Template: 1
Tpl 1 Tpl 2 Tpl 3
বিজয় বাংলা নিউজ
জাতীয় দৈনিক | bijoybangla.news
QR
ই-পেপার / অনলাইন সংস্করণ
Monday , ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১১:২২ পূর্বাহ্ন

রাবি শিক্ষার্থীর ওপর হামলার অভিযোগে রেল স্টেশনে ভাঙচুর, যাত্রীদের মালামাল লুটের অভিযোগ

আবুল কালাম আজাদ, রাজশাহী:- ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) এক শিক্ষার্থীর ওপর হামলার অভিযোগকে কেন্দ্র করে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে রাজশাহী রেলস্টেশন। বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা রেলপথ অবরোধের পর রাজশাহী রেলওয়ে স্টেশনে গিয়ে ব্যাপক ভাঙচুর চালিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। 

এ সময় স্টেশনের বিভিন্ন স্থাপনা, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কক্ষ, দোকানপাট, সিসিটিভি ক্যামেরা ও একটি ব্যাংকের বুথে হামলার অভিযোগ পাওয়া গেছে। একই সঙ্গে স্টেশনে অপেক্ষমাণ যাত্রীদের মারধর ও মালামাল লুটের অভিযোগও করেছেন কয়েকজন যাত্রী। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা ও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

রোববার (২০ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যায় রাজশাহী রেলস্টেশনে টিকিট দেখতে চাওয়াকে কেন্দ্র করে কর্তব্যরত টিকিট চেকার (টিসি) ও রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থীর বাগ্‌বিতণ্ডা ও ধাক্কাধাক্কির ঘটনা ঘটে। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।

শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, ওই ঘটনায় আইয়ুব আলী নামের এক শিক্ষার্থী হামলার শিকার হন। ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের গ্রেপ্তার ও শাস্তির দাবিতে শিক্ষার্থীরা রেল কর্তৃপক্ষকে ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান। পরে দাবির বিষয়ে সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়।

রাত আনুমানিক ১১টার দিকে শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়-সংলগ্ন রেললাইনে আগুন জ্বালিয়ে অবরোধ করেন। এতে রাজশাহীগামী মধুমতি এক্সপ্রেস হরিয়ান এলাকায় আটকা পড়ে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে রেলওয়ের পক্ষ থেকে কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া হলে ‘মার্চ টু রাজশাহী রেলস্টেশন’ কর্মসূচি ঘোষণা করেন শিক্ষার্থীরা। 

এরপর তাঁরা রাজশাহী রেলস্টেশনের দিকে যাত্রা করেন।

রাত ১২টার দিকে বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা রাজশাহী রেলস্টেশনে পৌঁছালে সেখানে উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। প্রায় দেড় ঘণ্টা ধরে কয়েক দফায় স্টেশনে ভাঙচুর চালানোর অভিযোগ ওঠে। 

প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, গাছের ডাল, বাঁশ, লাঠি ও ইট-পাটকেল ব্যবহার করে স্টেশনের কাচের জানালা, ডাস্টবিন, দোকানপাট, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কক্ষ, সাইনবোর্ড ও সিসিটিভি ক্যামেরা ভাঙচুর করা হয়। এ সময় রেলওয়ে থানা, পার্সেল অফিস ও রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর কার্যালয়ে হামলা ভাংচুর ছাড়াও বিক্ষুব্ধ ছাত্ররা বুকিং অফিসের গেট ভেঙ্গে ভিতরে প্রবেশ করে লুটপাটেরও চেষ্টা করেন। 

তবে,প্রধান বুকিং কর্মকর্তা আব্দুল মমিন বলেন,শিক্ষার্থীরা বুকিং অফিসের গেট ভেংগে ভেতরে ঢোকার চেস্টা করে ব্যার্থ হন। কোন কিছু খোয়া যায়নি।তবে টিকিট কাউন্টারের গ্রিলের কাঁচ ভেংগেছে এবং কয়েকটি কম্পিউটার ভেঙে নষ্ট করে দিয়েছে। 

