Template: 1
Tpl 1 Tpl 2 Tpl 3
বিজয় বাংলা নিউজ
জাতীয় দৈনিক | bijoybangla.news
QR
ই-পেপার / অনলাইন সংস্করণ
Sunday , ২৩ আগস্ট ২০২৬ | ০৮:০০ অপরাহ্ন

বস্তিবাসীদের প্রাপ্য সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করার দাবি

নিজস্ব প্রতিনিধি:- ২৩ আগস্ট ২০২৬

সরকারের বিভিন্ন সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি চালু থাকলেও রাজশাহী মহানগরীর বস্তিতে বসবাসরত নিম্নআয়ের ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ এখনো এসব কর্মসূচির কার্যকর সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। দারিদ্র্য, অনিশ্চিত কর্মসংস্থান, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, স্বাস্থ্যঝুঁকি, অনিরাপদ বাসস্থান এবং জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ক্রমবর্ধমান ঝুঁকির মধ্যে থাকা নগর দরিদ্রদের সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিতে কার্যকরভাবে অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানিয়েছেন বস্তিবাসীরা।


আজ রবিবার (২৩ আগস্ট) বিকেলে উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান বারসিক ও বরেন্দ্র ইয়ুথ ফোরামের যৌথ আয়োজনে রাজশাহী মহানগরীর মতিহার থানার বুধপাড়া বস্তিতে বসবাসকারী নগর দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে নিয়ে “সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্ত হতে নগরের নিম্নআয়ের মানুষের সমস্যা” শীর্ষক এক অ্যাডভোকেসি সভায় এসব দাবি উঠে আসে।


সভায় বক্তারা বলেন, সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির উদ্দেশ্য হলো দারিদ্র্য ও বৈষম্য কমানো এবং ঝুঁকিপূর্ণ মানুষের জীবন ও জীবিকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। কিন্তু তথ্যের অভাব, জাতীয় পরিচয়পত্র ও জন্মনিবন্ধনসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের সংকট, স্থায়ী ঠিকানার সমস্যা, আবেদন প্রক্রিয়ার জটিলতা এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সঙ্গে যোগাযোগের প্রতিবন্ধকতার কারণে যোগ্য হয়েও অনেক বস্তিবাসী এসব কর্মসূচির বাইরে থেকে যাচ্ছেন।


সভায় বক্তারা বলেন, নগর দারিদ্র্যের বাস্তবতা গ্রামীণ দারিদ্র্যের তুলনায় ভিন্ন। বস্তিবাসীদের অধিকাংশ অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করেন; তাদের আয় অনিয়মিত এবং কর্মসংস্থান ও বাসস্থান অনিরাপদ। তাপপ্রবাহ, অতিবৃষ্টি, জলাবদ্ধতা, অগ্নিকাণ্ড, রোগব্যাধি কিংবা কর্মসংস্থান হারানোর মতো আকস্মিক সংকট একটি দরিদ্র পরিবারকে আরও গভীর দারিদ্র্যের দিকে ঠেলে দিতে পারে।


বক্তারা আরো বলেন, “সামাজিক সুরক্ষা কোনো দয়া বা অনুদান নয়; এটি মানুষের অধিকার এবং রাষ্ট্রের দায়িত্ব।” বস্তিবাসীরা শহরের অর্থনীতি ও দৈনন্দিন জীবন সচল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেও তাদের শ্রম ও অবদানের তুলনায় সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সুরক্ষা অত্যন্ত সীমিত। গৃহকর্মী, রিকশা ও ভ্যানচালক, নির্মাণশ্রমিক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, পরিচ্ছন্নতাকর্মী, হকারসহ অনানুষ্ঠানিক খাতের বিপুলসংখ্যক মানুষ নগর অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। অথচ তাদের আয় ও জীবিকা অত্যন্ত অনিরাপদ। ফলে তাদের জন্য সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থাকে জীবনচক্রভিত্তিক, কর্মসংস্থান-সংবেদনশীল এবং দুর্যোগ-ঝুঁকিসাড়া করা জরুরি।


বুধপাড়া বস্তির বাসিন্দা রহিমা খাতুন (৬০) বলেন, “আমরা শহরে থাকি, শহরের কাজ করি কিন্তু সরকারি সুযোগ-সুবিধা সম্পর্কে অনেকেই জানি না। কোথায় গেলে কীভাবে আবেদন করতে হবে, কী কাগজ লাগবে এসব জানা নেই। কাগজপত্র বা ঠিকানার সমস্যায় যোগ্য হয়েও অনেক সময় সুবিধা পাই না। আমরা চাই, বস্তিতে এসে সরকার ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো আমাদের তথ্য দিক এবং আবেদন করতে সহায়তা করুক।”


আরেক বাসিন্দা জাহেদা বেগম (৫৫) বলেন, “আমাদের আয় প্রতিদিন একরকম নয়। কাজ না থাকলে আয় থাকে না। অসুস্থতা, দুর্ঘটনা, অতিরিক্ত গরম, বৃষ্টি-জলাবদ্ধতা বা আগুনে ক্ষতি হলে ঘুরে দাঁড়ানো কঠিন হয়ে পড়ে। বয়স্ক মানুষ, নারী, শিশু ও প্রতিবন্ধী সদস্য থাকা পরিবারগুলো আরও বেশি সমস্যায় পড়ে। আমরা চাই সামাজিক সুরক্ষা শুধু কাগজে না থেকে বাস্তবে আমাদের মতো দরিদ্র মানুষের কাছে পৌঁছাক।”


