Template: 2
Tpl 1 Tpl 2 Tpl 3
logo
বিজয় বাংলা নিউজ
bijoybangla.news
২০ আগস্ট ২০২৬
০৬:০০ অপরাহ্ন

কৃষক নেতৃত্বে দেশি কলার জাতবৈচিত্র্য বিনিময়ে সমৃদ্ধ হচ্ছে বরেন্দ্র অঞ্চলে কৃষিপ্রাণবৈচিত্র্য

নিজস্ব প্রতিনিধি:- Agricultural Biodiversity

খরাপ্রবণ বরেন্দ্র অঞ্চলের ১৪টি গ্রামের ৯০১ পরিবারের তথ্য ও অভিজ্ঞতায় উঠে এসেছে ১৭ জাতের দেশি কলার চাষ ও কৃষক নেতৃত্বে সম্প্রসারণ; কৃষক-কৃষাণীর পারস্পরিক জাতবিনিময়ে বাড়ছে ফসল ও খাদ্যবৈচিত্র্য, শক্তিশালী হচ্ছে স্থানীয় কৃষিজ্ঞান ও এগ্রোইকোলজিক্যাল কৃষি।- বারসিকের গবেষণা


খরাপ্রবণ বরেন্দ্র অঞ্চলে কৃষক-কৃষাণীর নিজস্ব জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও পারস্পরিক জাতবিনিময়ের মাধ্যমে দেশি কলার জাতবৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও সম্প্রসারণের একটি গুরুত্বপূর্ণ চিত্র উঠে এসেছে। বারসিক’র গত তিন বছরের মাঠপর্যায়ের তথ্যসংগ্রহ ও কৃষকনেতৃত্বে জাত সংরক্ষণ গবেষণায় পবা, তানোর ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোল উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় ১৭টি দেশি ও স্থানীয়ভাবে পরিচিত কলার জাত/স্থানীয় নাম নথিভুক্ত হয়েছে। এসব জাতের ক্ষেত্রে মোট ৯০১টি পরিবার-জাত বিনিময় ও সম্প্রসারণের নথিভুক্ত ঘটনা পাওয়া গেছে।



আজ বৃহস্পতিবার ( ২০ আগষ্ট ২০২৬) রাজশাহীর পবা উপজেলার দর্শনপাড়া ইউনিয়নের নদীকান্দা গ্রামে উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান বারসিক ও গ্রিনকোয়ালিশনের উদ্যোগে আয়োজিত কৃষক নেতৃত্বে দেশি কলার জাতবৈচিত্র্য গবেষণা বিষয়ক ফলাফল ও অভিজ্ঞতা বিনিময় অনুষ্ঠানে গবেষণার এসব তথ্য উপস্থাপন করা হয়। পাশাপাশি দেশি কলার জাতবৈচিত্র্যকে বৃহত্তর কৃষিপ্রাণবৈচিত্র্য ও এগ্রোইকোলজিক্যাল কৃষি ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করার বিষয়ে আলোচনা হয়। তিনটি উপজেলার ১৪টি গ্রামের বিগত সময়ের মাঠতথ্যের সমন্বিত গবেষণা প্রতিবেদন উপস্তাপন করেন বারসিকের নৃবিজ্ঞানী ও আঞ্চলিক সমন্বয়কারী মো. শহিদুল ইসলাম।


গবেষণায় নথিভুক্ত স্থানীয় কলার জাতগুলোর মধ্যে রয়েছে- চিনি বা চিনি চম্পা, বিচি, মানিক, জীন, সবরি বা শবরি, সবুজ আনাচি, সাদা আনাচি, জেড, কাঠালী, আনাজি কলা, মনোহর, সাগর, আচিন, লাল কলা বা অগ্নিশ্বর, অনুপম কলা, এঁটে ও মদনা কলা। মাঠতথ্যে দেখা যায়, কোনো কোনো জাত আগে থেকেই কয়েকটি পরিবারের মধ্যে সীমিত ছিল; আবার কিছু জাত কোনো কোনো এলাকায় আগে না থাকলেও কৃষক-কৃষাণীর পারস্পরিক বিনিময়ের মাধ্যমে নতুন এলাকায় সম্প্রসারিত হয়েছে।


