বাংলাদেশ রেলওয়ের নিরাপত্তা বাহিনীতে (আরএনবি) বদলি ও পদায়ন ঘিরে আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ নতুন করে সামনে এসেছে। সংশ্লিষ্ট কয়েকজন সদস্যের দাবি, পছন্দের কর্মস্থলে বদলি, নির্ধারিত বদলি ঠেকানো কিংবা প্রশাসনিক সুবিধা পেতে ৩০ হাজার টাকা থেকে শুরু করে কয়েক লাখ টাকা পর্যন্ত ‘দরদাম’ হয়। অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের আরএনবির চীফ কমান্ড্যান্ট মো. জহিরুল ইসলাম।
শুধু বর্তমান পূর্বাঞ্চল নয়, জহিরুল ইসলামকে ঘিরে অতীতেও বদলি, পদায়ন, র্যাংক ও নিয়োগ নিয়ে নানা অভিযোগ প্রকাশ্যে এসেছে। এর মধ্যে ২০২৪ সালে পশ্চিমাঞ্চলে তাঁর বদলির সময় আরএনবি সদস্যদের কথিত অর্থ ফেরতের দাবি, ২০২১ সালে পূর্বাঞ্চল থেকে পশ্চিমাঞ্চলে বদলি এবং ১৮৫ সিপাহি নিয়োগসংক্রান্ত দুদকের মামলার তথ্যও রয়েছে। ফলে একই কর্মকর্তাকে ঘিরে একাধিক সময়ে ওঠা অভিযোগগুলো এখন নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
‘পছন্দের পোস্টিং’-এর জন্য ৩০ হাজার থেকে কয়েক লাখ
আরএনবির একাধিক সদস্যের অভিযোগ, বদলি এখন অনেক ক্ষেত্রে শুধু প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। পছন্দের স্টেশনে যেতে কিংবা নির্ধারিত বদলি বাতিল করতে নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের মাধ্যমে যোগাযোগ করতে হয়। এ ক্ষেত্রে ৩০ হাজার টাকা থেকে শুরু করে কয়েক লাখ টাকা পর্যন্ত লেনদেনের কথা তাঁদের কাছে এসেছে বলে দাবি তাঁদের।
তবে এসব অর্থ লেনদেনের স্বাধীন ও প্রত্যক্ষ প্রমাণ এই প্রতিবেদকের হাতে আসেনি। অভিযোগকারীদের অনেকেই প্রতিশোধমূলক বদলি, বিভাগীয় ব্যবস্থা কিংবা কর্মস্থলে হয়রানির আশঙ্কায় নাম প্রকাশ করতে চাননি।
২০২৬ সালের জানুয়ারিতে ৫, ১৮, ২১ ও ২৬ তারিখে কয়েক দফায় আরএনবি সদস্যদের বদলির তথ্য পাওয়া গেছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, এসব বদলির কয়েকটির ক্ষেত্রেও আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে।
ছয় মাসেই বদলি, এক বছর না পেরোতেই কর্মস্থল পরিবর্তন:-
আরএনবির সাম্প্রতিক কয়েকটি বদলি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন সদস্যদের একাংশ।তাঁদের দাবি, সিপাহি সুমন দাশ গুপ্ত আরএনবির গোয়েন্দা শাখায় যোগ দেওয়ার মাত্র ছয় মাসের মধ্যে পটিয়া রেলওয়ে স্টেশনে বদলি হয়েছেন।
মীর হোসাইনকে ২০২৫ সালের ২৬ এপ্রিল লাকসাম থেকে চট্টগ্রাম রেলওয়ে স্টেশনে বদলি করা হয়। এক বছরের কিছু বেশি সময় পর ২০২৬ সালের ১৪ জুন তাঁকে আবার লাকসামে বদলি করা হয় বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
অন্যদিকে ২০২৫ সালের ৭ আগস্ট পাহাড়তলী রেলওয়ে স্টেশনে যোগ দেওয়া আনন্দ বড়ুয়াকেও এক বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই ২০২৬ সালের ৯ জুন পটিয়া রেলওয়ে স্টেশনে বদলি করা হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
