Template: 2
Tpl 1 Tpl 2 Tpl 3
logo
বিজয় বাংলা নিউজ
bijoybangla.news
১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
০৮:০৩ অপরাহ্ন

হাসপাতালের চাপ থেকে ‘মেডিকেল ইকোনমি’—রাজশাহীর সামনে নতুন সম্ভাবনা

আবুল কালাম আজাদ , রাজশাহী:- 'Medical Economy' from Hospital Pressure

উত্তরাঞ্চলের মানুষের উন্নত চিকিৎসার অন্যতম প্রধান গন্তব্য রাজশাহী। শুধু রাজশাহী জেলা নয়, আশপাশের জেলা এবং উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকা থেকে প্রতিদিন রোগী আসেন নগরীর হাসপাতালগুলোতে। বিশেষ করে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল (আরএমসিএইচ) দীর্ঘদিন ধরে এই অঞ্চলের জটিল ও বিশেষায়িত চিকিৎসার প্রধান ভরসা।

কিন্তু রোগীর চাপের তুলনায় চিকিৎসা অবকাঠামো এখনও অপ্রতুল। ১ হাজার ২০০ শয্যার আরএমসিএইচে অনেক সময় ৫ হাজারের বেশি রোগীকে চিকিৎসা দিতে হয়। 

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, রাজশাহী বিভাগে সরকারি হাসপাতালগুলোতে মোট শয্যা রয়েছে ৬ হাজার ৫২০টি। বিভাগের ৫৯টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সেও চিকিৎসক সংকট রয়েছে। ফলে তৃতীয় স্তরের চিকিৎসার জন্য রাজশাহীমুখী মানুষের চাপ ক্রমেই বাড়ছে।

আইসিইউ সংকট:-

সবচেয়ে প্রকট সংকট দেখা যাচ্ছে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ)। ২০২৬ সালের মার্চে আরএমসিএইচের ৪০টি আইসিইউ শয্যার বিপরীতে রোগীর চাপ ছিল কয়েক গুণ বেশি। হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, ওই মাসে শিশুদের আইসিইউতে ১১৯ জন ভর্তি হলেও অপেক্ষমাণ ছিল ৩৮৬ শিশু; তাদের মধ্যে ৯১ জন মারা যায়। প্রাপ্তবয়স্ক ও বয়স্ক রোগীদের ক্ষেত্রেও ২৭৮ জন ভর্তি হলেও অপেক্ষমাণ ছিলেন ৬১৪ জন এবং অপেক্ষমাণ তালিকায় থাকা ১৩৮ জনের মৃত্যু হয়।

এই সংকটের মধ্যেই রাজশাহীতে চিকিৎসা অবকাঠামো সম্প্রসারণের উদ্যোগও চলছে। আরএমসিএইচ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, রোগীর ক্রমবর্ধমান চাপ মোকাবিলায় ১৪ তলা ক্যানসার, কিডনি ও হার্ট সেন্টার, রেডিওলজি ও ইমেজিং সেন্টার এবং ৪০ শয্যার আধুনিক ক্রিটিক্যাল কেয়ার সেন্টারসহ বিভিন্ন অবকাঠামো গড়ে তোলা হচ্ছে।

অন্যদিকে শিশু চিকিৎসায় চাপ সামলাতে নতুন উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। আরএমসিএইচে শিশুদের আইসিইউ শয্যা ১২ থেকে বাড়িয়ে ১৮ করা হয়েছে। পাশাপাশি দীর্ঘদিন অব্যবহৃত থাকা রাজশাহী শিশু হাসপাতাল চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যেখানে আরও ১২টি আইসিইউ শয্যার ব্যবস্থা থাকার কথা।

শুধু চিকিৎসা নয়, বড় অর্থনৈতিক খাত:-

বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টিতে, এই ক্রমবর্ধমান রোগীপ্রবাহকে শুধু স্বাস্থ্যসেবার সংকট হিসেবে দেখলে রাজশাহীর বড় একটি সম্ভাবনা অদৃশ্য থেকে যাবে। একটি পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে উঠলে এর সঙ্গে সরাসরি ও পরোক্ষভাবে যুক্ত হতে পারে বিপুলসংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থান ও ব্যবসা।

হাসপাতাল মানেই শুধু চিকিৎসক-নার্সের চাকরি নয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয় মেডিকেল টেকনোলজিস্ট, ফার্মাসিস্ট, ল্যাব কর্মী, নার্সিং পেশাজীবী, অ্যাম্বুলেন্স চালক, হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা, আইটি ও স্বাস্থ্যপ্রযুক্তি, মেডিকেল সরঞ্জাম সরবরাহ, ওষুধ, খাবার, পরিচ্ছন্নতা, নিরাপত্তা, রোগীর স্বজনদের আবাসন ও পরিবহনসহ অসংখ্য সেবা।

ফলে পরিকল্পিতভাবে চিকিৎসা অবকাঠামো সম্প্রসারণ করা গেলে এর প্রভাব হাসপাতালের দেয়ালের বাইরেও ছড়িয়ে পড়তে পারে। গড়ে উঠতে পারে ডায়াগনস্টিক সেন্টার, নার্সিং ও প্যারামেডিক্যাল প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান, মেডিকেল সরঞ্জাম সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান, ফার্মাসিউটিক্যাল ডিস্ট্রিবিউশন, মেডিকেল সফটওয়্যার ও টেলিমেডিসিনভিত্তিক প্রতিষ্ঠানসহ নানা ধরনের ব্যবসা।

