনে করতে শুরু করেন, দেশ তাঁর কাছে ঋণী, জাতি তাঁর কাছে ঋণী, মুক্তিযুদ্ধে তিনিই একমাত্র বীরবিক্রম, তখন থেকেই পতনের শুরু। কর্নেল অলি আহমেদের রাজনৈতিক জীবন সেই পতনের এক করুণ আখ্যান।
ইতিহাসের পাতা উল্টালেই আমরা দেখব, এই ট্র্যাজেডি নতুন নয়। ১৭৫৭ সালে যখন বাংলার স্বাধীনতার সূর্য অস্তমিত যায় পলাশীর প্রান্তরে। আর সেই অস্তমিত সূর্যের জন্য ইতিহাস যাকে সবচেয়ে বেশি দায়ী করে, তার নাম মির্জাফর। কিন্তু এই মির্জাফর কে ছিলেন? তিনি তো কোনো সাধারণ সেপাহী ছিলেন না। তিনি ছিলেন নবাব আলীবর্দী খাঁর অত্যন্ত বিশ্বস্ত সেনাপতি। মারাঠা বর্গীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে তাঁর বীরত্বের কাহিনী আজও ইতিহাসের পাতায় লেখা আছে।যে হাতে তিনি বাংলাকে রক্ষা করেছিলেন, সেই হাতেই তিনি বাংলাকে বিক্রি করে দিয়েছিলেন। কেন? একটাই উত্তর-লোভ। নবাব হওয়ার লোভ। ক্ষমতার লোভ। বীর মির্জাফর থেকে বিশ্বাসঘাতক মির্জাফর হয়ে ওঠার মাঝখানে এই লোভের ব্যবধানটাই সবচেয়ে বড় সত্য।
কর্নেল অলি আহমেদের জীবন যেন সেই ইতিহাসেরই পুনরাবৃত্তি। একাত্তরের বীর থেকে আজকের রাজনৈতিক বাস্তবতায় তাঁর অবস্থান মানুষকে সেই মির্জাফরের কথাই মনে করিয়ে দেয়। প্রয়াত হুমায়ুন আজাদ একটি নির্মম সত্য উচ্চারণ করেছিলেন-"একজন রাজাকার আজীবন রাজাকার, কিন্তু একজন মুক্তিযোদ্ধা আজীবন মুক্তিযোদ্ধা নন।" কত বড় সত্য কথা। মুক্তিযুদ্ধ একটি ঘটনা নয়, এটি একটি চলমান চেতনা। সেই চেতনাকে ধারণ করতে হয় আমৃত্যু। মুক্তিযুদ্ধের সার্টিফিকেট নিয়ে বসে থাকলেই মুক্তিযোদ্ধা থাকা যায় না, প্রতিদিনের রাজনৈতিক আচরণ দিয়েই প্রমাণ করতে হয় আপনি মুক্তিযোদ্ধা।
দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার সংসদে নিশ্চিত পরাজয় জেনেও শুধুমাত্র জামায়াতের প্ররোচনায় রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী হওয়া কোনো রাজনৈতিক কৌশল নয়, এটা দাম্ভিকতার প্রদর্শনী। এটা ইতিহাসকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানো। এটা প্রমাণ করা যে, আমি এখনও আছি। কিন্তু এই 'আছি' বলার রাজনীতি করতে গিয়ে তিনি যে কতটা নেই হয়ে গেলেন, তা তিনি বুঝতে পারলেন না। মানুষের ভালোবাসা, মানুষের শ্রদ্ধা, বীরবিক্রমের যে অলঙ্কার, তা ধীরে ধীরে খসে পড়তে লাগল।
ক্ষমতার লোভ, পদের লোভ, নিজেকে প্রাসঙ্গিক রাখার মরিয়া চেষ্টা মানুষকে কতটা নিঃস্ব করে দিতে পারে, কর্নেল অলি তার জ্বলন্ত উদাহরণ। ইতিহাস একদিন তাঁকে দুই ভাগে ভাগ করবে। এক ভাগে থাকবে ১৯৭১ সালের বীরবিক্রম অলি আহমেদ, যাঁর প্রতি এই জাতি চিরকাল শ্রদ্ধাশীল থাকবে। আর অন্য ভাগে থাকবে রাজনীতিবিদ অলি আহমেদ, যিনি নিজের দাম্ভিকতা আর ব্যক্তিগত লোভ-লালসার কাছে হেরে গিয়ে নিজের হাতে নিজের সমস্ত অর্জনকে ধুলোয় মিশিয়ে দিলেন। এ এক করুণ বিয়োগান্তক নাটক, যেখানে নায়ক নিজেই নিজের ভিলেন হয়ে গেলেন।