Template: 3
Tpl 1 Tpl 2 Tpl 3
অনলাইন ডেস্ক | ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
bijoybangla.news
logo
বিজয় বাংলা নিউজ
জাতীয় দৈনিক

রাজশাহী রেলস্টেশনে মধ্যরাতের তাণ্ডব, প্রশ্নের মুখে রাবি জিএস আম্বরের নেতৃত্ব

আবুল কালাম আজাদ Midnight riot at Rajshahi railway station

একজন শিক্ষার্থীকে মারধরের অভিযোগ। প্রতিবাদে বিক্ষোভ। এরপর রেললাইন অবরোধ। সেখান থেকে ‘মার্চ টু স্টেশন’। কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে রাজশাহী রেলওয়ে স্টেশন পরিণত হয় উত্তেজনার কেন্দ্রে। ভাঙচুর করা হয় স্টেশনের প্রবেশপথ, টিকিট কাউন্টার, বিভিন্ন কক্ষ, সিসিটিভি ক্যামেরা, রেলওয়ে থানা ও নিরাপত্তা বাহিনীর কার্যালয়সহ বিভিন্ন স্থাপনা। বন্ধ হয়ে যায় রাজশাহীর সঙ্গে দেশের রেল যোগাযোগ।

ঘটনার শুরু হয়েছিল রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর (আরএনবি) সদস্যদের বিরুদ্ধে এক শিক্ষার্থীকে মারধরের অভিযোগকে কেন্দ্র করে। কিন্তু প্রতিবাদের একপর্যায়ে রাষ্ট্রীয় সম্পদে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনায় নতুন প্রশ্ন সামনে এসেছে—কীভাবে একটি প্রতিবাদ কর্মসূচি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেল, কারা সেখানে সক্রিয় ছিল এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ভূমিকা কী ছিল?

ঘটনার পর শিক্ষার্থীকে মারধরের অভিযোগে আরএনবির চার সদস্যকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। স্টেশনে ভাঙচুর ও ক্ষয়ক্ষতির ঘটনাও তদন্তে নেওয়া হয়েছে। গঠন করা হয়েছে দুটি তদন্ত কমিটি।


একজন শিক্ষার্থীকে মারধর, তারপরই উত্তেজনা:-

রোববার (২০সেপ্টেম্বর) সন্ধাসাড়ে ৭ টার দিকে রাজশাহী রেলস্টেশনে যান রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী আইয়ুব আলী। স্বজনকে নিতে স্টেশনে যাওয়ার পর কয়েকজন শিক্ষার্থীর সঙ্গে নিরাপত্তাকর্মীদের কথাকাটাকাটি হয়।

আইয়ুব আলী ওই শিক্ষার্থীদের পক্ষ নিয়ে কথা বললে তাঁকে মারধর করা হয় বলে অভিযোগ ওঠে। পরে গুরুতর আহত অবস্থায় তাঁকে উদ্ধার করে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

আইয়ুবকে স্টেশন এলাকায় মাঝ রাস্তায় পড়ে থাকার ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে রাবি শিক্ষার্থীদের মধ্যে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে।এই ঘটনায় অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি ওঠে।

ফেসবুক পোস্ট থেকে ‘মার্চ টু স্টেশন’:-

ঘটনার পর রাকসুর জিএস সালাহউদ্দিন আম্মার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। সেখানে দ্রুত অভিযুক্তদের গ্রেপ্তারের দাবি জানানো হয়।

এরপর বিশ্ববিদ্যালয়-সংলগ্ন রেলস্টেশন এলাকায় শিক্ষার্থীরা জড়ো হন। শুরু হয় বিক্ষোভ। একপর্যায়ে রেললাইন অবরোধ করে আগুন জ্বালানোর ঘটনাও ঘটে। এতে রাজশাহীর সঙ্গে দেশের অন্যান্য অঞ্চলের রেল যোগাযোগ ব্যাহত হয়।

পরে রাজশাহী রেলস্টেশনের দিকে যাওয়ার কর্মসূচি দেওয়া হয়। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কয়েক শ শিক্ষার্থী নগরীর প্রধান রেলস্টেশনের দিকে অগ্রসর হন।


স্টেশনে ঢুকে একের পর এক স্থাপনায় ভাঙচুর:-

২০ সেপ্টেম্বর, রাত সাড়ে ১১টার পর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় রেলস্টেশনে ভাঙচুর ও রেললাইনে অগ্রিম সংযোগ করে বিক্ষোভ  শুরু হয় বলে রেলওয়ে ও প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা গেছে।

