
পবিত্র নগরী মক্কার দিকে ছোড়া একটি ড্রোন সৌদি আকাশ প্রতিরক্ষা বাহিনী ধ্বংস করে দিয়েছে। ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে এই অভিযোগ এনেছে সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট। বাংলাদেশসহ মুসলিম বিশ্বের বহু দেশ এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে।
সৌদি জোটের মুখপাত্র মেজর জেনারেল তুর্কি আল-মালকি জানিয়েছেন, গত মঙ্গলবার সন্ধ্যা ৬টা ৫০ মিনিটে মক্কার দক্ষিণে ড্রোনটি ধ্বংস করা হয়। এটি মক্কাকে লক্ষ্য করে দ্বিতীয় হামলার চেষ্টা। এর আগে ২০১৭ সালের জুলাইয়ে একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র মক্কার দিকে ছোড়া হয়েছিল।
সৌদি আরব এই হামলাকে ‘লাল রেখা’ অতিক্রমের চেষ্টা’ বলে অভিহিত করেছে। আল-মালকি বলেন, “দুই পবিত্র মসজিদ ও হজযাত্রীদের নিরাপত্তা আমাদের জন্য লাল রেখা।”
তবে হুথি রাজনৈতিক ব্যুরোর সদস্য হাজেম আল-আসাদ এই অভিযোগকে ‘পুরনো ও বাসি মিথ্যা’ বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। হুথি-নিয়ন্ত্রিত সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত বিবৃতিতে তিনি বলেন, “মক্কাকে লক্ষ্য করার দাবি বারবার করা হয়েছে, এখন আর কেউ বিশ্বাস করে না।”
মক্কা ও কাবা শরিফকে লক্ষ্য করে হামলার ঘটনা ইসলামের ইতিহাসে বিরল নয়। সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা ১৯৭৯ সালের গ্র্যান্ড মসজিদ অবরোধ। ওই বছরের ২০ নভেম্বর ফজরের নামাজের সময় সৌদি ন্যাশনাল গার্ডের সাবেক সদস্য জুহায়মান আল-ওতায়বির নেতৃত্বে প্রায় ৬০০ সশস্ত্র বিদ্রোহী মসজিদ দখল করে।
তারা দাবি করেছিল, জুহায়মানের শ্যালক মোহাম্মদ আবদুল্লাহ আল-কাহতানিই প্রতিশ্রুত মাহদি। দুই সপ্তাহের অবরোধ শেষে ফরাসি কমান্ডোদের সহায়তায় সৌদি বাহিনী মসজিদ পুনর্দখল করে। জুহায়মানসহ ৬৩ জনকে প্রকাশ্যে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।
প্রাচীনকালেও মক্কা একাধিকবার আক্রমণের শিকার হয়েছে। ৬৮৩ ও ৬৯২ সালে উমাইয়া বাহিনী কাবা শরিফে মাঞ্জানিক দিয়ে আক্রমণ চালায়, যাতে কাবার গিলাফ পুড়ে যায়।
৯৩০ সালে কারমাতিয়ান সম্প্রদায়ের আবু তাহের আল-জান্নাবির নেতৃত্বে হজের মৌসুমে মক্কায় হামলা হয়। ওই হামলায় প্রায় ৩০ হাজার মানুষ নিহত হন এবং কালো পাথর চুরি হয়ে যায়। ২৩ বছর পর বিপুল অর্থের বিনিময়ে পাথর ফেরত দেওয়া হয়।
ইসলামি ঐতিহ্যমতে, ৫৭০ খ্রিষ্টাব্দে আব্রাহার হস্তিবাহিনী কাবা ধ্বংসের চেষ্টা করলে আল্লাহর পাঠানো পাখির দল তাদের ধ্বংস করে দেয়—এই ঘটনার স্মৃতিতে সূরা ফীল নাজিল হয়।
বর্তমান সংঘাতের প্রেক্ষাপটে মক্কার নিরাপত্তা আরও স্পর্শকাতর। গত জুলাই থেকে হুথি ও সৌদি আরবের মধ্যে উত্তেজনা ব্যাপকভাবে বেড়েছে। ইয়েমেনে সৌদি বিমান হামলার পাল্টা জবাবে হুথিরা সৌদি ভূখণ্ডে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালাচ্ছে। গত সোমবারই ইয়েমেন থেকে ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্রে সৌদি আরবের দক্ষিণাঞ্চলে ১৩ জন বেসামরিক নাগরিক আহত হন।
বিশ্লেষকদের মতে, মক্কাকে লক্ষ্য করে হামলার অভিযোগ ও পাল্টা অভিযোগ দুই পক্ষের তথ্য যুদ্ধের অংশ। সৌদি আরব মুসলিম বিশ্বের সমর্থন আদায়ের চেষ্টা করছে, আর হুথিরা তাদের ‘ধর্মযুদ্ধের’ বৈধতা রক্ষা করতে মক্কা হামলার অভিযোগ অস্বীকার করছে।
ইসলামের জন্মভূমি মক্কা—যেখানে কোটি কোটি মুসলিম হজ ও উমরাহ করতে আসেন—তার ওপর যেকোনো হামলার অভিযোগ সারা মুসলিম বিশ্বে গভীর প্রতিক্রিয়া তৈরি করে।
ইতিহাস সাক্ষী, মক্কার নিরাপত্তা যখনই প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে, তার প্রভাব ছড়িয়েছে ইসলামি সভ্যতার গভীরে। বর্তমান সংঘাতও তার ব্যতিক্রম নয়।