
পুলিশের সদস্যদের শরীরে বডি ক্যামেরা ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে, তাহলে ট্রেনের টিকিট পরীক্ষক (টিটিই) ও গার্ডদের শরীরে বডি ক্যামেরা থাকবে না কেন—এ প্রশ্ন এখন গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনার দাবি রাখে। বিশেষ করে টিকিট পরীক্ষা, ভাড়া ও জরিমানা আদায় কিংবা যাত্রী ও রেলকর্মীর মধ্যে কোনো বিরোধের ঘটনায় প্রকৃত ঘটনা নির্ধারণে ভিডিও প্রমাণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
রেলওয়ের যাত্রীসেবা ও টিকিটিং ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা বাড়াতে পরীক্ষামূলকভাবে টিটিই ও ট্রেন গার্ডদের ইউনিফর্মে ছোট আকারের বডি-ওর্ন ক্যামেরা সংযোজনের বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে। আধুনিক ক্যামেরায় বিস্তৃত পরিসরে ভিডিও ধারণের সুবিধা থাকায় দায়িত্ব পালনের সময় ঘটে যাওয়া গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলোও রেকর্ড করা সম্ভব।
টিকিট পরীক্ষার সময় কোনো যাত্রীর টিকিট না থাকা, অতিরিক্ত ভাড়া বা জরিমানা আদায়, আসন নিয়ে বিরোধ কিংবা অর্থ লেনদেনকে কেন্দ্র করে অভিযোগ উঠলে অনেক সময় দুই পক্ষের বক্তব্য পরস্পরবিরোধী হয়ে পড়ে। এ ধরনের পরিস্থিতিতে ভিডিও রেকর্ড থাকলে দায়িত্ব পালনকারী রেলকর্মী যেমন নিজের বক্তব্যের পক্ষে প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারবেন, তেমনি কোনো যাত্রী অভিযোগ করলে সেটিও যাচাইয়ের সুযোগ থাকবে।
ক্যামেরা কারও বিরুদ্ধে নয়, স্বচ্ছতার জন্য:-
বডি ক্যামেরার মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত কোনো পক্ষকে সন্দেহের চোখে দেখা নয়; বরং দায়িত্ব পালনের প্রক্রিয়াকে আরও স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করা।
একজন টিটিই যখন কোনো কামরায় টিকিট পরীক্ষা করবেন, তখন তার সঙ্গে যাত্রীর কথোপকথন, টিকিট যাচাই, ভাড়া বা জরিমানা আদায়ের প্রক্রিয়া এবং কোনো বিরোধ সৃষ্টি হলে তার প্রাথমিক পরিস্থিতি ভিডিওতে ধারণ হতে পারে। পরবর্তীতে অভিযোগ উঠলে নির্ধারিত নিয়মে সেই ভিডিও পর্যালোচনা করে ঘটনার প্রকৃত অবস্থা যাচাই করা সম্ভব হবে।
তবে শুধু ক্যামেরা স্থাপন করলেই সব ধরনের অনিয়ম বা বিরোধ বন্ধ হয়ে যাবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। ক্যামেরা কখন চালু থাকবে, কখন বন্ধ করা যাবে, ভিডিও কে দেখতে পারবেন এবং কতদিন তা সংরক্ষণ করা হবে—এসব বিষয়ে সুস্পষ্ট নীতিমালা থাকা প্রয়োজন।
যাত্রী ও রেলকর্মী—দুই পক্ষেরই সুরক্ষা:-
বডি ক্যামেরার অন্যতম সুবিধা হতে পারে যাত্রী ও রেলকর্মী উভয়ের সুরক্ষা নিশ্চিত করা। কোনো রেলকর্মীর বিরুদ্ধে ভিত্তিহীন অভিযোগ উঠলে ভিডিও রেকর্ড তার বক্তব্যের পক্ষে প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। আবার কোনো যাত্রী প্রকৃতপক্ষে হয়রানি বা অনিয়মের শিকার হলে ভিডিও ফুটেজ তদন্তে সহায়ক হতে পারে।
এতে টিকিট পরীক্ষার সময় উভয় পক্ষের দায়িত্বশীল আচরণের প্রবণতা বাড়তে পারে। কারণ, গুরুত্বপূর্ণ কোনো ঘটনা রেকর্ড হওয়ার বিষয়টি যাত্রী ও রেলকর্মী উভয়ের মধ্যেই দায়িত্বশীলতার পরিবেশ তৈরি করতে পারে।