রাহেলা বেগম (৬২) বলেন, “সেবার জন্য কাউন্সিলর এর অফিসে গেলে কাগজ ঠিক নাই, এখন হবে না বলে আমাদের বিদায় দেন। বার বার ঘোরাঘুরি করে আমরা আর যাই না।”


বরেন্দ্র ইয়ুথ ফোরামের সভাপতি মো. আতিকুর রহমান বলেন, “সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির উদ্দেশ্যই হলো সমাজের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ মানুষকে সুরক্ষা দেওয়া। কিন্তু তথ্য, কাগজপত্র, ঠিকানা বা প্রশাসনিক জটিলতার কারণে নগরের বস্তিবাসী যদি এই সুবিধা থেকে বাদ পড়েন, তাহলে তা শুধু প্রশাসনিক ঘাটতি নয় সামাজিক বৈষম্যেরও বহিঃপ্রকাশ। নগর দরিদ্রদের জন্য সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা, সহজ আবেদনপ্রক্রিয়া ও স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তাদের ঝুঁকি বাড়ছে; তাই সামাজিক সুরক্ষাকে জলবায়ু অভিযোজনের সঙ্গেও যুক্ত করতে হবে।”


বারসিকের প্রোগ্রাম অফিসার অমিত সরকার বলেন, “বস্তিবাসীদের দারিদ্র্যকে শুধু আয় দিয়ে পরিমাপ করলে তাদের প্রকৃত ঝুঁকির চিত্র পাওয়া যাবে না। অনিরাপদ বাসস্থান, অনিয়মিত আয়, স্বাস্থ্যঝুঁকি, পানি ও স্যানিটেশনের সীমাবদ্ধতা, অগ্নিকাণ্ড, জলাবদ্ধতা ও তাপপ্রবাহ—সব মিলিয়ে তারা বহুমাত্রিক ঝুঁকিতে বসবাস করেন। তাই সামাজিক সুরক্ষায় শুধু তালিকা তৈরি নয়; তথ্য, কাগজপত্র, আবেদন, যাচাই ও অর্থপ্রাপ্তির প্রতিটি ধাপে সহায়ক ব্যবস্থা প্রয়োজন।”


সভা থেকে প্রধান দাবিসমূহ-

রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের আওতাধীন সকল বস্তি ও অনানুষ্ঠানিক বসতিতে সম্ভাব্য সামাজিক সুরক্ষা সুবিধাভোগীদের হালনাগাদ তালিকা তৈরি করতে হবে; যোগ্য সকল বয়স্ক, বিধবা, স্বামী নিগৃহীতা/দুঃস্থ নারী, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, গর্ভবতী ও দুগ্ধদানকারী মা এবং দরিদ্র শিক্ষার্থীদের সংশ্লিষ্ট কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে; বস্তি এলাকায় তথ্যসেবা, সহায়তা ডেস্ক ও সহজ আবেদনপ্রক্রিয়া চালু করতে হবে; জাতীয় পরিচয়পত্র, জন্মনিবন্ধন, ব্যাংক বা মোবাইল আর্থিক হিসাবসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র তৈরিতে দরিদ্র মানুষকে সহায়তা করতে হবে; নগর দরিদ্র ও বস্তিবাসীদের জন্য সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিতে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা ও পর্যাপ্ত বরাদ্দ নিশ্চিত করতে হবে; সুবিধাভোগী নির্বাচনে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং স্থানীয় বস্তিবাসীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে; তাপপ্রবাহ, জলাবদ্ধতা, অগ্নিকাণ্ডসহ নগর দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত দরিদ্র পরিবারের জন্য ঝুঁকিসাড়া ও অভিযোজনমূলক সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা চালু করতে হবে; নগর উন্নয়ন, আবাসন, পুনর্বাসন ও জলবায়ু অভিযোজন পরিকল্পনায় বস্তিবাসীদের অর্থবহ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।


সভা থেকে রাজশাহী সিটি কর্পোরেশন, জেলা প্রশাসন, সমাজসেবা অধিদপ্তর, মহিলা ও শিশু বিষয়ক সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানসহ সামাজিক সুরক্ষা বাস্তবায়নকারী সকল সরকারি সংস্থার প্রতি আহ্বান জানানো হয় বস্তিবাসী ও নগর দরিদ্রদের সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্তির প্রতিবন্ধকতা চিহ্নিত করে দ্রুত সমন্বিত পদক্ষেপ নেয়ার আহ্বান জানানো হয়।


বক্তারা বলেন, নগরের দরিদ্র মানুষকে বাদ দিয়ে অন্তর্ভুক্তিমূলক, ন্যায়ভিত্তিক ও জলবায়ু-সহনশীল রাজশাহী গড়ে তোলা সম্ভব নয়। তাই বস্তিবাসীদের শুধু সুবিধাভোগী নয়, বরং অধিকারসম্পন্ন নাগরিক ও নগর উন্নয়নের অংশীদার হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে।

রাজশাহী মহানগরীর বস্তিতে বসবাসরত নিম্নআয়ের ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ এখনো এসব কর্মসূচির কার্যকর সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।