এ সময় স্টেশনে অপেক্ষমাণ যাত্রীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। কয়েকজন যাত্রী অভিযোগ করেন, বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীদের ধাওয়া ও হামলার কারণে তাঁরা নিরাপদ স্থানে সরে যেতে বাধ্য হন। কারও কারও মালামাল লুটেরও অভিযোগ পাওয়া গেছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি।

রাত দেড়টার দিকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরিয়াল বডি ও সংশ্লিষ্টদের প্রচেষ্টায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে। পরে শিক্ষার্থীরা রেলস্টেশন এলাকা ছেড়ে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ফিরে যান। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ও রাজশাহী সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. মাহফুজুর রহমান রিটনের প্রচেষ্টায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।

‘বিন্দুপরিমাণ অ্যাপলজি করব না’: রাবি জিএস:-

ঘটনার পর এক ফেসবুক পোস্টে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের জিএস সালাউদ্দিন আম্মার বলেন, শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার ঘটনায় তিনি ‘বিন্দুপরিমাণ অ্যাপলজি’ করবেন না। তিনি লেখেন, ‘কথায় কথায় শিক্ষার্থীদের গায়ে হাত তোলার পরিমাণ ভয়ানক, সেটা আজ বুঝেছে হয়তো।’

একই পোস্টে তিনি দাবি করেন, আন্দোলনের সময় কোনো সাধারণ মানুষের ক্ষতি হয়নি। তিনি আরও বলেন, ক্ষতিপূরণ দিতে হলে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার সঙ্গে জড়িতদের কাছ থেকেই নেওয়া উচিত এবং মামলা করতে হলে হামলাকারীদের বিরুদ্ধে করা উচিত। শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার ঘটনায় ‘এক ফোঁটা রক্তের হিসাবও নেওয়া হবে’ বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

এর আগে সন্ধ্যায় আইয়ুব আলীর ওপর হামলার অভিযোগে জড়িতদের গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়ে রেল কর্তৃপক্ষের কাছে ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। তাঁর দাবি, আইয়ুব আলী ওই ট্রেনের যাত্রী ছিলেন না। ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সমস্যা হলে সেখানে গিয়ে প্রতিবাদ করার কারণে তিনি হামলার শিকার হন।

রেলওয়ের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অবহেলার অভিযোগ:-

স্টেশনে কর্মরত নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মচারী অভিযোগ করেন, রাজশাহী রেলওয়ে স্টেশনের ব্যবস্থাপনা ও পরিস্থিতি মোকাবিলায় সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা যথাযথ গুরুত্ব দেননি। তাঁর দাবি, ঘটনার প্রায় পাঁচ ঘণ্টা পর শিক্ষার্থীরা স্টেশনে এসে হামলা চালান। এ সময়ের মধ্যে বিষয়টি সমাধানে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের যথেষ্ট সময় ছিল।

ওই কর্মচারী ব্যবস্থাপক আহম্মদ হোসেন মাসুম ও প্রধান বাণিজ্যিক কর্মকর্তা আহসানুল্লাহ ভূঁইয়ার ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। তবে এটি ওই কর্মচারীর ব্যক্তিগত অভিযোগ; এর পক্ষে স্বাধীন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

পশ্চিমাঞ্চল রেলের মহাব্যবস্থাপক আহম্মদ হোসেন মাসুমের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যর্থতার অভিযোগের বিষয়ে জানতে তাঁর সরকারি মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন না ধরায় তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

