
সড়ক আছে, যানবাহন আছে, যোগাযোগ ব্যবস্থাও বিস্তৃত হচ্ছে—কিন্তু নিরাপদ সড়ক যেন এখনও অধরাই। রাজশাহী মহানগর ও জেলার জাতীয়, আঞ্চলিক ও জেলা সড়কে বেপরোয়া গতি, অব্যবস্থাপনা, অনিয়ন্ত্রিত হাট-বাজার, ফিটনেসবিহীন যানবাহন ও চালকদের অনিয়মের কারণে থামছে না মৃত্যুর মিছিল।
গত এক বছরে রাজশাহী মহানগর ও জেলায় ১৬৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় অন্তত ১৬০ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। একই সময়ে এসব দুর্ঘটনায় পুলিশ ১৬৯টি মামলা করেছে।
সড়ক দুর্ঘটনার এই পরিসংখ্যান কেবল সংখ্যা নয়:-
এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ১৬০টি পরিবারের স্বজন হারানোর বেদনা, অসংখ্য আহত মানুষের দীর্ঘমেয়াদি দুর্ভোগ এবং অর্থনৈতিক ক্ষতি। অথচ দুর্ঘটনা রোধে মূল সমস্যাগুলো চিহ্নিত হলেও কার্যকর ও টেকসই ব্যবস্থা নেওয়ার ঘাটতি রয়ে গেছে।
দুর্ঘটনার বড় অংশ মোটরসাইকেল ও ভারী যানবাহনে
রাজশাহী জেলা ও মহানগর পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গত এক বছরে জেলায় ১৩৫টি এবং মহানগর এলাকায় ৩৪টি সড়ক দুর্ঘটনা রেকর্ড হয়েছে। এর প্রায় অর্ধেকই মোটরসাইকেলকেন্দ্রিক। আর অন্তত ৪০টি দুর্ঘটনা ঘটেছে ট্রাক ও ডাম্প ট্রাকের ধাক্কায়।
সংশ্লিষ্টদের মতে, মোটরসাইকেল চালকদের বেপরোয়া গতি, হেলমেট ব্যবহারে অনীহা, ওভারটেকিংয়ের প্রবণতা এবং মহাসড়কে ভারী যানবাহনের সঙ্গে একই সড়ক ব্যবহারের কারণে ঝুঁকি বাড়ছে। অন্যদিকে ট্রাক, ডাম্প ট্রাক ও বালুবাহী যানবাহনের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত গতি, অতিরিক্ত পণ্য পরিবহন ও চালকদের দক্ষতার ঘাটতিও বড় উদ্বেগের কারণ।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ফিটনেসবিহীন যানবাহন:-
অনুমোদনহীন যান চলাচল এবং মহাসড়কে ইজিবাইক-অটোরিকশার অবাধ প্রবেশ।
সড়কের পাশে হাট-বাজার, দুর্ঘটনার আরেক ফাঁদ
রাজশাহীর জাতীয় ও আঞ্চলিক মহাসড়কের বিভিন্ন অংশে সড়কের একেবারে পাশে গড়ে উঠেছে হাট-বাজার, দোকানপাট ও বিভিন্ন স্থাপনা। ফলে মহাসড়কের একটি অংশ কার্যত পথচারী, ক্রেতা, ভ্যান, অটোরিকশা ও ধীরগতির যানবাহনের দখলে চলে যাচ্ছে।
এর সবচেয়ে ভয়াবহ উদাহরণ দেখা গেছে পুঠিয়ার ঝলমলিয়া বাজারে। ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি সকালে রাজশাহী-নাটোর মহাসড়কের পাশে ঝলমলিয়া কলার হাটে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে একটি বালুবাহী ট্রাক ঢুকে পড়ে। ট্রাকটি উল্টে গেলে চাপা পড়ে চারজন নিহত হন এবং আরও একজন গুরুতর আহত হন।
এ ধরনের ঘটনায় প্রশ্ন উঠছে—মহাসড়কের এত কাছাকাছি জনসমাগমপূর্ণ হাট-বাজার থাকলে সেখানে যানবাহনের গতি নিয়ন্ত্রণ, সেফটি ব্যারিয়ার, ফুটপাত বা নিরাপদ পারাপারের ব্যবস্থা কতটা কার্যকর?
