চাঁদের পৃষ্ঠে সম্প্রতি বিশাল একটি নতুন গর্তের সন্ধান পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা। প্রায় দুই বছর আগে একটি গ্রহাণু বা ধূমকেতুর খণ্ড চাঁদে আঘাত হানার পর গর্তটি তৈরি হয়। তবে সেই আঘাতের ঘটনা তখন পৃথিবী বা মহাকাশের কোনো টেলিস্কোপে ধরা পড়েনি।
নাসার লুনার রিকনাইসেন্স অরবিটার (এলআরও) ২০২৪ সালের মে মাসে চাঁদের পৃথিবীমুখী পাশে গর্তটি শনাক্ত করে। গর্তটির প্রস্থ প্রায় ৭২৮ ফুট (২২২ মিটার) এবং গভীরতা ১৪১ ফুট (৪৩ মিটার) পর্যন্ত। এটি রোমের কলোসিয়ামের চেয়েও বড়।
গবেষকেরা বলছেন, সাম্প্রতিক সময়ে সৌরজগরে তৈরি হওয়া এটাই এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় পরিচিত আঘাতের গর্ত। এ ধরনের বড় আঘাতের ঘটনা গড়ে ১৩২ বছরে একবার ঘটে। তাই চাঁদের পৃষ্ঠে সাম্প্রতিক সময়ে ঘটে যাওয়া এই বিরল ঘটনা বিজ্ঞানীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের উৎস হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে চাঁদে মানুষের ভবিষ্যৎ ঘাঁটি তৈরির পরিকল্পনার ক্ষেত্রে এর তথ্য কাজে লাগতে পারে।
এ নিয়ে দুটি গবেষণা বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) ‘সায়েন্স অ্যাডভান্সেস’ সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছে। একটি গবেষণায় বিজ্ঞানীরা ঘটনাটিকে পরিসংখ্যানগতভাবে অত্যন্ত বিরল এবং জীবনে একবার দেখার মতো পর্যবেক্ষণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
গর্তটি তৈরির সময়কার আঘাত তাৎক্ষণিকভাবে শনাক্ত করা যায়নি। এলআরওর ওয়াইড-অ্যাঙ্গেল ক্যামেরায় তোলা ছবিও বিপুল পরিমাণ তথ্যের মধ্যে চাপা পড়ে ছিল। ২০২৫ সালের আগস্টে বিজ্ঞানীরা সেসব ছবি শনাক্ত করেন। এরপর গত বছরের শেষ দিকে এলআরও গর্তটির আরো বিস্তারিত ছবি তোলে। চলতি বছরের শুরুতে আবিষ্কারটি নিশ্চিত করা হয়।
গর্তটির নাম দেওয়া হয়েছে প্রয়াত থমাস ম্যাকগেটচিনের নামে। তিনি হিউস্টনের লুনার অ্যান্ড প্ল্যানেটারি ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক ছিলেন।
নতুন গর্তটি এক দশক আগে এলআরওর মাধ্যমে শনাক্ত হওয়া আগের রেকর্ডধারী গর্তের চেয়ে তিন গুণ বড়। চাঁদের পৃষ্ঠে প্রাচীনকাল থেকেই নানা আঘাতে অসংখ্য গর্ত তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে সৌরজগতের সবচেয়ে বড় কয়েকটি আঘাতের গর্তও রয়েছে। এমন একটি গর্তের বিস্তার ১ হাজার ৫০০ মাইল (২ হাজার ৪০০ কিলোমিটার) ছাড়িয়ে গেছে।
নতুন আঘাতে চাঁদের পৃষ্ঠের ৬৬ মাইলের (১০০ কিলোমিটার) বেশি এলাকা আলোড়িত হয়েছে। এলআরওর ক্যামেরার প্রধান বিজ্ঞানী মার্ক রবিনসন বলেন, আঘাতে চাঁদের ধুলা ও পাথুরে মাটি প্রত্যাশার চেয়ে বেশি কোণে ছিটকে পড়েছে।
গবেষণাগুলোর একটির প্রধান লেখক রবিনসন ইন্টুইটিভ মেশিনসে কাজ করেন।
অন্য একটি গবেষণায় গর্তটির চারপাশে প্রায় ৪ মাইল (৭ কিলোমিটার) বিস্তৃত একটি ঠান্ডা এলাকা শনাক্ত করা হয়েছে। গবেষকদের মতে, চাঁদের ওপরের মাটি আলগা হয়ে যাওয়ার কারণেই এমন এলাকা তৈরি হয়েছে।
ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, লস অ্যাঞ্জেলেসের গবেষক ডেভিড পেইজ বিষয়টিকে বাগান করার সঙ্গে তুলনা করেছেন। তার মতে, চাঁদের পৃষ্ঠে বড় আঘাতকে এক ধরনের ‘বাগান করার’ প্রক্রিয়া হিসেবে দেখা যায়। এতে মাটির ওপরের স্তর উল্টে যায় এবং সাধারণত নিচে থাকা উপাদান ওপরে উঠে আসে।
২০০৯ সালে উৎক্ষেপণের পর থেকে এলআরও চাঁদের অসংখ্য নতুন গর্ত শনাক্ত করেছে। এসব তথ্য বিশ্লেষণ করে রবিনসন বলেন, চাঁদের মাটির ওপরের প্রায় ১ ইঞ্চি বা ২ সেন্টিমিটার স্তর প্রতি ৮০ হাজার বছরে ছিটকে পড়া উপাদানের কারণে পুরোপুরি উল্টে যায়। আগে যে ধারণা ছিল, তার চেয়ে দ্রুতগতিতে চাঁদের ওপরের মাটি বদলে যাচ্ছে।
চাঁদে অ্যাপোলো অভিযানের নভোচারীদের পায়ের ছাপ চিরকাল থাকবে—এমন ধারণাও ঠিক নয়। রবিনসনের মতে, এই সময়ের মধ্যে সেই পায়ের ছাপ ‘নিশ্চিতভাবেই’ মুছে যাবে।
এখন গবেষকদের লক্ষ্য নতুন গর্ত থেকে ছিটকে যাওয়া উপাদান নাসার পরিকল্পিত চন্দ্রঘাঁটিতে আঘাত হানার ঝুঁকি নির্ধারণ করা। রবিনসন বলেন, এই তথ্য প্রকৌশলীদের চন্দ্রঘাঁটির কাঠামো আরো শক্তিশালী করতে সহায়তা করবে। এতে গর্ত থেকে ছিটকে আসা উপাদানের আঘাতে কাঠামোর ক্ষতির আশঙ্কা কমানো যাবে।