Template: 3
Tpl 1 Tpl 2 Tpl 3
অনলাইন ডেস্ক | ৩১ আগস্ট ২০২৬
bijoybangla.news
logo
বিজয় বাংলা নিউজ
জাতীয় দৈনিক

অতিথি পাখিদের নিরাপত্তায় একজোট পুরো নাজিরপাড়া গ্রাম

কুয়েল ইসলাম সিহাত, পঞ্চগড় প্রতিনিধিঃ Entire Nazirpara village unites to protect migratory birds

সন্ধ্যা নামছে, পাখিদের আশ্রয় নাজিরপাড়া গ্রামে। আকাশজুড়ে দলবদ্ধ পাখির ওড়াউড়ি, চারপাশে শুধু কিচিরমিচির আর ডানা ঝাপটানোর সুর। এই সৌন্দর্যের পেছনে রয়েছে এক অন্য রকম গল্প।

পঞ্চগড়ের বোদা উপজেলার নাজিরপাড়া গ্রামে সাধারণ মানুষ নিজেরাই হয়ে উঠেছেন অতিথি পাখিদের রক্ষক। প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসা থেকেই তারা এসব পাখির নিরাপত্তা দিচ্ছেন, গড়ে তুলেছেন এক অনন্য উদাহরণ।

উপজেলার নাজিরপাড়া গ্রামে গাছ ও বাঁশঝাড়জুড়ে শত শত পাখির বাসা। বড় বড় গাছের ডালে শত শত বাসা। কোথাও ছানার মুখে খাবার তুলে দিচ্ছে মা পাখি, আবার কোথাও ঝাঁকে ঝাঁকে উড়ছে বিভিন্ন প্রজাতির পাখি। এসব নানা প্রজাতির পাখি এলেও এর মধ্যে শামুকখোল, পানকৌড়ি ও বালিহাঁসই বেশি।

সকাল-সন্ধ্যা মুখর থাকে তাদের কলকাকলিতে। পাখিদের নিরাপদ রাখতে একজোট গ্রামের মানুষ, যেন পাখিরাও এখন এই গ্রামের পরিবারেরই একজন। এ দৃশ্য এখন নাজিরপাড়ার মানুষের কাছে নতুন কিছু নয়। বরং পাখিদের আগমনের অপেক্ষায় থাকেন গ্রামের বাসিন্দারা। কারণ প্রায় এক যুগ ধরে বছরের নির্দিষ্ট সময়ে শত শত দেশি-বিদেশি পাখির নিরাপদ আশ্রয় হয়ে উঠেছে নাজিরপাড়ায়। কোথাও ডিমে তা দিচ্ছে মা পাখি, কোথাও ছানাদের নিয়ে ব্যস্ত তারা। আর নিচে দাঁড়িয়ে সেই দৃশ্য উপভোগ করেন এলাকার মানুষ সহ দর্শনার্থীরা। পাখিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তারাও যেন নীরব প্রহরী।

গ্রামের লোকজন জানান, প্রতি বছর জুন-জুলাই মাসে পাখিগুলো নাজিরপাড়ায় এসে বাসা বাঁধে। ডিম পেড়ে ছানা ফোটায়। প্রায় ৬ থেকে ৭ মাস অবস্থান করার পর নভেম্বর-ডিসেম্বর মাসে বংশবিস্তার শেষ করে আবার নিজ আবাসস্থলে ফিরে যায়। বছরের পর বছর একই নিয়মে পাখিদের এই আসা-যাওয়া চলছে। নিরাপদ পরিবেশ ও পর্যাপ্ত খাবার পাওয়ায় পাখিগুলোও যেন নাজিরপাড়াকে নিজেদের আপন ঠিকানা করে নিয়েছে।

