
রাজশাহী সিটি করপোরেশনের (রাসিক) প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই মাঠপর্যায়ে দৃশ্যমান হওয়ার চেষ্টা করছেন মো. মাহফুজুর রহমান রিটন। নগরীর সড়ক, ড্রেনেজ, পরিচ্ছন্নতা, মশক নিয়ন্ত্রণ, ডেঙ্গু প্রতিরোধ থেকে শুরু করে ধর্মীয় ও জনসেবামূলক স্থাপনা—বিভিন্ন বিষয়ে সরেজমিনে গিয়ে সমস্যা দেখছেন, স্থানীয়দের কথা শুনছেন এবং সংশ্লিষ্ট বিভাগকে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিচ্ছেন।
তবে প্রশাসকের এই তৎপরতার পাশাপাশি বড় প্রশ্নও সামনে এসেছে—মাঠপর্যায়ের এসব নির্দেশনা কতটা দ্রুত বাস্তব উন্নয়নে রূপ নেবে? কারণ দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা নগরীর অবকাঠামোগত সমস্যা, জলাবদ্ধতা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, মশক নিয়ন্ত্রণ ও সড়ক সংস্কারের মতো বিষয় শুধু পরিদর্শন ও নির্দেশনায় সমাধান হওয়ার নয়; প্রয়োজন ধারাবাহিক তদারকি, পরিকল্পনা এবং বাস্তবায়ন।
সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ডে অবশ্য মাঠে থাকার প্রবণতাই বেশি চোখে পড়ছে রিটনের।
মসজিদ-ঈদগাহ থেকে সড়ক-ড্রেন:-
শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) কাদিরগঞ্জ গ্রেটার রোড জামে মসজিদে জুমার নামাজ আদায়ের পর মসজিদ ও সংলগ্ন ঈদগাহ পরিদর্শন করেন রাসিক প্রশাসক। মসজিদ কমিটির পক্ষ থেকে ওযুখানা নির্মাণ, রংকরণসহ বিভিন্ন উন্নয়নকাজে সহযোগিতা চাওয়া হলে তিনি সার্বিক সহযোগিতার আশ্বাস দেন।
শুধু ধর্মীয় স্থাপনা পরিদর্শন করেই থেমে থাকেননি তিনি। একই এলাকার রাস্তা ও ড্রেনের অবস্থা দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে রাসিকের প্রকৌশল বিভাগকে নির্দেশ দেন।
পরে কাদিরগঞ্জ দড়িখরবোনা ঈদগাহ মাঠ পরিদর্শন করে এর সম্প্রসারণ ও উন্নয়ন নিয়েও কথা বলেন তিনি। ঈদগাহের সার্বিক উন্নয়নে সহযোগিতার আশ্বাস দেওয়ার পাশাপাশি প্রকৌশল বিভাগকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে নির্দেশনা দেন।
একটি এলাকার মসজিদ, ঈদগাহ, সড়ক ও ড্রেনেজকে একই পরিদর্শনের আওতায় আনার বিষয়টি নগর ব্যবস্থাপনায় সমন্বিত দৃষ্টিভঙ্গির ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে পরিচ্ছন্নতার ওপর জোর:-
রাজশাহীতে ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগের মধ্যেও রাসিক প্রশাসনের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে মশক নিয়ন্ত্রণ ও পরিচ্ছন্নতা।
সাম্প্রতিক সময়ে নগরীর বিভিন্ন এলাকায় পরিচ্ছন্নতা অভিযান, ড্রেন-নালা পরিষ্কার, জমে থাকা পানি অপসারণ, মশার প্রজননস্থল ধ্বংস এবং লার্ভা নিধনে কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। একই সঙ্গে নাগরিকদের বাড়ির আশপাশ পরিষ্কার রাখা এবং পানি জমতে না দেওয়ার বিষয়ে সচেতন করা হচ্ছে।