সদস্যদের প্রশ্ন—কোনো কর্মস্থলে ন্যূনতম দায়িত্বকাল শেষ হওয়ার আগেই এসব বদলির প্রয়োজন কেন দেখা দিচ্ছে? বদলির প্রশাসনিক কারণ কী, আর এসব সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে কোনো অভিন্ন নীতিমালা অনুসরণ করা হয়েছে কি না—তা প্রকাশের দাবি উঠেছে।
পশ্চিমাঞ্চলেও ছিল বদলি নিয়ে বিতর্ক:-
জহিরুল ইসলামের বিরুদ্ধে বদলি-পদায়ন নিয়ে অভিযোগের সূত্র শুধু বর্তমান পূর্বাঞ্চলে সীমাবদ্ধ নয়। ২০২১ সালের ৩১ মে রেলওয়ের এক আদেশে পূর্বাঞ্চলের চীফ কমান্ড্যান্ট জহিরুল ইসলামকে পশ্চিমাঞ্চলের চীফ কমান্ড্যান্ট এবং পশ্চিমাঞ্চলের চীফ কমান্ড্যান্ট আশাবুল ইসলামকে পূর্বাঞ্চলে বদলি করা হয়েছিল।
এরপর ২০২৪ সালের আগস্টে আবারও জহিরুল ইসলামকে পূর্বাঞ্চল থেকে পশ্চিমাঞ্চলের চীফ কমান্ড্যান্ট হিসেবে বদলি করা হয়। ওই সময় তাঁর বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ তুলে আরএনবি সদস্যদের একাংশ অপসারণের দাবি করেছিলেন বলে সংবাদমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। বদলির খবর ছড়িয়ে পড়ার পর কথিত ‘ঘুষের’ টাকা ফেরতের দাবিতে সদস্যদের চট্টগ্রামের সিআরবি কার্যালয়ে জড়ো হওয়ার কথাও একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছিল।
তৎকালীন রেলওয়ের মহাপরিচালকও বলেছিলেন, তাঁর বিরুদ্ধে অন্য কোনো অভিযোগ থাকলে তা তদন্ত করে দেখা হবে এবং অনিয়ম-দুর্নীতির বিষয়ে রেলওয়ে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অনুসরণ করে।
অর্থাৎ, পশ্চিমাঞ্চলে দায়িত্ব পালনের সময়ও তাঁকে ঘিরে অভিযোগ ও বিতর্কের তথ্য প্রকাশ্যে এসেছিল—যা বর্তমান বদলি-বাণিজ্যের অভিযোগকে আরও গুরুত্বের সঙ্গে যাচাই করার প্রয়োজনীয়তা তৈরি করেছে।
বদলি থেকে র্যাংক—পুরোনো অভিযোগের বিস্তার:-
জহিরুল ইসলামকে ঘিরে শুধু বদলি নয়, আরএনবিতে র্যাংক ও অন্যান্য প্রশাসনিক সুবিধা নিয়েও অতীতে অভিযোগ প্রকাশিত হয়েছে।
২০২৫ সালের একটি প্রতিবেদনে আরএনবিতে পদোন্নতি ছাড়াই র্যাংক দেওয়ার অভিযোগের প্রসঙ্গে জহিরুল ইসলামের পূর্ববর্তী দায়িত্বকাল এবং তাঁর সময়ে বদলি ও র্যাংক নিয়ে প্রশ্ন ওঠার কথা উল্লেখ করা হয়।
এ ছাড়া ২০২৪ সালের একটি প্রতিবেদনে বদলি-বাণিজ্য, র্যাংক-বাণিজ্যসহ বিভিন্ন অভিযোগের কথা উল্লেখ করে তাঁর বিরুদ্ধে সদস্যদের ক্ষোভের তথ্য প্রকাশিত হয়েছিল।
টাকা নেওয়ার পর ফেরত দেওয়ার অভিযোগ:-
বদলি, পদোন্নতি, র্যাংক ব্যাজ কিংবা চাকরি পাইয়ে দেওয়ার আশ্বাসে অর্থ নেওয়ার পর কয়েকজনকে সেই টাকা ফেরত দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের দাবি, মোমিন, বেলাল, আল-আমিন, ওয়াদুদ, তুহিন ও প্রশন্ন নামের কয়েকজনের কাছ থেকে নেওয়া অর্থ কোনো এক পর্যায়ে ফেরত দেওয়া হয়। এসব অর্থ ফেরতের ঘটনায় চীফ কমান্ড্যান্টের দপ্তরের প্রশাসনিক কর্মকর্তা ইমাম হোসেনের নামও তাঁরা উল্লেখ করেছেন।
