Template: 3
Tpl 1 Tpl 2 Tpl 3
অনলাইন ডেস্ক | ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
bijoybangla.news
logo
বিজয় বাংলা নিউজ
জাতীয় দৈনিক

বন্ধ হচ্ছে না রেলের টিকিট কালোবাজারি ॥ এনআইডি যাচাইয়ে গাফিলতি, প্রশ্নের মুখে পুরো ব্যবস্থাপনা

আবুল কালাম আজাদ, বিশেষ প্রতিনিধি :- Black market in railway tickets not being stopped

ট্রেনের টিকিট কালোবাজারি বন্ধে একের পর এক উদ্যোগ নেওয়া হলেও থামছে না অনিয়মের অভিযোগ। অনলাইনে টিকিট ছাড়ার পর অল্প সময়েই টিকিট শেষ হয়ে যাওয়া, পরে একই টিকিট বা অন্যের নামে কাটা টিকিট অতিরিক্ত দামে বিক্রির অভিযোগ এবং ট্রেনে উঠে পরিচয়পত্র যাচাইয়ে শিথিলতার কারণে প্রশ্ন উঠছে—টিকিট কালোবাজারির সুযোগ তৈরি হচ্ছে কোথায়, আর এর দায় কার?

যাত্রীদের অভিযোগ, শুধু অনলাইনে টিকিট বিক্রির সময়সূচি পরিবর্তন কিংবা আগাম টিকিট বিক্রির দিন কমিয়ে কালোবাজারি বন্ধ করা যাবে না। এর জন্য প্রথমেই কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে—‘টিকিট ও এনআইডি যার, ভ্রমণ তার’ নীতি।

টিকিট যার, যাত্রাও তার—নিয়ম মানানো হচ্ছে কিঃ

একজন যাত্রীর নামে কাটা টিকিট অন্য কেউ ব্যবহার করলে তা শনাক্ত করার সবচেয়ে সহজ উপায় হলো টিকিটের সঙ্গে জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য মিলিয়ে দেখা। 

কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, ট্রেনের প্রতিটি আসনে বসা যাত্রীর টিকিট ও এনআইডি নিয়মিতভাবে যাচাই করা হয় না।

ফলে অন্যের নামে কাটা টিকিট ব্যবহার করার সুযোগ তৈরি হলে কালোবাজারির চাহিদাও থেকে যায়।

প্রশ্ন হলো, টিকিট-এনআইডি শতভাগ যাচাই করা হলে কালোবাজারির কাছ থেকে অন্যের নামে কাটা টিকিট কিনে একজন যাত্রী কেন ঝুঁকি নেবেন?

রেল কর্তৃপক্ষ চাইলে প্রতিটি ট্রেনে নিয়মিত অথবা অন্তত সপ্তাহে একদিন আকস্মিক বিশেষ যাচাই অভিযান পরিচালনা করতে পারে। টিটিইদের মাধ্যমে যাত্রীদের টিকিট ও এনআইডি মিলিয়ে দেখা এবং অমিল পাওয়া গেলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হলে কয়েক দিনের মধ্যেই কালোবাজারির বাজারে বড় ধরনের ধাক্কা আসতে পারে।


কালোবাজারির সঙ্গে ভেতরের কারও যোগসাজশ আছে কি?:-

টিকিট কালোবাজারি নিয়ে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠছে এখানেই। বিপুল সংখ্যক টিকিট যদি নিয়মিতভাবে কালোবাজারিদের হাতে পৌঁছায়, তাহলে তারা কীভাবে এত টিকিট সংগ্রহ করছে—এ বিষয়টি তদন্তের দাবি রাখে।

রেলওয়ে বা টিকিট বিক্রির দায়িত্বে থাকা কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কেউ সরাসরি জড়িত—এমন  অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত জরুরি।

একই সঙ্গে অস্বাভাবিক হারে টিকিট কেনা অ্যাকাউন্ট, একই এনআইডি দিয়ে অতিরিক্ত টিকিট কেনা, টিকিট বাতিল ও পুনরায় বিক্রির ধরন এবং অনলাইনে টিকিট ছাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নির্দিষ্ট কিছু অ্যাকাউন্টের অস্বাভাবিক সক্রিয়তা—এসব তথ্য বিশ্লেষণ করলেই কালোবাজারির চক্র শনাক্ত করা সম্ভব হতে পারে।

