রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর (আরএনবি) কমান্ড্যান্ট মো. শহিদ উল্লাহকে ঘিরে একের পর এক অভিযোগ সামনে এসেছে। আরএনবি সদস্য নিয়োগে অনিয়ম, নিম্নমানের ইউনিফর্ম ও সরঞ্জাম কেনাকাটায় অনিয়ম, বিপুল অঙ্কের অর্থ আত্মসাৎ এবং জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। এসব অভিযোগের অনুসন্ধানে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) নথি তলবের একটি অফিসিয়াল চিঠিও প্রতিবেদকের হাতে এসেছে।
দুদকের বিভাগীয় কার্যালয়, ঢাকার ওই চিঠিতে আরএনবি কমান্ড্যান্ট শহিদ উল্লাহকে ঘিরে উত্থাপিত অভিযোগের অনুসন্ধানের জন্য বাংলাদেশ রেলওয়ের সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কাছে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ নথি ও তথ্য চাওয়া হয়েছে। নথিতে অভিযোগের সংক্ষিপ্ত বিবরণে আরএনবি সদস্যদের ইউনিফর্ম দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রায় ৩ কোটি টাকা আত্মসাৎ এবং দুর্নীতির মাধ্যমে সম্পদ অর্জনের অভিযোগের কথা উল্লেখ রয়েছে।
দুদকের নথিতে ৮ ধরনের তথ্য-রেকর্ড তলব:-
দুদকের চিঠির সঙ্গে থাকা তথ্য অনুযায়ী, অনুসন্ধানের স্বার্থে আরএনবি সদস্যদের জন্য বিভিন্ন অর্থবছরে কেনা ও বিতরণ করা ইউনিফর্মের কাপড়, টুপি, পিটি-শু, মোজা, গ্রেড কোট, রেইনকোট, ফগার মেশিন, হ্যান্ডমাইকসহ বিভিন্ন সামগ্রীর বরাদ্দ, ক্রয় ও বিতরণসংক্রান্ত রেকর্ডের সত্যায়িত কপি চাওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে এসব মালামাল ক্রয় ও বিতরণের নীতিমালা ও বিধিবিধানের সত্যায়িত কপিও চেয়েছে দুদক।
শুধু কেনাকাটার নথিতেই অনুসন্ধান সীমাবদ্ধ রাখা হয়নি। শহিদ উল্লাহর নিজের এবং সংশ্লিষ্ট পরিবারের সদস্যদের জন্মনিবন্ধন ও জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য, তাঁর কমান্ড্যান্ট হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের তারিখ, আরএনবিতে প্রথম যোগদানের তারিখ, পূর্ববর্তী কর্মস্থল এবং রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনীতে তাঁর চাকরিজীবনে অর্জিত সম্পদের তথ্যও চাওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া আরএনবি সদস্যদের নিয়োগসংক্রান্ত জব ডেসক্রিপশন/প্রজ্ঞাপন, সদস্যদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলার তথ্য এবং ঢাকা বিভাগের অধীন আরএনবির সব অফিসের সংশ্লিষ্ট অর্থবছরের বাজেট বরাদ্দ ও ব্যয়ের বিবরণীও অনুসন্ধানের আওতায় আনা হয়েছে।
অর্থাৎ, দুদকের নথি থেকে দেখা যায়, অনুসন্ধানটি কেবল একটি ইউনিফর্ম কেনাকাটাকে কেন্দ্র করে নয়; নিয়োগ, ক্রয়, বিতরণ, প্রশাসনিক দায়িত্ব, সম্পদ ও বাজেট ব্যয়—আরএনবির একাধিক কার্যক্রমকে ঘিরেই তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে।
তিন কোটি টাকার ইউনিফর্মের অভিযোগ:-
শহিদ উল্লাহর বিরুদ্ধে সবচেয়ে আলোচিত অভিযোগগুলোর একটি হলো আরএনবি সদস্যদের ইউনিফর্ম সরবরাহ। অভিযোগ রয়েছে, নিম্নমানের বা অনিয়মপূর্ণভাবে ইউনিফর্ম সরবরাহের মাধ্যমে প্রায় তিন কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে।
এ অভিযোগের অনুসন্ধানে দুদক বিভিন্ন অর্থবছরের ইউনিফর্ম ও সরঞ্জাম কেনাকাটা এবং বিতরণসংক্রান্ত নথি চেয়েছে। তবে অনুসন্ধান বা নথি তলবকে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার সমতুল্য বলা যাবে না। চূড়ান্ত তদন্তে কী পাওয়া গেছে, সেটিই হবে গুরুত্বপূর্ণ।
২০১৮ সালের নিয়োগ নিয়েও প্রশ্ন:-
শহিদ উল্লাহর বিরুদ্ধে ২০১৮ সালের আরএনবি সিপাহি নিয়োগকে কেন্দ্র করেও অনিয়মের অভিযোগ প্রকাশিত হয়েছে। ওই সময় ১৮৪ জন সিপাহি নিয়োগে অনিয়ম এবং তাঁর প্রভাবের মাধ্যমে ৮৩ জনকে নিয়োগ দেওয়ার অভিযোগ বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে আসে।
নিয়োগে অবৈধ লেনদেনের অভিযোগও করা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে আদালতের চূড়ান্ত রায় বা অপরাধ প্রমাণিত হওয়ার তথ্য পাওয়া যায়নি। ফলে বিষয়গুলো অভিযোগ হিসেবেই বিবেচ্য।
