বাংলাদেশের বৈচিত্র্যময় ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীগুলোর মধ্যে মাহালী সম্প্রদায় একটি স্বতন্ত্র জনগোষ্ঠী। নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি, লোককথা, গান, নৃত্য ও সামাজিক ঐতিহ্য নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে টিকে থাকলেও সময়ের পরিবর্তনে আজ নানা সংকটে পড়েছে এই সম্প্রদায়। বিশেষ করে নতুন প্রজন্মের মধ্যে মাহালী ভাষা ও ঐতিহ্য চর্চা কমে যাওয়ায় বিলুপ্তির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। রাজশাহী অঞ্চলে মাহালী জনগোষ্ঠীর ভাষাকে ইতোমধ্যে বিপন্ন ভাষা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
রাজশাহীর বিভিন্ন এলাকায় বসবাসরত মাহালী পরিবারগুলোর জীবনযাপনেও রয়েছে নানা সংকট। তানোরের একটি মাহালী পাড়ায় প্রায় ৫০টি পরিবার দীর্ঘদিন ধরে খাসজমিতে বসবাস করছে বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। নিজেদের বসতভিটা ও সম্পদের সীমাবদ্ধতা তাদের আর্থ-সামাজিক অবস্থাকেও কঠিন করে তুলেছে।
শুধু অর্থনৈতিক সংকট নয়, মাহালী সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতি টিকিয়ে রাখা। মাহালী ভাষার নিজস্ব কোনো বর্ণমালা নেই। ফলে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে মৌখিকভাবে চলে আসা লোককথা, গান, কবিতা ও ঐতিহ্য হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে। ২০২৫ সালে ‘মাহালি ভয়েসেস’ নামে একটি গবেষণাভিত্তিক গ্রন্থে মাহালী ভাষার ২৬টি লোককাহিনি ও ২৪টি কবিতা সংরক্ষণ করা হয়েছে—যা এই ভাষা ও সংস্কৃতি রক্ষার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
মাহালী সম্প্রদায়ের মানুষদের জীবন-সংগ্রামের আরেকটি চিত্র উঠে এসেছে বিশুদ্ধ পানি সংকটকে কেন্দ্র করে তাদের আন্দোলনে। রাজশাহীর তানোরের মাহালীপাড়ার বাসিন্দারা পানির দাবিতে মাটির কলস নিয়ে নগরীর সাহেব বাজার জিরো পয়েন্টে মানববন্ধনও করেছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি জনগোষ্ঠীর ভাষা হারিয়ে গেলে শুধু একটি ভাষাই হারায় না; হারিয়ে যায় তাদের ইতিহাস, লোকজ জ্ঞান, সংস্কৃতি ও স্বতন্ত্র পরিচয়ের একটি অংশ। মাহালী সম্প্রদায়ের ক্ষেত্রেও সেই আশঙ্কাই ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছে।
তাই মাহালী সম্প্রদায়ের ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সংরক্ষণে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগ আরও জোরদার করা প্রয়োজন। পাশাপাশি মাহালী শিশুদের নিজস্ব ভাষা শেখানো, লোকগান-কবিতা ও লোককথা সংরক্ষণ, তাদের জীবনমান উন্নয়ন এবং সাংস্কৃতিক চর্চার সুযোগ তৈরি করা গেলে এই জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্য নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব।
*মাহালী সম্প্রদায় বিলুপ্তির পথে নয়—বরং যথাযথ উদ্যোগের অভাবে তাদের ভাষা ও সংস্কৃতি হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে। এখনই কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া গেলে এই প্রাচীন ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব।