Template: 3
Tpl 1 Tpl 2 Tpl 3
অনলাইন ডেস্ক | ২১ আগস্ট ২০২৬
bijoybangla.news
logo
বিজয় বাংলা নিউজ
জাতীয় দৈনিক

২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা: মামলা, তদন্ত, রায় ও খালাসের ঘটনাপ্রবাহ

আবুল কালাম আজাদ:- August 21 grenade attack

২০০৪ সালের ২১ আগস্ট রাজধানীর বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা শেখ হাসিনার সমাবেশে ভয়াবহ গ্রেনেড হামলায় আওয়ামী লীগের ২৪ নেতাকর্মী নিহত হন। আহত হন তিন শতাধিক মানুষ। দীর্ঘ দুই দশকের বেশি সময় ধরে তদন্ত, পুনঃতদন্ত, বিচার ও আপিলের পর মামলাটির সব আসামিই খালাস পেয়েছেন। তবে এত প্রাণহানির ঘটনায় প্রকৃত হামলাকারীদের শনাক্ত করে বিচারের মুখোমুখি করা যায়নি—এ নিয়ে প্রশ্ন থেকেই গেছে।


যেভাবে শুরু:-

২০০৪ সালের ২১ আগস্টের ওই হামলার ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে মতিঝিল থানায় হত্যা ও বিস্ফোরক দ্রব্য আইনে দুটি মামলা করে। মামলার এজাহারে বলা হয়, তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা শেখ হাসিনাকে হত্যার উদ্দেশ্যে বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে সমাবেশে গ্রেনেড হামলা চালানো হয়। মামলার তদন্তে হামলায় ব্যবহৃত আর্জেস গ্রেনেড পাকিস্তান থেকে আনার তথ্যও উঠে আসে।


প্রথম দফার তদন্ত ও অভিযোগপত্র:-

২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় মামলাটির নতুন করে তদন্ত শুরু হয়। তদন্ত শেষে সিআইডির এএসপি ফজলুল কবীর ২০০৮ সালের ১১ জুন হত্যা ও বিস্ফোরক দ্রব্য আইনের দুই মামলায় অভিযোগপত্র দেন।

ওই অভিযোগপত্রে বিএনপি নেতা আবদুস সালাম পিন্টু, তাঁর ভাই মাওলানা তাজউদ্দিন এবং হরকাতুল জিহাদ (হুজি) নেতা মুফতি হান্নানসহ ২২ জনকে আসামি করা হয়।


আবারও তদন্ত, বাড়ে আসামির সংখ্যা:-

২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর রাষ্ট্রপক্ষের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আদালত মামলাটির অধিকতর তদন্তের নির্দেশ দেন। এর পর ২০১১ সালের ৩ জুলাই তারেক রহমানসহ আরও ৩০ জনকে আসামি করে সম্পূরক অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়। এতে মামলায় মোট আসামির সংখ্যা দাঁড়ায় ৫২ জনে।

তবে পরবর্তী সময়ে অন্য মামলায় মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ায় তিন আসামির নাম এ মামলা থেকে বাদ পড়ে। মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় জামায়াতে ইসলামী নেতা আলী আহসান মুহাম্মদ মুজাহিদ এবং সিলেটে ব্রিটিশ হাইকমিশনার আনোয়ার চৌধুরীকে হত্যাচেষ্টা মামলায় হুজি নেতা আবদুল হান্নান ও শরীফ শাহেদুল ইসলাম বিপুলের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়। ফলে ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলায় আসামির সংখ্যা দাঁড়ায় ৪৯ জনে।


২০১৮ সালে বিচারিক আদালতের রায়:-

দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়া শেষে ২০১৮ সালের ১০ অক্টোবর ঢাকার বিচারিক আদালত মামলাটির রায় দেন। আদালত সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবরসহ ১৯ জনকে মৃত্যুদণ্ড এবং তারেক রহমানসহ ১৯ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন। অপর ১১ আসামিকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়।মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ১৯ জনের মধ্যে ১৪ জন হরকাতুল জিহাদের সদস্য ছিলেন।


হাইকোর্টে পাল্টে যায় রায়:-

বিচারিক আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে কারাগারে থাকা আসামিরা হাইকোর্টে আপিল করেন। একই সঙ্গে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তদের সাজা অনুমোদনের জন্য ডেথ রেফারেন্সও হাইকোর্টে পাঠানো হয়।

এরপর ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ২০২৪ সালের ১ ডিসেম্বর হাইকোর্ট মামলাটিতে আসামিদের করা আপিল মঞ্জুর করেন এবং মৃত্যুদণ্ড অনুমোদনের আবেদন খারিজ করে দেন। আপিল করা হোক বা না হোক—মামলার সব আসামিকেই খালাস দেওয়া হয়।