সম্পদের হিসাবেও অনুসন্ধান:-
শহিদ উল্লাহর বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগও রয়েছে। বিভিন্ন সংবাদ প্রতিবেদনে ঢাকায় তাঁর নামে পাঁচটি ফ্ল্যাট এবং কুমিল্লায় প্রায় ৩০ বিঘা জমি থাকার দাবি করা হয়েছে। তাঁর শাশুড়ির নামে ঢাকার অভিজাত এলাকায় ফ্ল্যাট থাকার বিষয়টিও অভিযোগ হিসেবে এসেছে।
দুদকের নথিতেও শহিদ উল্লাহ ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের পরিচয়-সংক্রান্ত তথ্যের পাশাপাশি তাঁর চাকরিজীবন, পূর্ববর্তী কর্মস্থল ও সম্পদসংক্রান্ত তথ্য চাওয়ার বিষয়টি রয়েছে।
কমলাপুর স্টেশন ঘিরেও অভিযোগ:-
শহিদ উল্লাহর দীর্ঘদিন ঢাকায় দায়িত্ব পালনকে কেন্দ্র করে আরও কিছু অভিযোগ সামনে এসেছে। অভিযোগ রয়েছে, ঢাকা (কমলাপুর) রেলস্টেশন এলাকায় হকার, মাদক ও টিকিট কালোবাজারি নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে তাঁর একটি প্রভাববলয় গড়ে ওঠে এবং সেখান থেকে অবৈধ আর্থিক সুবিধা নেওয়া হতো।
এ ছাড়া টঙ্গী থেকে নারায়ণগঞ্জ পর্যন্ত রেললাইনের দুই পাশে গড়ে ওঠা অবৈধ দোকান থেকে তাঁর লোকজনের মাধ্যমে চাঁদা আদায়ের অভিযোগও রয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন তদন্তের ফলাফল বা আদালতে প্রমাণিত হওয়ার তথ্য পাওয়া যায়নি। ফলে এগুলোও অভিযোগ হিসেবেই উপস্থাপনযোগ্য।
বদলি ঠেকাতে ঘুষের অডিও—দাবি:-
২০২৫ সালে ঢাকায় বদলি নিশ্চিত করতে রেলের তিন ছাত্র প্রতিনিধিকে ১০ লাখ টাকা ঘুষ দেওয়ার প্রস্তাবসংক্রান্ত একটি অডিও ছড়িয়ে পড়েছিল বলেও অভিযোগ রয়েছে। ওই অডিওতে কার কণ্ঠ ছিল, কথোপকথনের প্রেক্ষাপট কী এবং সেটি সত্য না সম্পাদিত—এসব বিষয়ে স্বাধীনভাবে যাচাই প্রয়োজন।
তাই অডিওর বিষয়টিকে নিশ্চিত ঘটনা হিসেবে নয়, ভাইরাল হওয়া অডিওকে কেন্দ্র করে ওঠা অভিযোগ হিসেবে দেখা উচিত।
দীর্ঘদিন ঢাকায় দায়িত্ব নিয়েও প্রশ্ন:-
প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, শহিদ উল্লাহ আরএনবির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দীর্ঘ সময় ঢাকায় দায়িত্ব পালন করেছেন। দীর্ঘদিন একই এলাকায় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকার কারণে তাঁর একটি শক্তিশালী প্রভাববলয় তৈরি হয়েছিল কি না—এ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
পরবর্তীতে তাঁকে ঢাকা থেকে চট্টগ্রামে বদলির খবর প্রকাশিত হয়। পরে বাংলাদেশ রেলওয়ের নথিতে তাঁকে আরএনবির গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকার তথ্য পাওয়া যায়।
জবাব দিয়েছেন শহিদ উল্লাহ:-
তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে শহিদ উল্লাহ সংবাদমাধ্যমকে বলেছেন, দুদক তাঁকে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে চিঠি দিয়েছে এবং তিনি তার জবাব দিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, তদন্ত হলেই অভিযোগের প্রকৃত সত্য বেরিয়ে আসবে এবং তিনি তদন্তকে স্বাগত জানান।
প্রশ্ন এখন তদন্তের ফল নিয়ে:-
রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর একজন গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তাকে ঘিরে যখন নিয়োগ, কেনাকাটা, বাজেট ব্যয়, সম্পদ ও স্টেশনকেন্দ্রিক কর্মকাণ্ড নিয়ে একাধিক অভিযোগ সামনে এসেছে, তখন দুদকের হাতে থাকা নথিগুলোকে ঘিরে তদন্তের ফলাফলই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষ করে তিন কোটি টাকার ইউনিফর্ম কেনাকাটার অভিযোগ, বিভিন্ন সরঞ্জাম ক্রয়-বিতরণ, নিয়োগসংক্রান্ত নথি, বিভাগীয় মামলা, বাজেট বরাদ্দ ও ব্যয় এবং শহিদ উল্লাহর চাকরিজীবন ও সম্পদসংক্রান্ত তথ্য—দুদকের চাওয়া এই আট ধরনের তথ্য অনুসন্ধানকে কতটা এগিয়ে নেয়, সেটিই দেখার বিষয়।
তবে মনে রাখতে হবে, দুদকের অনুসন্ধান, নথি তলব বা অভিযোগের অস্তিত্ব কোনো ব্যক্তির অপরাধ প্রমাণ করে না। অনুসন্ধান শেষে দুদক বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এবং আদালতের রায়ই হবে অভিযোগগুলোর আইনগত অবস্থান নির্ধারণের ভিত্তি।