গবেষণার তথ্য অনুযায়ী,আনাজি, আনাচি, বিচি, মানিক, সবরি বা শবরি ও চিনি চম্পা কলার বিস্তার তুলনামূলকভাবে বেশি। অন্যদিকে জীন, সাদা আনাচি, জেড, সাগর, আচিন ও লাল কলা/অগ্নিশ্বরসহ অন্যান্য জাতও কৃষক পরিবারের মধ্যে স্থানান্তর ও সম্প্রসারণের প্রমাণ পাওয়া গেছে। এসব কলার কোনোটি পাকা ফল হিসেবে, কোনোটি কাঁচা অবস্থায় সবজি হিসেবে এবং কোনোটি স্থানীয় খাদ্যসংস্কৃতি ও লোকজ জ্ঞানের সঙ্গে যুক্ত হয়ে গ্রামীণ জীবনে ব্যবহৃত হচ্ছে।



গবেষণায় বিশেষভাবে উঠে এসেছে  এগ্রোইকোলজি লার্নিং সেন্টার (এএলসি) ও মডেল শতবাড়ির ভূমিকা। এএলসি-তে বিভিন্ন গ্রামের কৃষক-কৃষাণীরা একত্রিত হয়ে নিজেদের কাছে থাকা ফসলের জাত, চাষপদ্ধতি, ব্যবহার ও স্থানীয় কৃষিজ্ঞান নিয়ে আলোচনা করেছেন। কার কাছে কোন জাত রয়েছে এবং কোন কৃষকের কী জাতের প্রয়োজন, এ ধরনের তথ্য বিনিময়ের মধ্য দিয়ে জাতবিনিময়ের পরিকল্পনা তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে মডেল শতবাড়ি পরিবারভিত্তিক নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন ও কৃষিবৈচিত্র্য সংরক্ষণের বাস্তব ক্ষেত্র হিসেবে কাজ করেছে।


বারসিক এই প্রক্রিয়ায় মূলত সহায়ক ও সংযোগকারী ভূমিকা পালন করেছে। একটি গ্রামের কৃষকের কাছে থাকা দেশি কলার জাত অন্য গ্রামের আগ্রহী কৃষকের কাছে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে চারা বা রোপণ উপকরণ বিনিময়ে সহায়তা করা হয়েছে। ফলে জাত সংরক্ষণ কোনো কেন্দ্রীয় বা একক স্থানে সীমাবদ্ধ না থেকে কৃষকের জমি ও বসতভিটায় জীবন্তভাবে সংরক্ষিত ও সম্প্রসারিত হয়েছে। 


আলোচনায় পবা উপজেলার বিলনেপাল পাড়া এগ্রোইকোলজি লার্নিং সেন্টার পরিচালানাকারী কৃষাণী  সুলতানা খাতুন বলেন- “২০২৪ সালে বিভিন্ন গ্রাম থেকে ১০টি দেশি কলার জাত সংগ্রহ করে আমরা নদীকান্দা গ্রামে মোসাঃ মোসলেমা খাতুনের পরিচালনায় একটি স্থানে পরীক্ষামূলক চাষ করি। এর পর এখানে থেকে জাতগুলো বিভিন্ন ইউনিয়নের গ্রামে এবং অন্যান্য উপজেলাগুলোতেও বিনিময় করা হযেছে।” চাঁপাইনবাগঞ্জ নাচোল উপজেলার বারসিকের কৃষক গবেষক রায়হান কবির রঞ্জু বলেন- “আমি গাইবান্ধা থেকে অগ্নিস্বর, কাঠালি, চিনি কলার তিনটি জাত এখানে এনেছি। এখন প্রায় ৯০টির বেশি পরিবারে এগুলো সম্প্রসারিত হয়েছে চারা বিনিময়ের মাধ্যমে।” তিনি আরো বলেন- দিনে দিনে চারা বিনিময়ের মাধ্যমে আরো বাড়ছে।



তানোর উপজেলার গোকুল-মথুরা এগ্রোইকোলজি লার্নিং সেন্টার পরিচালানাকারি কৃষক জিতেন্দ্রনাথ বলেন- “প্রায় সকল গ্রামেই আগে নানা জাতে দেশি কলার জাত ছিলো। আধুনিক কৃষি ও অধিক ফলনের লোভে পড়ে আমরা এগুলো হারিয়ে ফেলছি। কিন্তু হারানোর পর বুঝতেছি আমরা কি রত্ন হারিযেছি ” তিনি আরো বলেন- জাতগুলো বিভিন্নভাবে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় আছে, এগুলো চিহ্নিত এবং বিনিময়ের ব্যবস্থা করলে গ্রামে কলার বৈচিত্র্য ফিরে আসবে। 