যে কারণে খালাস:-

হাইকোর্টের রায়ে বলা হয়, মামলাটিতে দুর্বল ও শোনা সাক্ষ্যের ভিত্তিতে বিচারিক আদালত আসামিদের সাজা দিয়েছিলেন। সাক্ষীরা হামলার বর্ণনা দিলেও কে গ্রেনেড ছুড়েছেন, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্টভাবে কেউ কিছু বলেননি।

আদালতের পর্যবেক্ষণে আরও বলা হয়, যেভাবে মামলাটির পুনঃতদন্তের আদেশ দেওয়া হয়েছিল, তা ছিল ‘আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত’।

 দ্বিতীয় দফায় দেওয়া সম্পূরক অভিযোগপত্রকেও আদালত অবৈধ বলে উল্লেখ করেন।

হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, মুফতি হান্নানের জবানবন্দির ভিত্তিতে দ্বিতীয় অভিযোগপত্র নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তিনি পরে ওই স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রত্যাহার করেন। এমনকি প্রথম অভিযোগপত্রও ওই জবানবন্দির ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় তা গ্রহণযোগ্য নয় বলে আদালত মত দেন।

আদালত আরও বলেন, তদন্ত কর্মকর্তা ও ম্যাজিস্ট্রেট ছাড়া ২৫ জন সাক্ষীর কেউই বলেননি কে গ্রেনেড ছুড়েছেন কিংবা তাঁরা কাউকে গ্রেনেড ছুড়তে দেখেছেন। ফলে প্রকৃত হামলাকারী কে, সে বিষয়ে প্রমাণের ঘাটতি রয়েছে। শুধু কোনো স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দির ওপর ভিত্তি করে অন্য কাউকে সাজা দেওয়া যায় না।


স্বাধীন তদন্তের সুপারিশও ছিল হাইকোর্টের রায়ে:-

২০২৪ সালের ১৯ ডিসেম্বর প্রকাশিত হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায়ে ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলাকে দেশের ইতিহাসের ‘জঘন্য ও মর্মান্তিক’ ঘটনা হিসেবে উল্লেখ করা হয়। হামলায় নিহতদের মধ্যে আওয়ামী লীগ নেত্রী আইভি রহমানের কথাও রায়ে উল্লেখ করা হয়।

হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায়ে বলা হয়েছিল, নিহতদের আত্মার প্রতি সুবিচার নিশ্চিত করতে হামলার সঠিক ও স্বাধীন তদন্ত প্রয়োজন। এজন্য মামলাটি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়ে দক্ষ তদন্ত সংস্থার মাধ্যমে পুনরায় তদন্ত করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার কথাও বলা হয়েছিল।


আপিল বিভাগে বাদ পড়ে পুনঃতদন্তের নির্দেশনা:-

তবে ২০২৫ সালের ৪ সেপ্টেম্বর চূড়ান্ত বিচারে হাইকোর্টের রায়ের ওই অংশ বাদ দেন আপিল বিভাগ। ফলে ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলার ঘটনায় নতুন করে তদন্তের বিষয়ে হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণটি আর বহাল থাকেনি।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মনজিল মোরসেদ বলেন, ২১ আগস্টের মামলায় সর্বোচ্চ আদালত সবাইকে নির্দোষ ঘোষণা করেছেন। তবে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের খুঁজে বের করার জন্য রায়ে কোনো নির্দেশনা আসেনি। এতে হতাহতদের পরিবার প্রকৃত বিচার থেকে বঞ্চিত হয়েছে বলে তিনি মনে করেন।

অন্যদিকে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী শিশির মনিরের মতে, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে মামলা পরিচালনা করলে শেষ পর্যন্ত এমন পরিণতি হতে পারে। তাঁর ভাষ্য, ক্ষমতায় থাকা সরকার যখন নিজেদের মতো করে মামলা পরিচালনা করে, তখন পরবর্তী সময়ে প্রকৃত অপরাধীদের বিচারের পথও কঠিন হয়ে পড়ে।

২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলার দুই দশকের বেশি সময় পর মামলার সব আসামি খালাস পেলেও হামলার প্রকৃত পরিকল্পনাকারী ও সরাসরি হামলাকারীদের শনাক্ত করে বিচারের মুখোমুখি করার প্রশ্নটি এখনো অমীমাংসিত রয়ে গেছে।



© বিজয় বাংলা নিউজ
bijoybangla.news