তবে এর সঙ্গে ব্যক্তিগত গোপনীয়তার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। ভিডিও ফুটেজ যাতে অনুমতি ছাড়া ছড়িয়ে না পড়ে, ব্যক্তিগত তথ্যের অপব্যবহার না হয় কিংবা কোনো রেকর্ড ইচ্ছাকৃতভাবে মুছে ফেলা না যায়—সে জন্য প্রযুক্তিগত ও প্রশাসনিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি।
পশ্চিম রেলের সাম্প্রতিক ঘটনা :-
রাজশাহী রেলস্টেশনে সম্প্রতি পরপর ঘটে যাওয়া ঘটনার পর কর্তব্যরত টিটি ও গার্ডদের বডি ক্যামেরা স্থাপনের গুরুত্ব আরও বেড়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে রাজশাহী রেলস্টেশনে টিকিট পরীক্ষা ও এক শিক্ষার্থীর সঙ্গে রেলকর্মীদের বিরোধকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা, পরে রেললাইন অবরোধ এবং স্টেশনে ভাঙচুরের ঘটনা রেলওয়ের নিরাপত্তা ও জবাবদিহিতার বিষয়টি নতুন করে সামনে এনেছে।
ওই ঘটনার পর রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। একই সঙ্গে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রেলওয়ে ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের মধ্যে সমন্বয় ও আলোচনার প্রয়োজনীয়তাও সামনে এসেছে।
এ ধরনের ঘটনায় শুরু থেকেই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কথোপকথন, আচরণ ও ঘটনাপ্রবাহের নির্ভরযোগ্য ভিডিও রেকর্ড থাকলে তদন্তের ক্ষেত্রে প্রকৃত ঘটনা নির্ধারণ সহজ হতো। একই সঙ্গে কোনো পক্ষের বক্তব্যের ওপর এককভাবে নির্ভর না করে প্রমাণের ভিত্তিতে বিষয়টি যাচাই করার সুযোগ তৈরি হবে।
রাজশাহী রেলস্টেশনে সাম্প্রতিক ক্ষয়ক্ষতির ঘটনাও আবার মনে করিয়ে দিয়েছে—রেলস্টেশন, ট্রেন, রেললাইন, কোচসহ রেলওয়ের সব অবকাঠামো রাষ্ট্রীয় সম্পদ। এসব সম্পদের ক্ষতি শেষ পর্যন্ত জনগণের সম্পদেরই ক্ষতি। তাই যাত্রীসেবা ও নিরাপত্তার পাশাপাশি সরকারি সম্পদ রক্ষায়ও আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর বিষয়টি বিবেচনা করা প্রয়োজন।
পরীক্ষামূলকভাবে চালু হতে পারে:-
রেলওয়ের সব ট্রেনে একসঙ্গে বডি ক্যামেরা চালুর পরিবর্তে প্রথমে কয়েকটি আন্তঃনগর ট্রেনে পরীক্ষামূলকভাবে এ ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে। নির্বাচিত টিটিই ও গার্ডদের ক্যামেরা দিয়ে দায়িত্ব পালন করানো, নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত ভিডিও সংরক্ষণ এবং অভিযোগ বা তদন্তের প্রয়োজনে অনুমোদিত কর্মকর্তার মাধ্যমে ফুটেজ পর্যালোচনার ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
একই সঙ্গে ক্যামেরার ব্যবহার ও তথ্য সংরক্ষণ বিষয়ে একটি সুস্পষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন প্রয়োজন। সেখানে কখন রেকর্ডিং চালু থাকবে, কোন পরিস্থিতিতে ক্যামেরা বন্ধ করা যাবে, ভিডিও কে দেখতে পারবেন, কতদিন তা সংরক্ষণ করা হবে এবং তদন্ত ছাড়া ভিডিও অন্য কারও কাছে সরবরাহ করা যাবে কি না—এসব বিষয় স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকতে হবে।
প্রযুক্তির পাশাপাশি টিটিই ও গার্ডদের যথাযথ প্রশিক্ষণও প্রয়োজন। শুধু ক্যামেরা পরিয়ে দিলেই স্বচ্ছতা নিশ্চিত হবে না; বরং ক্যামেরায় ধারণ করা তথ্য কীভাবে সংরক্ষণ ও প্রয়োজনের সময় প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা হবে, সেটিও নির্ধারণ করতে হবে।
প্রমাণ থাকুক, অভিযোগ নয়:-