জয়দেবপুর-বিমানবন্দর স্টেশন ঘিরেও প্রশ্ন:-

বিমানবন্দর রেলস্টেশনে টিকিট পরীক্ষা এবং টিকিট রেখে দেওয়ার বিষয়ে যাত্রীদের কাছ থেকে নানা অভিযোগ শোনা যায়। অভিযোগ রয়েছে, ঢাকামুখী ট্রেন জয়দেবপুর ও বিমানবন্দর স্টেশনে প্রবেশের পর কিছু ক্ষেত্রে যাত্রীদের টিকিট পরীক্ষা করা হয়। এই দুই স্টেশনে নামা যাত্রীদের কমলাপুর পর্যন্ত কাটা  টিকিট রেখে দেওয়া হয়।

পরে এসব টিকিট অন্য যাত্রীর কাছে পুনরায় বিক্রির অভিযোগ রয়েছে।  বিষয়টি তদন্ত করে দেখা প্রয়োজন।

কারণ, কমলাপুরে জরিমানা এড়াতে টিকিটবিহীন যাত্রীরা বেশি দাম দিয়েও টিকিট কিনতে আগ্রহী হলে কালোবাজারিদের জন্য এটি লাভজনক ব্যবসায় পরিণত হয়।

তাই টিকিট পরীক্ষা হবে স্বচ্ছ, কিন্তু পরীক্ষার পর টিকিট কার কাছে থাকবে—তারও একটি জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন।

স্ট্যান্ডিং টিকিট নিয়েও অস্পষ্টতা;-

যাত্রীদের গুরুতর অভিযোগ,  বিমানবন্দর স্টেশনের স্ট্যান্ডিং টিকিট নিয়ে। যাত্রী কাউন্টারে গিয়ে টিকিট না পেলেও স্টেশনে থাকা ভ্রাম্যমাণ টিটিইয়ের কাছ থেকে টিকিট সংগ্রহের সুযোগ থাকার অভিযোগ রয়েছে।

যদি টিটিই টিকিট দিতে পারেন, তাহলে কাউন্টার থেকে কেন তা দেওয়া যাবে না—এ প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর প্রয়োজন।

আর টিটিইয়ের কাছ থেকে বৈধভাবে টিকিট নেওয়ার পরও যাত্রীকে কেন অতিরিক্ত জরিমানা দিতে হবে, সেটিও পরিষ্কার করা দরকার।

নিয়মের এই অস্পষ্টতা যাত্রীদের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি করে এবং অনিয়মের সুযোগ বাড়াতে পারে। তাই স্ট্যান্ডিং টিকিটের মূল্য, বিক্রির পদ্ধতি ও জরিমানার বিধান প্রকাশ্যে স্পষ্ট করা জরুরি।

পাঁচ দিন আগে টিকিট ছাড়লেই কি সমাধান:-

টিকিট ১০ দিন আগে না দিয়ে সর্বোচ্চ পাঁচ দিন আগে ছাড়ার দাবি অনেকের। এতে দীর্ঘ সময় ধরে টিকিট মজুত করার সুযোগ কমতে পারে।

তবে বাস্তবতা হলো—টিকিট পাঁচ দিন আগে ছাড়া হলেও যদি যাত্রীর পরিচয় যাচাই না করা হয়, তাহলে কালোবাজারি পুরোপুরি বন্ধ হবে না।

দুই মাস আগে টিকিট ছাড়লেও যদি কঠোর পরিচয় যাচাই থাকে, কালোবাজারি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। আবার পাঁচ দিন আগে টিকিট ছাড়লেও যদি টিকিট-এনআইডি যাচাই না হয়, তাহলে অনিয়মের সুযোগ থেকেই যাবে।

রেল ও সহজের দায়িত্ব:-

অনলাইনে টিকিট বিক্রির দায়িত্বে থাকা প্রতিষ্ঠান এবং রেল কর্তৃপক্ষ—উভয়ের কাছ থেকেই স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি প্রত্যাশা করেন যাত্রীরা। টিকিট বিক্রির সার্ভার, একাধিক টিকিট ক্রয়, অস্বাভাবিক হারে টিকিট কাটা, একই পরিচয়পত্রের মাধ্যমে অতিরিক্ত টিকিট কেনা এবং পরে টিকিটের পুনর্বিক্রয়—এসব বিষয়ে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি বাড়ানো প্রয়োজন।

টিকিট কালোবাজারির সঙ্গে রেল বা টিকিট ব্যবস্থাপনার কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী জড়িত থাকার অভিযোগ উঠলে তা অবশ্যই স্বাধীন তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করতে হবে। অভিযোগ সত্য হলে কঠোর ব্যবস্থা এবং মিথ্যা হলে সংশ্লিষ্টদের দায়মুক্তি—দুই ক্ষেত্রেই স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি।