বোদা হাই স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক ও নাজিরপাড়ার বাসিন্দা তমিজদার রহমান খোকা বলেন, প্রায় প্রায় ১০ থেকে ১৫ বছর ধরে এখানে শামুকখোল, পানকৌড়ি সহ বিভিন্ন প্রজাতির পাখি আসছে। এসব পাখি দেখতে সাংবাদিক, প্রশাসনের কর্মকর্তা এবং বিভিন্ন এলাকার মানুষ আসেন। অনেকে পাখি শিকার করতে এলেও গ্রামের মানুষ কোনোভাবেই পাখি শিকার করতে দেন না।

তিনি আরও বলেন, সকালে পাখির ডাকেই আমাদের ঘুম ভাঙে। পাখির মলমূত্রের কারণে কিছুটা অসুবিধা হলেও গ্রামের মানুষ তা মেনে নিয়েছেন। তবে পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখতে প্রশাসনের আরো উদ্যোগ প্রয়োজন। গ্রামের মানুষ নিয়মিত পাখিদের খাবারও দেন।

পাখি দেখতে আসা জয়নাল আবেদীন জানান, দেখে খুবই ভালো লাগছে। শত শত পাখির কিচিরমিচির শব্দে তিনি মোহিত। এসব পাখি যেন নিজের মতো করে থাকতে পারে, কেউ যেন বিরক্ত না করে। এলাকাবাসী যেন তাদের দেখেশুনে রাখেন। ওরা আমাদের মেহমান আমরা যেন সেটা ভুলে না যাই।

বোদা পাথরাজ সরকারি কলেজের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক রওশন আরা বেগম জানান, পরিযায়ী পাখি শীতপ্রধান দেশগুলো থেকে বাংলাদেশে আসে। খাবার সংকট, বংশবৃদ্ধি ও নিরাপদ পরিবেশ পাওয়ায় পাখিগুলো প্রতিবছর তারা এখানে আসে। বংশবৃদ্ধি হয়ে গেলে তারা উপযুক্ত আবহাওয়ায় ফিরে যায়। এরা শামুক, ছোট মাছ, পোকামাকড় খেয়ে জীবন ধারণ করে। এসব পাখি পরিবেশের জন্য অত্যন্ত উপকারী। এরা মলত্যাগ করলেও মাটির উর্বরতা বৃদ্ধি পায়।

বোদা উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. রবিউল ইসলাম জানান, নাজিরপাড়া প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যে সমৃদ্ধ একটি এলাকা। দীর্ঘদিন ধরে বছরের নির্দিষ্ট সময়ে বিভিন্ন প্রজাতির অতিথি পাখি এখানে এসে বাসা বাঁধে ও বংশবিস্তার করে। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে একাধিকবার এলাকাটি পরিদর্শন করে স্থানীয়দের সচেতন করা হয়েছে। স্থানীয়রাও পাখিগুলোর নিরাপত্তার বিষয়ে আন্তরিক। কেউ যাতে পাখিদের বিরক্ত না করে, সে বিষয়ে তারা বাইরের দর্শনার্থী ও পর্যটকদেরও সচেতন করেন। পাখিগুলো যে গাছগুলোতে বাসা বাঁধে, সেসব গাছ সংরক্ষণের জন্য বাসিন্দাদের অনুরোধ জানানো হয়েছে।

নাজিরপাড়ার গাছপালা আর পাখিদের এই সহাবস্থান যেন প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের এক নীরব চুক্তি। পাখিরা আসে, সংসার গড়ে, ছানা বড় করে আবার তাদের নিজ আবাসস্থলে ফিরে যায়। আর তাদের ফেরার অপেক্ষায় থাকে পুরো গ্রাম। এভাবেই বছরের পর বছর নাজিরপাড়া হয়ে উঠেছে পাখিদের নিরাপদ ঠিকানা—যেখানে অতিথি হয়ে আসা পাখিরাও ধীরে ধীরে পরিবারেরই একজন হয়ে গেছে।

© বিজয় বাংলা নিউজ
bijoybangla.news