রাত ১২ টার সময় তারা রাজশাহী রেল স্টেশনের প্রবেশ করেই, প্রথমে স্টেশনের প্রবেশপথের কাচ ভাঙা হয়। এরপর টিকিট কাউন্টার, অনুসন্ধান বক্স , বিশ্রামাগার, বুকিং অফিস সহ বিভিন্ন দপ্তরের কক্ষ ও আসবাবপত্রে হামলা চালানো হয়। এছাড়া,বাদ যায়নি সিসিটিভি ক্যামেরা, সাইনবোর্ড ও ডাস্টবিনও। রেলওয়ে থানা, পার্সেল অফিস এবং আরএনবির কার্যালয়েও ভাঙচুরের অভিযোগ পাওয়া গেছে।এ সময় স্টেশনে থাকা যাত্রীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। নারী ও শিশুসহ অনেক যাত্রী নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার চেষ্টা করেন।

রেলওয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, ভাঙচুরে সরকারি স্থাপনার পাশাপাশি যাত্রীসেবার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে মোট আর্থিক ক্ষতির হিসাব এখনো চূড়ান্ত হয়নি।

‘বাধা দিতে গিয়ে’ বিএনপি-ছাত্রদল নেতাকর্মীদের সঙ্গে উত্তেজনা:-

স্টেশনে ভাঙচুরের খবর পেয়ে রাতে বিএনপি ও ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা সেখানে যান। তাঁদের মধ্যে রাজশাহী মহানগর বিএনপির সভাপতি মামুন অর রশিদ, সাধারণ সম্পাদক ও রাজশাহী সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মাহফুজুর রহমান রিটন এবং মহানগর ছাত্রদলের সদস্য সচিব এমদাদুল হক লিমনসহ অনেকে ছিলেন।

তাঁদের দাবি, শিক্ষার্থীকে মারধরের ঘটনায় তাঁরা শিক্ষার্থীদের দাবির সঙ্গে একমত ছিলেন। তবে রাষ্ট্রীয় সম্পদ রক্ষায় ভাঙচুর বন্ধ করার আহ্বান জানান।

এ সময় শিক্ষার্থীদের একটি অংশের সঙ্গে তাঁদের উত্তেজনা তৈরি হয়। বিএনপি নেতাকর্মীদের অভিযোগ, ভাঙচুরে বাধা দেওয়ার কারণে তাঁদের উদ্দেশে স্লোগান দেওয়া হয় এবং তাঁদের ওপর চড়াও হওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের হস্তক্ষেপ:-

পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হওয়ার মধ্যে রাবি উপাচার্য অধ্যাপক ফরিদুল ইসলাম, প্রক্টর অধ্যাপক মাহবুবুর রহমানসহ প্রক্টরিয়াল বডির সদস্যরা ঘটনাস্থলে যান।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে শিক্ষার্থীকে মারধরের ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয়। পরে শিক্ষার্থীরা স্টেশন এলাকা ছেড়ে ক্যাম্পাসে ফিরে যান।

রাবির উপউপাচার্য অধ্যাপক আব্দুল আলিম বলেন, রেল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের আলোচনা হয়েছে। আগের ঘটনাগুলোতে সময়মতো ব্যবস্থা নেওয়া হলে পরিস্থিতি এতটা জটিল পর্যায়ে যেত না বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

চার আরএনবি সদস্য সাময়িক বরখাস্ত:-

শিক্ষার্থী আইয়ুব আলীকে মারধরের অভিযোগের পর রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ দ্রুত ব্যবস্থা নেয়।

পশ্চিমাঞ্চল রেলের চিফ কমান্ড্যান্ট মোহা. আশরাফুল ইসলাম স্বাক্ষরিত আদেশে আরএনবির চার সদস্যকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়।

বরখাস্ত হওয়া সদস্যরা হলেন,আরিফ হোসেন, রোকন উদ্দীন, শফিকুল ইসলাম ও শাহাদত হোসেন।

তাঁদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ তদন্ত করে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ।

দুটি তদন্ত, সামনে এখন দায় নির্ধারণের প্রশ্ন:-

ঘটনার পর শুধু শিক্ষার্থীকে মারধরের বিষয়টিই নয়, স্টেশনে ভাঙচুর ও রাষ্ট্রীয় সম্পদের ক্ষয়ক্ষতির বিষয়টিও তদন্তের আওতায় এসেছে।

পশ্চিমাঞ্চল রেলের মহাব্যবস্থাপক আহম্মেদ হোসেন মাসুম জানিয়েছেন, ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ এবং ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো খতিয়ে দেখতে দুটি তদন্ত কমিটি কাজ করছে। তদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পর ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণ এবং প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

ফলে এখন মূল প্রশ্ন দুটি—আইয়ুব আলীকে মারধরের ঘটনায় কারা দায়ী এবং স্টেশনে ভাঙচুরের ঘটনায় কারা কীভাবে জড়িত ছিলেন।