রেলওয়ের মতো জনসেবামূলক প্রতিষ্ঠানের প্রতি মানুষের আস্থা বাড়ানোর অন্যতম উপায় হলো স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা। টিকিট পরীক্ষার সময় কোনো অনিয়ম হলে যেমন তার প্রমাণ থাকা প্রয়োজন, তেমনি দায়িত্বশীলভাবে কাজ করা কোনো রেলকর্মীর বিরুদ্ধেও অভিযোগ উঠলে বিষয়টি নিরপেক্ষভাবে যাচাই করার সুযোগ থাকা দরকার।
সেই বিবেচনায় বাংলাদেশ রেলওয়ের টিটিই ও ট্রেন গার্ডদের শরীরে বডি ক্যামেরা ব্যবহারের বিষয়টি পরীক্ষামূলকভাবে বিবেচনা করা যেতে পারে।
পশ্চিম রেলের প্রধান বাণিজ্যিক কর্মকর্তা যা জানালেন :-
পশ্চিম রেলের প্রধান বাণিজ্যিক কর্মকর্তা আহসান উল্লা ভূঁইয়া টিসি, টিসি ও গার্ডদের স্বচ্ছতা নিয়ে তাদের বডি ক্যামেরা স্থাপনের বিষয়ে বলেন, রেল কর্তৃপক্ষ ইতিমধ্যেই টিটি, গার্ড, এটেন্ডেন্স সহ রানিং রানিং কর্মচারীদের বডি ক্যামেরা স্থাপনের বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
এটি বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় সময় লাগবে। আমরা বিষয়টি রেল মন্ত্রণালয় বিষয়টি উত্থাপন করবো।সেখান থেকে অনুমোদন পেলেই তা বাস্তবায়ন করা হবে।
তিনি আরো বলেন, বডি ক্যামেরা এটি একটি স্বচ্ছ প্রক্রিয়া। এটি বাস্তবায়িত হলে ট্রেনের কর্তব্যরত টিটি, গার্ডদের সাথে সম্মানিত যাত্রীদের ভুল বুঝাবুঝি গুলো প্রকাশ্যে আসবে। ফলে একদিকে বাড়বে কর্তব্যরত রেল কর্মীদের স্বচ্ছতা। অন্যদিকে কমবে যাত্রীদের অভিযোগের সত্যতা।
ইতিমধ্যে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছে এবং বিষয়টি বাস্তবায়নের জন্য জন্য ডেপুটি সিসিএম আব্দুল্লাহ আল মামুনকে ব্যবস্থায়ন প্রক্রিয়া তৈরির জন্য নেওয়ার জন্য বলা হয়েছে।
ডেপুটি সিসিএম:-
বডি ক্যামেরা স্থাপন বিষয়ে পশ্চিম রেলের ডেপুটি সিসিএম আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, সম্প্রতি পশ্চিম রেলে, ট্রেনে সংঘটিত ঘটনাগুলি নিয়ে যাত্রী ও রেল কর্মীদের পাল্টাপাল্টি অভিযোগ নিয়ে বিভ্রান্তিতে পড়তে হয়। অনেক সময় দেখা যায় যাত্রীরা মিথ্যা অভিযোগ দিচ্ছে কিন্তু সেটি, রেল কর্মীরা প্রমাণ করতে পারছেন না। ফলে রেল কর্মীরায় শাস্তির আওতায় আসছে।
বিষয়টি নিয়ে পশ্চিম কর্মকর্তাদের মিটিংয়ে আলোচনা হয়েছে। এ বিষয়ে পশ্চিম রেল কর্তৃপক্ষ ঢাকা রেল ভবনকে অবহিত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
তিনি আরো বলেন, বিষয়টি পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সাথে আলোচনা করে এর মূল্য নির্ধারণ, বডি ক্যামেরা বিক্রেতা ডিলার বা কোম্পানির সাথে আলোচনা করে এর দমূল্য নির্ধারন করে রেল মন্ত্রণালয়ে উপস্থাপন করা হবে।
সেটি অনুমোদন হলে পরে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ায় টেন্ডারের মাধ্যমে তার ক্রয় করা হবে।
সার্বিক প্রক্রিয়া শেষ করতে কত সময় লাগতে পারে তা তিনি নির্দিষ্ট করে বলতে পারেননি। তবে তিনি বডি ক্যামেরা স্থাপনের গুরুত্বের বিষয়ে বলেন, যাত্রী ও রেল কর্মীদের স্বচ্ছতার জন্য বডি ক্যামেরা অপরিহার্য।এতে দের স্বচ্ছতা ওই জবাবদিহিতা বাড়বে।
ক্যামেরা কোনো পক্ষের বিরুদ্ধে নয়;-
এটি হতে পারে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও সত্য উদঘাটনের একটি প্রযুক্তিগত মাধ্যম।যেখানে দায়িত্ব, সেখানে জবাবদিহিতা।যেখানে যাত্রী ও রেলকর্মী—উভয়ের অধিকার জড়িত, সেখানে উভয়ের নিরাপত্তাও নিশ্চিত করা প্রয়োজন।যাত্রী ও রেলকর্মী—উভয়ের নিরাপত্তায় প্রমাণ থাকুক, অভিযোগ নয়।