যৌন হয়রানি, একাডেমিক দুর্নীতি, কর্মস্থলে অনুপস্থিতি ও জালিয়াতির মতো গুরুতর অভিযোগে গত পাঁচ বছরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবি) স্থায়ীভাবে চাকরি হারিয়েছেন চার শিক্ষক।
একই সময়ে যৌন হয়রানির অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসাকেন্দ্রের এক চিকিৎসককেও বরখাস্ত করা হয়েছে। সর্বশেষ পরিসংখ্যান বিভাগের অধ্যাপক প্রভাস কুমারকে চাকরিচ্যুতির মধ্য দিয়ে এ সংখ্যা দাঁড়িয়েছে পাঁচজনে। অভিযোগ তদন্তে প্রমাণিত হওয়ার পর সিন্ডিকেটের ধারাবাহিক সিদ্ধান্তে তাদের বিরুদ্ধে নেওয়া হয়েছে সর্বোচ্চ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫৪৮তম সিন্ডিকেট সভায় যৌন হয়রানি ও একাডেমিক দুর্নীতির দায়ে পরিসংখ্যান বিভাগের অধ্যাপক প্রভাস কুমারকে স্থায়ীভাবে চাকরিচ্যুত করা হয়।
এর আগে চলতি বছরের জানুয়ারিতে যৌন নিপীড়নের অভিযোগে আইন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক সাদিকুল ইসলাম সাগরকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়।
পাঁচ বছরের মধ্যে ২০২২ সালে কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকা ও সুপারভাইজারের স্বাক্ষর জালিয়াতির ঘটনায় মনোবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক উম্মে হাবিবা জেসমিন এবং ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের অধ্যাপক সালমা খাতুনকে স্থায়ীভাবে চাকরিচ্যুত করে বিশ্ববিদ্যালয়। ওই বছরের ৫১৪তম সিন্ডিকেট সভায় তাদের বিরুদ্ধে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
প্রভাস কুমারের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানি ও একাডেমিক দুর্নীতির অভিযোগ:-
সর্বশেষ চাকরিচ্যুত অধ্যাপক প্রভাস কুমারের বিরুদ্ধে এক শিক্ষার্থীকে যৌন হয়রানি এবং একাডেমিক দুর্নীতির অভিযোগ ছিল। অভিযোগের ভিত্তিতে বিশ্ববিদ্যালয় একাধিক তদন্ত কমিটি গঠন করে। কমিটিগুলোর প্রতিবেদনের পর উচ্চতর তদন্ত কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে সিন্ডিকেট তার স্থায়ী চাকরিচ্যুতির সিদ্ধান্ত নেয় বলে জানিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ফরিদুল ইসলাম।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে আরও জানা যায়, গত বছরের আগস্টে নিজ বিভাগের এক শিক্ষার্থীকে চেম্বারে ডেকে যৌন হয়রানি করার অভিযোগ ওঠে প্রভাস কুমারের বিরুদ্ধে। পরে ওই শিক্ষার্থীর মা বিভাগের সভাপতির কাছে লিখিত অভিযোগ দেন।
বিষয়টি তদন্তে ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং কমিটি গঠন করা হয়। পরে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন অধিকতর তদন্তের উদ্যোগ নেয়। শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভের পর গত বছরের সেপ্টেম্বরে তাকে একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম থেকে সাময়িকভাবে অব্যাহতি দেওয়া হয়।
যৌন নিপীড়নের অভিযোগে বরখাস্ত সাদিকুল ইসলাম
এর আগে চলতি বছরের ৬ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫৪৫তম সিন্ডিকেট সভায় আইন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক সাদিকুল ইসলাম সাগরকে বরখাস্ত করা হয়।
তার বিরুদ্ধে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ তদন্তে প্রমাণিত হওয়ার পর এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় বলে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার অধ্যাপক ইফতিখারুল আলম মাসউদ জানিয়েছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ম অনুযায়ী, তিনি পেনশনসহ কোনো ধরনের সরকারি সুবিধা পাবেন না।
সাদিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে ২০২৫ সালের ২৬ আগস্ট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যৌন হয়রানির অভিযোগ ওঠে। পরদিন বিষয়টি তদন্তে বিভাগীয় কমিটি গঠন করা হয়। পরে ৫৩৩তম সিন্ডিকেট সভায় তাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের সব একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম থেকে সাময়িক অব্যাহতি দেওয়া হয়।তদন্ত শেষে চলতি বছরের জানুয়ারিতে তার বিরুদ্ধে চূড়ান্ত শাস্তির সিদ্ধান্ত নেয় সিন্ডিকেট।
স্বাক্ষর জাল ও অনুমতি ছাড়া বিদেশে, চাকরি গেল দুই শিক্ষকের:-
২০২২ সালের ২৯ মে রাতে অনুষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫১৪তম সিন্ডিকেট সভায় অনিয়মের অভিযোগে দুই শিক্ষককে স্থায়ীভাবে চাকরিচ্যুত করা হয়। তারা হলেন—মনোবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক উম্মে হাবিবা জেসমিন এবং ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের অধ্যাপক সালমা খাতুন।
উম্মে হাবিবার বিরুদ্ধে বিধিবহির্ভূতভাবে কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকা, অনুমতি ছাড়া ছুটিতে থাকা এবং ছাড়পত্র না নিয়ে বিদেশে অবস্থানের অভিযোগ ওঠে। এ অভিযোগ তদন্তে কমিটি গঠন করা হয়। তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতিমালা অনুযায়ী তাকে স্থায়ীভাবে চাকরিচ্যুত করার সিদ্ধান্ত নেয় সিন্ডিকেট।
অন্যদিকে অধ্যাপক সালমা খাতুনের বিরুদ্ধে সুপারভাইজার ও চিকিৎসকের স্বাক্ষর জাল করে মাতৃত্বকালীন ছুটি নেওয়ার অভিযোগ ছিল। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার পর তাকেও স্থায়ীভাবে চাকরিচ্যুত করা হয়।
শিক্ষকদের বাইরে চাকরি হারিয়েছেন চিকিৎসকও:-
শিক্ষকদের পাশাপাশি গত পাঁচ বছরে রাবির চিকিৎসাকেন্দ্রের উপপ্রধান চিকিৎসক ডা. রাজু আহমেদকেও স্থায়ীভাবে চাকরিচ্যুত করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।
২০২৪ সালের ৩ জুন অনুষ্ঠিত ৫৩১তম সিন্ডিকেট সভায় যৌন হয়রানির অভিযোগ তদন্তে প্রমাণিত হওয়ার পর তাঁর চাকরিচ্যুতির সিদ্ধান্ত অনুমোদিত হয়। তাঁর বিরুদ্ধে এক কিশোরীকে যৌন হয়রানির অভিযোগ উঠেছিল। পরে এ ঘটনায় মামলা হয়।
অভিযোগ প্রমাণিত হলে ছাড় নয়-উপাচার্য:-
সার্বিক বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ফরিদুল ইসলাম বলেন, কোনো শিক্ষকের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেই সরাসরি শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে নিয়ম অনুযায়ী তদন্ত কমিটি করা হয়। তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রচলিত আইন ও বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
তিনি বলেন, শিক্ষক-কর্মকর্তা যেই হোন না কেন, অনিয়ম, দুর্নীতি বা যৌন হয়রানির মতো গুরুতর অভিযোগের ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কোনো ধরনের ছাড় দেবে না। একই সঙ্গে অভিযোগ তদন্তের ক্ষেত্রে ন্যায়সংগত প্রক্রিয়া ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করাও প্রশাসনের দায়িত্ব।