দুর্ঘটনার পরই ক্ষোভ, তারপরও বদলায় না চিত্র:-
গত ৫ মে পুঠিয়ার বিড়ালদহ মাজার এলাকায় ঢাকা-রাজশাহী মহাসড়কে ডাম্প ট্রাকের ধাক্কায় একজন পথচারী নিহত হন। ঘটনার পর ক্ষুব্ধ স্থানীয়রা দুটি ডাম্প ট্রাকে আগুন দেন এবং মহাসড়ক অবরোধ করেন।
এ ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে, দুর্ঘটনা এখন শুধু ব্যক্তিগত শোকের বিষয় নয়; এটি স্থানীয় মানুষের মধ্যে দীর্ঘদিনের ক্ষোভ ও নিরাপত্তাহীনতারও বহিঃপ্রকাশ। দুর্ঘটনার পরপরই সড়ক অবরোধ, যানবাহনে আগুন কিংবা বিক্ষোভের ঘটনা ঘটলেও দুর্ঘটনার মূল কারণগুলো দূর না হওয়ায় কিছুদিন পর আবারও একই ধরনের ঘটনা ঘটছে।
২৮৮ কিলোমিটার জেলা সড়ক, নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনায় ঘাটতি:-
তথ্য অনুযায়ী, রাজশাহীতে রয়েছে প্রায় ৮৭ কিলোমিটার জাতীয় মহাসড়ক, ৪৪ কিলোমিটার আঞ্চলিক মহাসড়ক এবং ২৮৮ কিলোমিটার জেলা সড়ক। অর্থাৎ জেলার বিস্তৃত সড়ক নেটওয়ার্কের ওপর প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক যানবাহন চলাচল করছে।
কিন্তু যানবাহনের সংখ্যা ও চলাচল বাড়লেও সব সড়কে সমানভাবে গড়ে ওঠেনি নিরাপদ সড়ক ব্যবস্থাপনা। কোথাও সড়কের পাশে বাজার, কোথাও অপরিকল্পিত প্রবেশপথ, কোথাও ঝুঁকিপূর্ণ বাঁক, আবার কোথাও ধীরগতির যানবাহন ও ভারী যানবাহন একই লেনে চলাচল করছে।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষও নিয়মিত সড়ক ও মহাসড়কের দুর্ঘটনার প্রতিবেদন প্রকাশ করে আসছে, যা দেশে দুর্ঘটনা পর্যবেক্ষণ ও সড়ক নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনার প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি সামনে আনে।
পৃথক লেনের দাবি:-
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সাংগঠনিক সম্পাদক ও রাজশাহী ট্রাক-কাভার্ডভ্যান মালিক সমিতির সভাপতি আলামিন সরকার টিটু বলেন, ইজিবাইক ও অটোরিকশার জন্য পৃথক লেন না থাকায় মহাসড়কে ঝুঁকি বাড়ছে।
তিনি বলেন, সড়কের দুই পাশ দখল করে হাট-বাজার গড়ে ওঠা, অনভিজ্ঞ হেলপার দিয়ে গাড়ি চালানো এবং অতিরিক্ত মালামাল বহন দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ। এসব বিষয়ে কার্যকর নজরদারি ও আইন প্রয়োগ প্রয়োজন।
আইন প্রয়োগের পাশাপাশি দরকার চালকের দক্ষতা:-
‘নিরাপদ সড়ক চাই’ রাজশাহী জেলা শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক ডা. আমানুল্লাহ বিন আখতার আবিদ বলেন, এক লেনের সড়ক, চালকদের অসাবধানতা এবং আইন না মানার প্রবণতা দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে।
তার মতে, শুধু দুর্ঘটনার পর মামলা কিংবা জরিমানা করলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। চালকদের প্রশিক্ষণ, লাইসেন্স যাচাই, যানবাহনের ফিটনেস পরীক্ষা, গতি নিয়ন্ত্রণ এবং সড়কের ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলো চিহ্নিত করে অবকাঠামোগত পরিবর্তন আনতে হবে। পাশাপাশি পথচারী ও চালক—উভয়ের সচেতনতা বাড়ানো জরুরি।
যে ব্যবস্থা জরুরি:-
বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্টদের মতামতের আলোকে রাজশাহীর সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে কয়েকটি বিষয়ে জরুরি ভিত্তিতে নজর দেওয়া প্রয়োজন—
প্রথমত,- মহাসড়কের পাশের ঝুঁকিপূর্ণ হাট-বাজার ও অবৈধ স্থাপনা সরিয়ে নিরাপদ দূরত্ব নিশ্চিত করা।
দ্বিতীয়ত,-মহাসড়কে ইজিবাইক, অটোরিকশা ও অন্যান্য ধীরগতির যানবাহনের চলাচল নিয়ন্ত্রণ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী পৃথক লেন বা বিকল্প সড়কের ব্যবস্থা করা।
তৃতীয়ত,- ডাম্প ট্রাক, বালুবাহী ট্রাকসহ ভারী যানবাহনের গতি ও অতিরিক্ত পণ্য পরিবহনের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা।
চতুর্থত,- চালকের লাইসেন্স, দক্ষতা ও যানবাহনের ফিটনেস কঠোরভাবে যাচাই করা।
পঞ্চমত,-দুর্ঘটনাপ্রবণ স্থানগুলো চিহ্নিত করে সড়ক বিভাজক, সতর্কতামূলক সাইন, পর্যাপ্ত আলোকসজ্জা, ফুটপাত ও নিরাপদ পারাপারের ব্যবস্থা করা।
কারণ ১৬০টি প্রাণহানি শুধু পরিসংখ্যান নয়—প্রতিটি সংখ্যা একটি পরিবার, একটি স্বপ্ন এবং একটি অসমাপ্ত জীবনের গল্প। রাজশাহীর সড়ককে সত্যিকার অর্থে নিরাপদ করতে হলে দুর্ঘটনার পর ব্যবস্থা নেওয়ার বদলে দুর্ঘটনা ঘটার আগেই ঝুঁকি প্রতিরোধের সংস্কৃতি গড়ে তোলার বিকল্প নেই।