Template: 2
Tpl 1 Tpl 2 Tpl 3
logo
বিজয় বাংলা নিউজ
bijoybangla.news
১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
০৩:৪৩ অপরাহ্ন

১৪ কোটি টাকার সড়ক ঢালাইয়ের পরই ফাটল

আবুল কালাম আজাদ রাজশাহী:- Cracks appear after road worth Tk 14 crore is poured

রাজশাহীর পবা উপজেলার বায়া থেকে তানোরের আগপর্যন্ত সড়কটি দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগপথ হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। একসময় কংক্রিটের তৈরি এ সড়কটি বড় ধরনের সংস্কার বা পুনর্নির্মাণের অভাবে খানাখন্দে পরিণত হয়। বিভিন্ন সময়ে সংস্কার করা হলেও কয়েক মাসের মধ্যেই আবারও সড়কটির বেহাল দশা দেখা দেয়। এতে যান চলাচলে দুর্ভোগ পোহাতে হয় স্থানীয়দের।


এ অবস্থায় প্রায় ১৪ কোটি টাকা ব্যয়ে সড়কটি পুনর্বাসনের কাজ শুরু হয়েছে। তবে কাজ শুরুর কয়েক মাসের মধ্যেই ঢালাই দেওয়া অংশের বিভিন্ন স্থানে ফাটল ও দেবে যাওয়ার ঘটনা দেখা দিয়েছে। এতে নির্মাণকাজের মান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।


স্থানীয়দের অভিযোগ, সড়কের নিচের মাটি যথাযথভাবে কমপ্যাকশন বা রোলিং করা হয়নি। কোথাও কোথাও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত না করেই ঢালাই দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া ঢালাইয়ের পুরুত্ব কম এবং নির্মাণসামগ্রীর অনুপাত নিয়েও অভিযোগ রয়েছে তাঁদের।


তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন পবা উপজেলা প্রকৌশলী মোহাম্মদ আলী। তাঁর দাবি, নির্মাণসামগ্রীর মানে কোনো সমস্যা নেই। মূল সমস্যা সড়কের নিচের মাটিতে। মাটি ‘অর্গানিক সয়েল’ হওয়ায় পানি পেলে এর ভার বহনক্ষমতা কমে যায়। ফলে ওপরের অংশের ভার নিতে না পেরে মাটি দেবে যাচ্ছে। এর সঙ্গে অতিরিক্ত বৃষ্টি ও ভারী যানবাহন চলাচলও ক্ষতির কারণ হয়েছে বলে জানান তিনি।


৯ কিলোমিটারের বেশি সড়ক পুনর্বাসন:-

প্রকল্পের নথি অনুযায়ী, ‘বায়া-কাশিম বাজার-তানোর সড়ক পুনর্বাসন কাজ (প্রশস্তকরণ ও শক্তিশালীকরণ)’ প্রকল্পের আওতায় ৯ কিলোমিটারের বেশি সড়ক পুনর্বাসন করা হচ্ছে। প্রকল্পটির চুক্তিমূল্য প্রায় ১৪ কোটি টাকা। গত ৯ মে কাজ শুরু হয়েছে। কাজ শেষ করার নির্ধারিত সময় ২০২৭ সালের ১২ মার্চ। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)।


ঢালাইয়ের পরই ফাটল:-

শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) সকালে সরেজমিনে পবা উপজেলার বায়া থেকে তানোরের আগপর্যন্ত সড়কটি ঘুরে দেখা যায়, বিভিন্ন অংশে পুনর্বাসনের কাজ চলছে। প্রকল্পের আওতায় সড়কের কয়েকটি অংশে আরসিসি ঢালাই দেওয়া হয়েছে, কোথাও ঢালাইয়ের কাজ চলছে।


এরই মধ্যে বাকসাড়া-নওদাপাড়া এলাকায় প্রায় আধা কিলোমিটার অংশে ঢালাই দেওয়া হয়েছে। ওই ঢালাইয়ের বিভিন্ন স্থানে ইতিমধ্যে ফাটল দেখা গেছে। কিছু অংশে দেবে যাওয়ার চিহ্নও রয়েছে। ফাটল দেখা দেওয়া অংশে কাজ বন্ধ রাখা হলেও সড়কের অন্যান্য অংশে নির্মাণকাজ চলমান রয়েছে।


বাকসাড়া-নওদাপাড়া এলাকার বাসিন্দা মমতাজ আলী বলেন, “সড়কের কিছু অংশ ভালোভাবে পরিষ্কার না করেই আবর্জনার ওপর ঢালাই দেওয়া হয়েছে। নিচের মাটিও ভালোভাবে রোলার করা হয়নি। ফলে ঢালাই দেওয়ার এক সপ্তাহ না যেতেই কোথাও ফাটল ধরেছে, আবার কোথাও দেবে গেছে।”


স্থানীয় ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর মো. নাজিমুদ্দিন মোল্লা বলেন, “গর্ত খননের পর মাটি ভালোভাবে কমপ্যাক্ট করা হয়নি। রোলারও ঠিকমতো চালানো হয়নি। ফলে সড়কের এক পাশে দেবে গেছে এবং অন্য পাশে ফাটল ধরেছে।”