তানোর হরিদেবপুর এগ্রোইকোলজি লার্নিং সেন্টার এর পরিচালানকারি নারী কৃষাণী মোসাঃ কবুলজান বলেন- দেশি কলার সাথে আমাদের নিজের ঐতিহ্য লুকিয়ে আছে, হিন্দুদেও কিছু পুজা আছে যেমন জিন কলা দিয়ে করা হয়। তিনি আরো বলেন- যদি জিন কলা না থাকে তাহলে পুজা করবে কি করে। তাই আমাদের স্বাথেই দেশি কলাজাত রক্ষা করা দরকার।


পবা উপজেলার বিল ধর্মপুর গ্রামের মডেল শতবাড়ির প্রবীণ নারী কৃষাণী মোসাঃ মাহমুদা বেগম বলেন- পাতলা পায়খানা, পেট খারাপ আমাশয় হলে আনজি কাচা কলা খেলে উপকার পাওয়া যায়, গর্ভবতী মাকে নিয়মিত অনুপম কলা খাওয়ালে বাচ্চার এবং মায়ের স্বাস্থ্য ভালো থাকে।” তিনি আরো বলেন- দেশি প্রতিটি কলার আলাদা স্বাদ-ঘ্রাণ , গুনাগুণ বৈশিষ্ট্য আছে, কলা শুধু ফল হিসেবে নয়, সবজি হিসেবেও আমাদের কাজে লাগে। বিঁচি কলা খেলে পুরুষদের মেহ জাতীয় রোগ ভালো হয় এরকম কলাগুলো আমাদের উপকারে লাগে। আলোচনায় অংশগ্রহণকারীগণ  বিভিন্ন কলার গুণাগণ ও বৈশিষ্ট্য তুলে ধরেন। 


অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, দেশি কলার জাতবৈচিত্র্য শুধু ফলের বৈচিত্র্য নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে কৃষকের স্থানীয় জ্ঞান, খাদ্যসংস্কৃতি, পারিবারিক খাদ্যনিরাপত্তা, বসতভিটাভিত্তিক উৎপাদন, সামাজিক সহযোগিতা এবং কৃষিপ্রাণবৈচিত্র্য। একটি জাত যখন কৃষক থেকে কৃষকের কাছে পৌঁছায়, তখন শুধু একটি চারা স্থানান্তরিত হয় না, এর সঙ্গে স্থানান্তরিত হয় জাত চেনার জ্ঞান, চাষের অভিজ্ঞতা ও স্থানীয় ব্যবহারবিধি।


গবেষণার ফলাফলের ভিত্তিতে বক্তারা দেশি ও স্থানীয় জাত সংরক্ষণে কৃষক-কৃষাণীর নেতৃত্বকে স্বীকৃতি দেওয়া, ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ের কৃষি পরিকল্পনায় স্থানীয় কৃষিপ্রাণবৈচিত্র্য ও এগ্রোইকোলজিকে অন্তর্ভুক্ত করা, কৃষকভিত্তিক জাতবিনিময় ব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং স্থানীয় জাতের কমিউনিটি রেজিস্টার তৈরির আহ্বান জানান।


বক্তারা আরও বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন, খরা ও কৃষিতে একমুখী উৎপাদন ব্যবস্থার সময়ে কৃষকের হাতে থাকা স্থানীয় জাতগুলো ভবিষ্যৎ কৃষির গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। তাই দেশি জাত সংরক্ষণকে শুধু অতীতের ঐতিহ্য রক্ষার কাজ হিসেবে নয়, বরং ভবিষ্যতের নিরাপদ, বৈচিত্র্যময় ও জলবায়ু-সহনশীল কৃষি গড়ে তোলার কৌশল হিসেবে দেখতে হবে।


৯০১টি পরিবার-জাত বিনিময়ের নথি এবং ১৭টি স্থানীয় কলার জাতের এই গবেষণা দেখিয়ে দেয়, কৃষকের হাতে থাকা বৈচিত্র্যই কৃষির ভবিষ্যতের অন্যতম ভিত্তি।

উক্ত আলোচনা ও বিগত সময়ে দেশি কলা জাতের মাঠ ভিত্তিক ফলাফল উপস্থানে উপস্থিত ছিলেন- বারসিকের প্রোগ্রাম অফিসার অমৃত কুমার সরকার, মো. তৌহিদুল ইসলাম, মো. শহিদুল ইসলাম শহিদ, বরেন্দ্র ইয়ুথ ফোরামের সভাপতি আতিকুর রহমান আতিকসহ তিনটি উপজেলার ১০টির গ্রামের ৬৫ জন দেশি কলা জাত সম্প্রসারণে ভূমিকা পালনকারী কৃষক-কৃষাণী।


© বিজয় বাংলা নিউজ
bijoybangla.news