এছাড়া সমস্যা সমাধানে কোন রেলওয়ে কর্মকর্তাকে স্টেশনে দেখা যায়নি। 

টিকিট তল্লাশিকে কেন্দ্র করেই ঘটনার সূত্রপাত—টিসির দাবি:-

স্টেশনে কর্মরত নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক টিসি বলেন, প্ল্যাটফর্মের প্রবেশপথে এক রাবি শিক্ষার্থীর কাছে কর্তব্যরত টিসি টিকিট দেখতে চাইলে ওই শিক্ষার্থী উত্তেজিত আচরণ করেন। একপর্যায়ে তিনি নিরাপত্তা বাহিনীর এক সদস্যের ইউনিফর্ম ধরে টানাটানি করেন বলে দাবি করেন ওই টিসি। এ সময় উভয় পক্ষের মধ্যে ধাক্কাধাক্কির ঘটনা ঘটে।

তাঁর দাবি, প্ল্যাটফর্মে টিকিট ছাড়া যাত্রী প্রবেশ ঠেকাতে রেলওয়ের পক্ষ থেকে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে। তবে ঘটনাটি কীভাবে হাতাহাতিতে রূপ নেয়, তা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।

চার নিরাপত্তাকর্মী সাময়িক বরখাস্ত:-

এদিকে ঘটনার পর রাজশাহী রেলস্টেশনে সংঘটিত অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনায় জড়িত থাকার সন্দেহে রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর চার সদস্যকে বরখাস্ত করা হয়েছে বলে রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে।

বরখাস্ত হওয়া সদস্যরা হলেন—মো. আরিফ হোসেন (স্টাফ নম্বর সি-৯৮৯), মো. রোকন উদ্দীন (সি-৮৮৩), মো. শফিকুল ইসলাম (সি-১৩২১) ও মো. শাহাদত হোসেন (সি-৬০০)।

পশ্চিমাঞ্চল রেলের চিফ কমান্ড্যান্ট আশাবুল হক তাঁদের বিরুদ্ধে এ ব্যবস্থা নিয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। তবে ঠিক কী অভিযোগে এবং কোন প্রক্রিয়ায় তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি।


প্রধান বুকিং কর্মকর্তা আব্দুল মমিন বলেন,শিক্ষার্থীরা বুকিং অফিসের গেট ভেংগে ভেতরে ঢোকার চেস্টা করে ব্যার্থ হন। কোন কিছু খোয়া যায়নি।তবে টিকিট কাউন্টারের গ্রিলের কাঁচ ভেংগেছে এবং কয়েকটি কম্পিউটার ভেঙে নষ্ট করে দিয়েছে। 

নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি:-

ঘটনাটি নিয়ে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একজন রাবি শিক্ষার্থীর ওপর হামলার অভিযোগ যেমন গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা প্রয়োজন, তেমনি আন্দোলনের সময় রেলস্টেশনে ভাঙচুর, রাষ্ট্রীয় সম্পদের ক্ষতি কিংবা সাধারণ যাত্রীদের মালামাল লুটের অভিযোগ থাকলে সেগুলোরও নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া জরুরি।

একই সঙ্গে উত্তেজনাকর পরিস্থিতির মধ্যে রেলস্টেশন, রাষ্ট্রীয় সম্পদ ও যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট প্রশাসন ও রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের ভূমিকা যথাযথ ছিল কি না, সেটিও খতিয়ে দেখার দাবি উঠেছে।


সংশ্লিষ্টদের মতে, কোনো পক্ষের অভিযোগ বা বক্তব্যকে একতরফাভাবে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে বিবেচনা না করে প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য, সিসিটিভি ফুটেজ, ক্ষয়ক্ষতির হিসাব ও অন্যান্য তথ্য যাচাই করে প্রকৃত ঘটনা বের করা প্রয়োজন। তদন্তে যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যাবে, তাঁদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়াই হবে এ ঘটনার গ্রহণযোগ্য সমাধান।




রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) এক শিক্ষার্থীর ওপর হামলার অভিযোগকে কেন্দ্র করে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে রাজশাহী রেলস্টেশন।ছবি - বিজয় বাংলা