রাজশাহীতে ইতোমধ্যে সরকারি প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি বেসরকারি চিকিৎসা ও মেডিকেল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও রয়েছে। বেসরকারি খাতে বারিন্দ মেডিকেল কলেজ অ্যান্ড হাসপাতালসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান আধুনিক চিকিৎসা ও প্রশিক্ষণ অবকাঠামো সম্প্রসারণ করছে।

ঢাকামুখী রোগীর চাপ কমানোর সুযোগ:-

রাজশাহীর সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা এখানেই। বর্তমানে জটিল রোগের চিকিৎসার জন্য উত্তরাঞ্চলের অনেক রোগীকে ঢাকায় যেতে হয়। অথচ রাজশাহীতে যদি হৃদরোগ, ক্যানসার, কিডনি, নিউরোসার্জারি, শিশু চিকিৎসা, বার্ন, ট্রমা ও অন্যান্য বিশেষায়িত চিকিৎসার সক্ষমতা আরও বাড়ানো যায়, তাহলে রোগীর চিকিৎসা ব্যয় যেমন কমতে পারে, তেমনি কমবে রোগী ও স্বজনদের ঢাকায় যাতায়াতের চাপ।

রাজশাহী মেডিকেল কলেজের নিজস্ব তথ্যেও প্রতিষ্ঠানটির হাসপাতালকে উত্তরাঞ্চলে উন্নত চিকিৎসাসেবার কেন্দ্রীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

রাজশাহীর সামনে শুধু হাসপাতালের সংখ্যা বাড়ানোর প্রশ্ন নেই; প্রশ্ন হলো—কী ধরনের হাসপাতাল, কী মানের চিকিৎসা এবং কোন কোন বিশেষায়িত সেবা এখানে গড়ে উঠবে।

প্রয়োজন সমন্বিত পরিকল্পনা:-

শুধু নতুন ভবন নির্মাণ করলেই এই সম্ভাবনা বাস্তবায়িত হবে না। প্রয়োজন দক্ষ চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মী তৈরি, আধুনিক যন্ত্রপাতি, পর্যাপ্ত আইসিইউ ও অপারেশন থিয়েটার, জরুরি চিকিৎসাব্যবস্থা, মানসম্মত ডায়াগনস্টিক সুবিধা এবং হাসপাতালগুলোর মধ্যে সমন্বিত রেফারেল ব্যবস্থা।

একই সঙ্গে বেসরকারি বিনিয়োগকে উৎসাহিত করার পাশাপাশি চিকিৎসার মান, রোগীর নিরাপত্তা, মূল্য নির্ধারণ ও জবাবদিহি নিশ্চিত করাও জরুরি। স্বাস্থ্য খাতের সম্প্রসারণ যেন কেবল ব্যবসায়িক প্রবৃদ্ধি না হয়ে মানুষের নাগালের মধ্যে মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করে—সেদিকেও নজর দিতে হবে।

রাজশাহী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপস্থিতিও এই সম্ভাবনাকে আরও শক্তিশালী করতে পারে। চিকিৎসা শিক্ষা, গবেষণা, বিশেষায়িত চিকিৎসা ও প্রশিক্ষণকে কেন্দ্র করে একটি সমন্বিত স্বাস্থ্য-ইকোসিস্টেম গড়ে উঠলে রাজশাহী শুধু চিকিৎসা গ্রহণের শহর নয়, চিকিৎসা জ্ঞান ও দক্ষতা তৈরির কেন্দ্রেও পরিণত হতে পারে।

সামনে যে প্রশ্ন:-

তাই প্রশ্নটি এখন আর শুধু—রাজশাহীতে আরও হাসপাতাল হবে কি না।প্রশ্ন হলো, রাজশাহী কি এমন একটি সমন্বিত স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারবে, যেখানে রোগী উন্নত চিকিৎসা পাবে, তরুণদের জন্য তৈরি হবে দক্ষ কর্মসংস্থানের সুযোগ, উদ্যোক্তাদের সামনে খুলবে নতুন ব্যবসার দুয়ার এবং উত্তরাঞ্চলের মানুষকে জটিল চিকিৎসার জন্য অকারণে ঢাকামুখী হতে হবে না?

এই সম্ভাবনা বাস্তবায়িত হলে রাজশাহীর অর্থনৈতিক পরিচয়ও বদলে যেতে পারে। শিক্ষা নগরীর পাশাপাশি রাজশাহী হয়ে উঠতে পারে উত্তরাঞ্চলের অন্যতম প্রধান চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র।

হয়তো একদিন উত্তরাঞ্চলের মানুষের মুখে নতুন একটি বাক্য শোনা যাবে—‘উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় নয়, যেন রাজশাহীতে যেতে হয়।’

সেদিন হাসপাতালগুলো শুধু ইট-পাথরের ভবন থাকবে না; এগুলো হয়ে উঠবে কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ, সেবা ও জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি।

তবে সেই সম্ভাবনার সামনে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—রাজশাহী কি শুধু রোগী গ্রহণ করবে, নাকি উত্তরাঞ্চলের ‘Medical Economy’-এর নেতৃত্ব দেওয়ার মতো একটি পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্যকেন্দ্র হিসেবে নিজেকে গড়ে তুলবে?




© বিজয় বাংলা নিউজ
bijoybangla.news