ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) সংগ্রহশালায় পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর ছবি প্রদর্শনকে কেন্দ্র করে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। সংস্কারের পর সংগ্রহশালাটি উদ্বোধনের একদিনের মাথায় সেখানে থাকা জিন্নাহর একটি ছবি ভাঙচুর করে ছিঁড়ে ফেলার ঘটনা ঘটেছে। এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত বলে আলোচনায় এসেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী ও ডাকসু নির্বাচনের সাবেক ভিপি প্রার্থী আবু তৈয়ব হাবিলদার।
রোববার (১৩ সেপ্টেম্বর) সংস্কার করা ডাকসু সংগ্রহশালার উদ্বোধন করা হয়। দেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য, ছাত্র আন্দোলন ও বিভিন্ন ঐতিহাসিক স্মৃতি সংরক্ষণের লক্ষ্যেই সংগ্রহশালাটি নতুনভাবে সাজানো হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। এর পরদিন সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) সেখানে জিন্নাহর ছবি নিয়ে এই ঘটনার সূত্রপাত।
জানা যায়, তৈয়ব হাবিলদার সংগ্রহশালায় প্রবেশ করে জিন্নাহর একটি ছবি ভেঙে ফেলেন এবং পরে সেটি ছিঁড়ে ফেলেন। তিনি ২০০১-০২ শিক্ষাবর্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উর্দু বিভাগের শিক্ষার্থী ছিলেন এবং ডাকসু নির্বাচনে ভিপি প্রার্থী হিসেবে আলোচিত ছিলেন।
ঘটনাটি সামনে আসার পর ডাকসুর সংগ্রহশালায় জিন্নাহর ছবি রাখার যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। ডাকসুর মুক্তিযুদ্ধ ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনবিষয়ক সম্পাদক ফাতিমা তাসনিম জুমা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সংগ্রহশালায় ছবি ভাঙচুরের কথা জানিয়েছেন।
তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, সংগ্রহশালায় জিন্নাহর একাধিক ছবি প্রদর্শন করা হয়েছিল। এর মধ্যে ১৯৪৮ সালের ২১ মার্চ তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে জিন্নাহর ভাষণের ছবিও ছিল।
ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে জিন্নাহর ভূমিকা
জিন্নাহকে ঘিরে বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় বিতর্কের জায়গা ভাষার প্রশ্ন। ১৯৪৮ সালে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা নিয়ে তাঁর অবস্থান তৎকালীন পূর্ব বাংলার মানুষের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন পরবর্তী সময়ে বাঙালির জাতীয়তাবাদী চেতনা বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
ফলে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসের সঙ্গে জড়িত একটি প্রতিষ্ঠানের সংগ্রহশালায় জিন্নাহর ছবি প্রদর্শনের বিষয়টি অনেকের কাছে নিছক ঐতিহাসিক স্মারক সংরক্ষণের প্রশ্ন নয়; বরং এর সঙ্গে রাজনৈতিক ও আদর্শিক ব্যাখ্যাও যুক্ত হয়ে গেছে।
অন্যদিকে, ইতিহাসের কোনো বিতর্কিত চরিত্রের ছবি বা নিদর্শন সংগ্রহশালায় থাকা মানেই ওই ব্যক্তির আদর্শ বা কর্মকাণ্ডের প্রতি সমর্থন—এমন ব্যাখ্যাও সর্বক্ষেত্রে গ্রহণযোগ্য নয়। ইতিহাস সংরক্ষণের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ভূমিকা, সময়কাল, অবদান ও বিতর্ক—সবকিছুর তথ্যসমৃদ্ধ ব্যাখ্যা দেওয়াই গুরুত্বপূর্ণ।
জিন্নাহর ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক থাকলেও কোনো ঐতিহাসিক নিদর্শন বা প্রদর্শিত ছবি ভেঙে ফেলা কতটা গ্রহণযোগ্য—সেটিও এখন আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। কারণ ইতিহাসের কোনো অংশ অপছন্দনীয় বা বিতর্কিত মনে হলে তা নিয়ে মতপ্রকাশ, অপসারণের দাবি কিংবা কর্তৃপক্ষের কাছে আপত্তি জানানোর সুযোগ রয়েছে; কিন্তু ব্যক্তিগত উদ্যোগে ভাঙচুরের মাধ্যমে প্রতিক্রিয়া দেখানো হলে তা নতুন ধরনের বিতর্ক সৃষ্টি করতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ডাকসুর মতো ঐতিহাসিক প্রতিষ্ঠানের সংগ্রহশালা কেবল ছবি প্রদর্শনের জায়গা নয়; এটি ছাত্র আন্দোলন, ভাষা আন্দোলন, গণতান্ত্রিক সংগ্রাম ও বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের স্মৃতিও বহন করে। তাই সেখানে কোন ব্যক্তির ছবি থাকবে, কেন থাকবে এবং কী ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে থাকবে—তার সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা থাকা প্রয়োজন।
‘ইতিহাস সংরক্ষণ’ না ‘আদর্শিক বার্তা’:-
সংস্কারের পর ডাকসু সংগ্রহশালাকে আরও আধুনিক, নান্দনিক ও তথ্যসমৃদ্ধ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু নতুন করে জিন্নাহর ছবি প্রদর্শনের পরপরই সেটি নিয়ে বিতর্ক এবং ভাঙচুরের ঘটনা সংগ্রহশালার প্রদর্শনী নীতির বিষয়টিকেও সামনে এনেছে।
এখন মূল প্রশ্ন—ডাকসু সংগ্রহশালায় ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বদের ছবি কী নীতিতে নির্বাচন করা হয়েছে? সেখানে কি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ইতিবাচক ও নেতিবাচক উভয় ঐতিহাসিক ভূমিকা তথ্যসহ তুলে ধরা হবে? নাকি শুধু ছবি প্রদর্শনের মধ্য দিয়ে ইতিহাসকে উপস্থাপন করা হবে?
এ ঘটনায় একদিকে যেমন জিন্নাহর ছবি প্রদর্শনের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, অন্যদিকে ছবি ভাঙচুরের ঘটনাও সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। ফলে ঘটনাটি শেষ পর্যন্ত শুধু একটি ছবি ছেঁড়া বা ভাঙার ঘটনায় সীমাবদ্ধ থাকছে না; বরং বাংলাদেশের ইতিহাস কীভাবে সংরক্ষণ ও উপস্থাপন করা হবে—সেই বৃহত্তর প্রশ্নও সামনে নিয়ে এসেছে।
ডাকসুর সংগ্রহশালা নিয়ে চলমান বিতর্কে এখন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে স্পষ্ট ব্যাখ্যা এবং ভবিষ্যতে ঐতিহাসিক নিদর্শন সংরক্ষণ ও প্রদর্শনের ক্ষেত্রে একটি সুস্পষ্ট নীতিমালা প্রত্যাশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।