অভিযোগের বিষয়ে জহিরুল ইসলামের বক্তব্য জানতে একাধিকবার ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি। প্রশাসনিক কর্মকর্তা ইমাম হোসেনের সঙ্গেও যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। পরে খুদে বার্তায় যোগাযোগ করা হলে অভিযোগগুলোর বিষয়ে তিনি বক্তব্য না দিয়ে চায়ের দাওয়াত দেন।
ইন্সপেক্টর বদলিতেও অর্থের অভিযোগ:-
পশ্চিমাঞ্চল থেকে পূর্বাঞ্চলে বদলি হয়ে আসার সময় কয়েকজন ইন্সপেক্টরের কাছ থেকেও বদলি, পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সুবিধা দেওয়ার আশ্বাসে অর্থ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা দাবি করেছেন।
এমনকি পূর্বাঞ্চলে ইন্সপেক্টর পদে শূন্যতা না থাকা সত্ত্বেও পশ্চিমাঞ্চল থেকে ইন্সপেক্টর মনির হোসেন রাহাতকে বড় অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে পূর্বাঞ্চলে পদায়নের গুঞ্জনের কথাও জানিয়েছেন তাঁরা।
তবে এই অভিযোগের স্বাধীন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
১৮৫ সিপাহি নিয়োগে দুদকের মামলা:-
জহিরুল ইসলামকে ঘিরে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নথিভুক্ত বিষয়গুলোর একটি হলো আরএনবির ১৮৫ সিপাহি নিয়োগে অনিয়মের মামলা।
২০১৭ সালের ওই নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ২০২২ সালের ২৮ আগস্ট জহিরুল ইসলামসহ পাঁচজনের বিরুদ্ধে মামলা করে। মামলায় তাঁকে নিয়োগ কমিটির সদস্য হিসেবে আসামি করা হয়।
দুদকের অভিযোগ ছিল, নিয়োগ প্রক্রিয়ায় যোগ্য প্রার্থীকে বাদ দিয়ে অযোগ্য প্রার্থীকে উত্তীর্ণ দেখানো হয়েছে।
তবে জহিরুল ইসলাম পরে গণমাধ্যমকে বলেছিলেন, ১৮৫ সিপাহি নিয়োগে কোনো অনিয়ম-দুর্নীতি হয়নি এবং দুদকের মামলার বিষয়ে তিনি আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হচ্ছেন।
অতএব, মামলা থাকা অভিযোগের একটি নথিভুক্ত তথ্য হলেও আদালতের চূড়ান্ত রায় না হওয়া পর্যন্ত সেটিকে প্রমাণিত অপরাধ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
সম্পদের অনুসন্ধানেও দুদক:-
জহিরুল ইসলাম ও তাঁর স্ত্রী কাজী জিন্নাতুন নাহারের সম্পদের বিষয়েও দুদকের অনুসন্ধানের তথ্য প্রকাশিত হয়েছে।
২০২৩ সালের এক প্রতিবেদনে দুদকের কর্মকর্তার বরাত দিয়ে বলা হয়, জহিরুল ইসলামের বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অনুসন্ধান চলছিল এবং তাঁর কাছে সম্পদের বিষয়ে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছিল। একই প্রতিবেদনে স্বামী-স্ত্রীর নামে প্রায় সোয়া চার কোটি টাকার সম্পদের তথ্য পাওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়।
প্রতিবেদনটিতে ঢাকার মিরপুরের সেনপাড়া মৌজায় একটি বাড়িতে অংশীদারত্ব এবং শহীদবাগে একটি ফ্ল্যাটসহ জহিরুল ইসলামের সম্পদের তথ্য এবং তাঁর স্ত্রীর নামে কুমিল্লা ও ঢাকায় সম্পদের তথ্য উল্লেখ করা হয়েছিল।
রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে বদলি ঠেকানোর অভিযোগ:-
জহিরুল ইসলামের বদলি ঠেকাতে তাঁর ভাই আমিনুল ইসলাম সুজন রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করেছিলেন—এমন অভিযোগও সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে পাওয়া গেছে।
তাঁদের দাবি, স্থানীয় রাজনীতিতে সুজনের অবস্থান ও তৎকালীন প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে যোগাযোগ ব্যবহার করে জহিরুল ইসলামের বদলি ঠেকানোর চেষ্টা করা হয়েছিল।
তবে এ অভিযোগের স্বাধীন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
চাকরিজীবনের শুরু সাঁটমুদ্রাক্ষরিক পদে:-
জহিরুল ইসলামের চাকরিজীবন শুরু হয় ১৯৯০ সালে সাঁটমুদ্রাক্ষরিক কাম টাইপিস্ট পদে। ২০০০ সালে দ্বিতীয় শ্রেণির পদে পদোন্নতি পান তিনি। ২০০২ সালের ১০ সেপ্টেম্বর ২১তম বিসিএস নন-ক্যাডার হিসেবে সহকারী কমান্ড্যান্ট পদে যোগ দেন। ২০০৬ সালে কমান্ড্যান্ট এবং ২০২০ সালে চীফ কমান্ড্যান্ট পদে দায়িত্ব পান বলে প্রকাশিত তথ্যে উল্লেখ রয়েছে।
‘অভিযোগ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’:-
জহিরুল ইসলামের দাবি সাম্প্রতিক বদলি-বাণিজ্যের অভিযোগের বিষয়ে জহিরুল ইসলাম গণমাধ্যমে এসব অভিযোগকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও সঠিক নয় বলে দাবি করেছেন। ফলে তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের পাশাপাশি তাঁর বক্তব্যও তদন্তের অংশ হওয়া জরুরি।
তদন্তের দাবি, প্রয়োজন নথি যাচাই:-
একই কর্মকর্তাকে ঘিরে বিভিন্ন সময়ে বদলি, পদায়ন, র্যাংক, নিয়োগ ও সম্পদ নিয়ে অভিযোগ প্রকাশ্যে আসার পর মূল প্রশ্ন এখন—এসব অভিযোগের কতটা সত্য?
রেলওয়ের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ চাইলে সাম্প্রতিক কয়েক বছরের বদলি ও পদায়নের আদেশ, সংশ্লিষ্ট সদস্যদের পূর্ববর্তী ও পরবর্তী কর্মস্থল, দায়িত্বকাল, বদলির কারণ এবং অনুমোদনকারী কর্তৃপক্ষের নথি যাচাই করতে পারে।
একই সঙ্গে কথিত আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ থাকলে ব্যাংকিং লেনদেন, মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস, মধ্যস্থতাকারীদের যোগাযোগ এবং অভিযোগকারী সদস্যদের বক্তব্যও তদন্তের আওতায় আনা যেতে পারে।
কারণ অভিযোগ সত্য হলে তা শুধু একজন কর্মকর্তার অনিয়মের প্রশ্ন নয়; এটি রেলওয়ের নিরাপত্তা বাহিনীর প্রশাসনিক স্বচ্ছতা, সদস্যদের মনোবল এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে বদলি-পদায়নের নিরপেক্ষতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করবে।
আর অভিযোগগুলো মিথ্যা হলে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমেই সেটিও পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন।এছাড়া
অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে স্বাধীন তদন্তই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।