সমাধান খুব কঠিন নয়:-

টিকিট কালোবাজারি বন্ধে প্রথমে প্রয়োজন রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক সদিচ্ছা নমময়—প্রয়োজন নিয়মের কঠোর ও নিরপেক্ষ প্রয়োগ। প্রতিটি ট্রেনে টিটিইদের মাধ্যমে টিকিট ও এনআইডি যাচাই, গুরুত্বপূর্ণ স্টেশনে আকস্মিক চেকিং, টিকিট পরীক্ষার পুরো প্রক্রিয়া সিসিটিভির আওতায় আনা, ব্যবহৃত টিকিট পুনরায় বিক্রির সুযোগ বন্ধ করা এবং অনলাইনে অস্বাভাবিক টিকিট কেনার ওপর নজরদারি—এসব ব্যবস্থা একসঙ্গে কার্যকর করা হলে কালোবাজারি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব।


বিশেষ করে, সপ্তাহে অন্তত একদিন আকস্মিকভাবে পুরো ট্রেনের যাত্রীদের টিকিট ও এনআইডি যাচাই করা হলে তার প্রভাব দ্রুত দৃশ্যমান হতে পারে।

একজন যাত্রী যদি জানেন, অন্যের এনআইডিতে কাটা টিকিট নিয়ে ট্রেনে উঠলেই জরিমানা বা আইনি ব্যবস্থা হবে, তাহলে তিনি কালোবাজারির কাছ থেকে টিকিট কিনতে নিরুৎসাহিত হবেন। আর ক্রেতা না থাকলে কালোবাজারির ব্যবসাও টিকবে না।

রাঘব বোয়ালদের খুঁজে বের করতে হবে:-

টিকিট কালোবাজারি যদি শুধু বাইরের কিছু দালালের কাজ হয়, তাহলে তারা নিয়মিতভাবে টিকিট সংগ্রহ করে কীভাবে? আর যদি ব্যবস্থাপনার কোনো স্তরে যোগসাজশ থাকে, তাহলে সেই ব্যক্তিরা কারা?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে হলে শুধু স্টেশনভিত্তিক অভিযান নয়, প্রয়োজন টিকিট বিক্রির শুরু থেকে যাত্রীর আসনে বসা পর্যন্ত পুরো ব্যবস্থার অডিট।

কালোবাজারির সঙ্গে রেলওয়ে বা টিকিট ব্যবস্থাপনার কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীর সম্পৃক্ততার অভিযোগ থাকলে তদন্তের মাধ্যমে তা প্রমাণ বা খণ্ডন করা হোক। কেউ জড়িত থাকলে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং অভিযোগ ভিত্তিহীন হলে সংশ্লিষ্টদের দায়মুক্তি—দুই ক্ষেত্রেই স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

ট্রেনের টিকিট কালোবাজারি বন্ধ করতে নতুন কোনো জটিল পদ্ধতির প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন একটি সহজ নিয়মের কঠোর বাস্তবায়ন—

‘টিকিট ও এনআইডি যার, ভ্রমণ তার।’

এই একটি নিয়ম যদি প্রতিটি ট্রেনে, প্রতিটি যাত্রীর ক্ষেত্রে কার্যকর করা যায়, তাহলে কালোবাজারির বড় একটি অংশ এমনিতেই অকার্যকর হয়ে যাবে।

তাই প্রশ্নটি এখন আর শুধু—টিকিট কখন ছাড়া হবে?

প্রশ্ন হলো—টিকিট যাঁর নামে, ট্রেনে তিনি ভ্রমণ করছেন কি না—এটি নিশ্চিত করার দায়িত্ব কে নেবে এবং সেই দায়িত্ব কতটা কঠোরভাবে পালন করা হচ্ছে?

রেল কর্তৃপক্ষের কাছে যাত্রীদের প্রত্যাশা,অভিযোগ ও প্রশ্নের বদলে এবার দৃশ্যমান, নিয়মিত এবং স্বচ্ছ পদক্ষেপ নেওয়া হোক। কালোবাজারির প্রকৃত হোতাদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা হোক এবং সাধারণ যাত্রীর জন্য টিকিটপ্রাপ্তির অধিকার নিশ্চিত করা হোক।

© বিজয় বাংলা নিউজ
bijoybangla.news