রাজশাহীতে ডেঙ্গু নিয়ে স্বাস্থ্য বিভাগ ও নগরবাসীর উদ্বেগের প্রেক্ষাপটে এ উদ্যোগের গুরুত্ব আরও বেড়েছে। কারণ নগরীর বিভিন্ন স্থানে অপরিষ্কার ড্রেন, পরিত্যক্ত পাত্র ও জমে থাকা পানি এডিস মশার প্রজননের ঝুঁকি বাড়ায়।
রাসিকের জন্য এখানে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে অভিযানকে মৌসুমি কর্মসূচির মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে নিয়মিত মশক নিয়ন্ত্রণ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অংশে পরিণত করা।
পরিচ্ছন্ন নগরীর পথে পুরোনো সমস্যাই বড় বাধা:-
রাজশাহী দীর্ঘদিন ধরে পরিচ্ছন্ন নগরী হিসেবে পরিচিতি ধরে রাখার চেষ্টা করে আসছে। কিন্তু নগর সম্প্রসারণের সঙ্গে সঙ্গে বর্জ্য উৎপাদন, ড্রেনেজ চাপ, জলাবদ্ধতা এবং অপরিকল্পিতভাবে বর্জ্য ফেলার প্রবণতা বাড়ছে।
প্রশাসক রিটনের সামনে তাই পরিচ্ছন্নতা শুধু রাস্তা ঝাড়ু দেওয়ার বিষয় নয়। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে বর্জ্য সংগ্রহের নিয়মিততা, নির্দিষ্ট স্থানে বর্জ্য ফেলা, ড্রেন পরিষ্কার রাখা, ময়লা পরিবহন ও ব্যবস্থাপনা এবং নাগরিক সচেতনতা।
এই জায়গায় মাঠপর্যায়ের নজরদারি অব্যাহত রাখা গেলে দৃশ্যমান পরিবর্তনের সুযোগ রয়েছে। তবে সেই পরিবর্তন টেকসই করতে বিভাগগুলোর মধ্যে সমন্বয় এবং কাজের পরিমাপযোগ্য ফলাফল নিশ্চিত করা জরুরি।
নগরবাসীর প্রত্যাশা দৃশ্যমান:-
নগরবাসীর প্রত্যাশা এখন দৃশ্যমান ফলাফলে প্রশাসকের মাঠপর্যায়ের উপস্থিতি ইতিবাচক হলেও নগরবাসীর প্রত্যাশা আরও বড়। তারা শুধু প্রশাসককে এলাকায় দেখতে চান না; চান সমস্যার স্থায়ী সমাধান।
কোথাও ভাঙা রাস্তা হলে সেটি সংস্কার, কোথাও ড্রেন বন্ধ হলে সেটি সচল, কোথাও জলাবদ্ধতা হলে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা, কোথাও ময়লা জমলে নিয়মিত অপসারণ—এগুলোই নাগরিক সেবার বাস্তব সূচক।
একইভাবে ডেঙ্গু প্রতিরোধে অভিযান চালানোর পাশাপাশি কোন এলাকায় কতটি লার্ভার উৎস পাওয়া গেল, কতগুলো ধ্বংস করা হলো এবং পরবর্তী সময়ে সেখানে পরিস্থিতি কী—এসব তথ্যভিত্তিক নজরদারি কার্যক্রমকে আরও কার্যকর করতে পারে।
শুধু নির্দেশনা নয়, দরকার জবাবদিহি:-
রাসিকের প্রকৌশল, পরিচ্ছন্নতা ও সংশ্লিষ্ট বিভাগকে বিভিন্ন পরিদর্শনে নির্দেশনা দিচ্ছেন প্রশাসক। এখন এসব নির্দেশনা বাস্তবায়নের অগ্রগতি নিয়মিত পর্যালোচনা করাই হবে গুরুত্বপূর্ণ।
কারণ নগর প্রশাসনের ক্ষেত্রে একটি নির্দেশ তখনই কার্যকর হয়, যখন তার ফল নাগরিকের চোখে পড়ে।
কাদিরগঞ্জে সড়ক ও ড্রেন উন্নয়নের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ঈদগাহ সম্প্রসারণের বিষয়েও প্রকৌশল বিভাগকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এসব কাজ কখন শুরু হবে, কী পরিকল্পনায় হবে এবং কতদিনে শেষ হবে—এসব তথ্য প্রকাশ্যে এলে নাগরিকদের আস্থা আরও বাড়তে পারে।