কাজের মান নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, “আমার কাছে মনে হয়েছে, কাজের মান প্রত্যাশিত পর্যায়ে হয়নি। ঢালাইয়ের পুরুত্ব কম এবং বালুর পরিমাণ বেশি, খোয়া কম দেওয়ার মতো বিষয়ও চোখে পড়েছে।”


সড়কটি দিয়ে নিয়মিত চলাচলকারী আব্দুস সালাম বলেন, তিনি নির্মাণকাজ দেখেছেন। তাঁর মতে, কাজ আরও ভালোভাবে করা প্রয়োজন ছিল। গুরুত্বপূর্ণ এই সড়কটি টেকসইভাবে নির্মাণ করা না হলে অল্প সময়ের মধ্যেই আবারও জন দুর্ভোগ তৈরি হবে।


স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল মোমিন বলেন, কাজ শেষ হওয়ার পরপরই সড়কের বিভিন্ন স্থানে ফাটল দেখা দিয়েছে। “এভাবে কাজ করা হলে বছর তো দূরের কথা, পাঁচ-ছয় মাসের মধ্যেই সড়কটি আবার খানাখন্দে পরিণত হতে পারে,।”

তিনি আরও অভিযোগ করেন, সড়কের বিভিন্ন স্থানে ইট ও রডের কাজ যথাযথভাবে করা হয়নি। নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার এক মাসের মধ্যেই ফাটল দেখা দেওয়ায় তিনি কাজের স্থায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।


বাগসাড়া গ্রামের বাসিন্দা মোকলেসুর রহমান বলেন, “নির্মাণের সময় আমি প্রকৌশলীদের মাটি শক্ত করার বিষয়টি বলেছিলাম। ঢালাইয়ের আগে মাটি ভালোভাবে কমপ্যাক্ট করতে রোলার চালানোর কথাও বলেছি। কিন্তু ঢালাইয়ের সময় কমপ্যাকশন বা ভাইব্রেশনের জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্র ব্যবহার করা হয়নি বলে আমার মনে হয়েছে।”


‘মাটির ধরনই মূল সমস্যা’:-

তবে পবা উপজেলা প্রকৌশলী মোহাম্মদ আলী বলেন, সড়কের বর্তমান অবস্থা বিবেচনায় প্রকল্পের নকশা সংশোধনের জন্য আবেদন করা হয়েছে। মাটির বেয়ারিং ক্যাপাসিটি, বৃষ্টির পানি এবং ভারী যানবাহনের চাপ বিবেচনায় নিয়ে সড়কের কাঠামো আরও মজবুত করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।


তিনি বলেন, প্রস্তাব অনুযায়ী ৩ ইঞ্চি সিসি ঢালাইয়ের পাশাপাশি ১২ ইঞ্চি আরসিসি করার কথা বলা হয়েছে। এতে দুই স্তরের রডের জালি এবং কর্নার বার বা কর্নার রড দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে।এছাড়া, প্রকল্প পরিচালকসহ সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীরা বিষয়টি অবগত আছেন এবং সরেজমিনে পরিস্থিতি পরিদর্শন করেছেন বলেও জানান তিনি।

প্রকৌশলী মোহাম্মদ আলী আরো বলেন, “নির্ধারিত নিয়ম মেনেই কাজ করা হয়েছে ও হচ্ছে। তবে সড়কের বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় প্রয়োজনীয় সংশোধনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।”

ভারী যান চলাচলকে দায়ী করলেন ঠিকাদার:-

ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স জুয়েল ইলেকট্রনিক্সের ঠিকাদার মো. ইউনুস আলী বলেন, ঢালাইয়ের পর অন্তত ২৮ দিন ভারী যানবাহন চলাচল বন্ধ রাখা প্রয়োজন ছিল। কিন্তু সড়কটি গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় সেখানে ভারী যানবাহন চলাচল অব্যাহত ছিল। এতে সদ্য ঢালাই করা কিছু অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকতে পারে।

তিনি আরও বলেন, “ওই এলাকার মাটির বেজ ভালো নয়। এ কারণে এমন পরিস্থিতিতে কাজ করার বিষয়ে আমাদের আপত্তির কথাও সংশ্লিষ্টদের জানানো হয়েছিল।”


স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার আগেই ঢালাই করা অংশে ফাটল ও দেবে যাওয়ার ঘটনায় সড়কের স্থায়িত্ব নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলী ও ঠিকাদারের বক্তব্য, মাটির প্রকৃতি, অতিরিক্ত বৃষ্টি এবং ঢালাইয়ের পর ভারী যানবাহন চলাচলের কারণে এ ধরনের সমস্যা তৈরি হয়েছে।


এ অবস্থায় সড়কের ত্রুটিপূর্ণ অংশের প্রকৃত কারণ নির্ধারণ করে প্রয়োজনীয় কারিগরি পরীক্ষা এবং প্রকল্পের নকশা অনুযায়ী নির্মাণকাজ নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।




© বিজয় বাংলা নিউজ
bijoybangla.news