প্রশাসকের বক্তব্য  :-

রাসিক প্রশাসক মাহফুজুর রহমান রিটন বলেন, শিক্ষার্থীকে মারধরের ঘটনায় জড়িতদের শাস্তি হওয়া উচিত। একই সঙ্গে রাষ্ট্রীয় সম্পদ রক্ষার দায়িত্বও সবার।

তাঁর দাবি, স্টেশনে ভাঙচুরে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে সাধারণ শিক্ষার্থীর সংখ্যা কম ছিল এবং একটি রাজনৈতিক ছাত্র সংগঠনের নেতাকর্মীদের উপস্থিতি ছিল।

তবে তাঁর এই বক্তব্যের স্বাধীন সত্যতা তদন্তের মাধ্যমে যাচাই হওয়ার বিষয়।

ছাত্রদল নেতার বক্তব্য:-

ছাত্রদল নেতা এমদাদুল হক লিমনও অভিযোগ করেন, রাকসুর জিএস আম্মারের নেতৃত্বে স্টেশনে নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড হয়েছে। তিনি এ ঘটনায় জড়িতদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানান।

রাবি জিএস আম্মারের বক্তব্য:-

 ‘এ ধরনের আচরণ মেনে নেওয়া হবে না’, রাকসুর জিএস সালাহউদ্দিন আম্মারের কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, গত দুই মাসে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে একাধিক অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেছে। সর্বশেষ ২০ সেপ্টেম্বরের ঘটনাটি ছিল অপ্রত্যাশিত।

স্টেশনে ভাঙচুরের বিষয়ে তিনি বলেন, রেলওয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলতে হবে এবং তাঁদের সঙ্গে সম্মানজনক আচরণ করতে হবে।

তাঁর ভাষ্য, শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ‘কুকুর-বিড়ালের মতো’ আচরণ করা হলে তা মেনে নেওয়া হবে না।

রেলওয়ের বার্তা:-আলোচনার পথেই সমাধান

পশ্চিমাঞ্চল রেলের মহাব্যবস্থাপক আহম্মেদ হোসেন মাসুম বলেন, ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণের কাজ চলছে। তদন্ত শেষে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তিনি আরও বলেন, রেলওয়ে ও বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে যে দূরত্ব তৈরি হয়েছে, তা আলোচনার মাধ্যমে কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বসে সমস্যাগুলো সমাধানের চেষ্টা করা হবে।

ক্ষোভ সাধারণ মানুষের মধ্যেও:-

রেলস্টেশনের মতো জনসাধারণের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় ভাঙচুরের ঘটনায় ক্ষোভ জানিয়েছেন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ।

রাজশাহী রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ:-

রাজশাহী রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মো. জামাত খান বলেন, শিক্ষার্থীকে মারধরের ঘটনায় তিনি নিন্দা জানান। একই সঙ্গে সরকারি সম্পদ ধ্বংসের সঙ্গেও যারা জড়িত, তাদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানান তিনি।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও এ ঘটনায় ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। প্রত্যক্ষদর্শী তাসনিম আলম সৈকত এক পোস্টে ঘটনাটিকে কেন্দ্র করে সম্পদ নষ্ট ও সাধারণ মানুষের ভোগান্তির কথা তুলে ধরেছেন।

ভাঙচুরের পরও থেকে যাচ্ছে বড় প্রশ্ন:-

একজন শিক্ষার্থীকে মারধরের অভিযোগ যে ক্ষোভের জন্ম দিয়েছিল, তা দ্রুতই বড় আকারের সংঘাতে রূপ নেয়। বিক্ষোভকারীদের দাবির সঙ্গে সাধারণ মানুষের সহমর্মিতা থাকলেও রেলস্টেশনের মতো গুরুত্বপূর্ণ সরকারি স্থাপনায় ভাঙচুরের ঘটনায় এখন দায় নির্ধারণের দাবি উঠেছে।

একই সঙ্গে রেলওয়ের নিরাপত্তাকর্মীদের আচরণ, শিক্ষার্থীদের সঙ্গে রেলওয়ের সম্পর্ক এবং ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতি ঠেকাতে প্রশাসনিক প্রস্তুতি—সবকিছু নিয়েই নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

রোববার রাতের ঘটনার পর সোমবার সকাল থেকে রাজশাহীর সঙ্গে দেশের বিভিন্ন রুটে ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক হয়েছে। তবে কয়েক ঘণ্টার সেই উত্তেজনার রেশ এখনো কাটেনি। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনেই স্পষ্ট হতে পারে—শিক্ষার্থীকে মারধরের ঘটনার দায় কোথায়, আর রেলস্টেশনে রাষ্ট্রীয় সম্পদে হামলার দায়ই বা কার।

© বিজয় বাংলা নিউজ
bijoybangla.news