প্রশাসক রিটনের সামনে তিন বড় পরীক্ষা:-
বর্তমান বাস্তবতায় রাসিক প্রশাসনের সামনে অন্তত তিনটি বড় পরীক্ষা রয়েছে—নগর অবকাঠামো, পরিচ্ছন্নতা-মশক নিয়ন্ত্রণ এবং নাগরিক সেবার ধারাবাহিকতা।
এর সঙ্গে রয়েছে দীর্ঘদিনের উন্নয়নসংক্রান্ত নানা দাবি ও অভিযোগ নিষ্পত্তির প্রশ্ন। প্রশাসকের মেয়াদে নতুন করে যেসব উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, সেগুলোর পাশাপাশি পুরোনো সমস্যাগুলোর অগ্রাধিকারভিত্তিক সমাধান করা গেলে নগরবাসীর কাছে তার প্রশাসনিক কার্যক্রম আরও গ্রহণযোগ্যতা পাবে।
বিশেষ করে সড়ক ও ড্রেনেজের মতো মৌলিক অবকাঠামোতে কাজের ক্ষেত্রে শুধু নতুন প্রকল্প নয়, বিদ্যমান অবকাঠামোর রক্ষণাবেক্ষণও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
মাঠে থাকার রাজনীতি নয়, মাঠে কাজের প্রমাণ চান নগরবাসী
রিটনের সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ডে মাঠপর্যায়ে থাকার একটি প্রবণতা স্পষ্ট। মসজিদ-ঈদগাহ পরিদর্শন, স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলা, সড়ক-ড্রেনের সমস্যা দেখা, পরিচ্ছন্নতা ও ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে অভিযান—সব মিলিয়ে প্রশাসনিক কার্যক্রমে জনসম্পৃক্ততার চেষ্টা রয়েছে।কিন্তু এখন সেই তৎপরতাকে ফলাফলে পরিণত করাই মূল চ্যালেঞ্জ।
রাজশাহীর নাগরিকরা এমন একটি নগর প্রশাসন চান, যেখানে অভিযোগ জানাতে দীর্ঘদিন অপেক্ষা করতে হবে না; যেখানে ড্রেন বন্ধ হওয়ার আগেই তা পরিষ্কার করা হবে, ডেঙ্গুর মৌসুম আসার আগেই মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করা হবে, সড়ক নষ্ট হওয়ার আগেই রক্ষণাবেক্ষণ হবে এবং উন্নয়নকাজের অগ্রগতি নাগরিকদের সামনে স্পষ্ট থাকবে।
কাদিরগঞ্জে শুক্রবারের (১১ সেপ্টেম্বর)পরিদর্শন তাই নিছক একটি আনুষ্ঠানিক সফর হিসেবে না থেকে নগর ব্যবস্থাপনায় মাঠভিত্তিক প্রশাসনের ধারাবাহিকতার অংশ হয়ে উঠবে কি না—সেটিই এখন দেখার বিষয়।
মসজিদ ও ঈদগাহ কমিটির পক্ষ থেকে এ সময় রাসিক প্রশাসককে সম্মাননা স্মারক দেওয়া হয়।
উপস্থিত ছিলেন কাদিরগঞ্জ গ্রেটার রোড জামে মসজিদ কমিটির সভাপতি মাসুদুর রহমান নিলু, সাধারণ সম্পাদক তারেক হাসান, ঈদগাহ পরিচালনা কমিটির সভাপতি মো. রেজাউল করিম, সহসভাপতি নাজমুল ইসলাম আয়নাল, সাধারণ সম্পাদক মো. অহিদুল ইসলাম রিয়াসুল, মসজিদের খতিব হাফেজ মাওলানা আফতাব আহমেদসহ সংশ্লিষ্ট কমিটির সদস্যরা।
রাসিকের নির্বাহী প্রকৌশলী (উন্নয়ন) মাহমুদুর রহমান ইমন, নির্বাহী প্রকৌশলী (পরিকল্পনা) জসীম উদ্দিন আরজু, নির্বাহী প্রকৌশলী (বিদ্যুৎ) এবিএম আসাদুজ্জামান সুইট, সহকারী প্রকৌশলী মো. শাহেদুজ্জামান জীবন, উপ-প্রধান পরিচ্ছন্ন কর্মকর্তা সেলিম রেজা রঞ্জুসহ প্রকৌশল ও পরিচ্ছন্নতা বিভাগের কর্মকর্তারাও পরিদর্শনকালে উপস্থিত ছিলেন।