বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমানের রাজশাহী সফর উপলক্ষে আয়োজিত মতবিনিময় সভার ব্যয় নির্বাহে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে এককালীন অর্থ (চাঁদা) সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের শীর্ষ কর্মকর্তা এবং অভিভাবকতুল্য সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রধানের অনুষ্ঠান ঘিরে এভাবে অর্থ আদায়ের ঘটনায় স্থানীয় ব্যাংকিং অঙ্গনে চরম ক্ষোভ, অসামঞ্জস্যতা ও নীতিগত প্রশ্ন উঠেছে।
'ব্যাংকার্স ক্লাব রাজশাহী'র পক্ষ থেকে সম্প্রতি রাজশাহী অঞ্চলের সকল ব্যাংক প্রধান ও আঞ্চলিক প্রধানদের কাছে পাঠানো একটি দাফতরিক চিঠিতে এই অর্থ সংগ্রহের বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়। চিঠির সূত্রে জানা গেছে, আগামী ২ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে রাজশাহী মহানগরের একটি কনভেনশন হলে গভর্নরের সঙ্গে স্থানীয় ব্যাংকারদের এই মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হবে।
অনুষ্ঠানের সার্বিক ব্যয় বহনের অজুহাতে প্রতিটি সদস্য ব্যাংক থেকে ১৫ হাজার টাকা করে এককালীন অনুদান/চাঁদা ধার্য করা হয়েছে। চিঠিতে ব্যাংকগুলোকে নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই এই অর্থ ব্যাংকার্স ক্লাবের নির্দিষ্ট অ্যাকাউন্টে জমা দেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়। .
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের শীর্ষ প্রধানের উপস্থিতিতে আয়োজিত অনুষ্ঠানের জন্য এভাবে অধীনস্থ বা বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে টাকা তোলার ঘটনাকে নজিরবিহীন বলে মনে করছেন খোদ ব্যাংকিং খাতের কর্মকর্তারা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন ব্যাংক কর্মকর্তা উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, "বাংলাদেশ ব্যাংক হলো দেশের সমস্ত ব্যাংকের মূল নিয়ন্ত্রক সংস্থা (Regulator)। নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রধানকে স্বাগত জানাতে বা তাঁর সঙ্গে সভার নামে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে অর্থ আদায় পেশাগত নৈতিকতা ও সুশাসনের পরিপন্থী। এটি সুস্পষ্ট 'স্বার্থের সংঘাত' (Conflict of Interest) তৈরি করে।"
তারা আরও প্রশ্ন তোলেন, যেকোনো দাফতরিক বা বাণিজ্যিক সংগঠনের বার্ষিক নির্দিষ্ট ফান্ড থাকে। কিন্তু গভর্নরের সফরকে কেন্দ্র করে হঠাৎ এভাবে আলাদা চাঁদা নির্ধারণ করা প্রশাসনিক নিয়মকানুন ও নীতিগত কাঠামোর সঙ্গে কতটুকু সামঞ্জস্যপূর্ণ?
ব্যাংকের অনিয়ম ও খরচের উৎস নিয়ে যেখানে কঠোর মনিটরিং করার কথা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের, সেখানে স্বয়ং গভর্নরের সফর ঘিরে এমন অর্থ সংগ্রহের বিষয় প্রকাশ্যে এলেও আয়োজকদের পক্ষ থেকে কোনো সদুত্তর পাওয়া যায়নি। অর্থ সংগ্রহের এ যৌক্তিকতা এবং নৈতিক ভিত্তি সম্পর্কে 'ব্যাংকার্স ক্লাব রাজশাহী'-র দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তারা এ বিষয়ে কোনো ব্যাখ্যা বা মন্তব্য করতে রাজি হননি।
প্রাপ্ত তথ্যমতে, আয়োজিত সভায় বিভিন্ন ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (MD), প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (CEO), আঞ্চলিক প্রধান এবং ঊর্ধ্বতন ব্যাংক কর্মকর্তারা উপস্থিত থাকবেন।
ব্যাংকিং খাতের সার্বিক গতিশীলতা, স্থানিক ব্যবসা-বাণিজ্য ও প্রশাসনিক সমন্বয়ের লক্ষ্য নিয়ে সভাটি আয়োজনের কথা বলা হলেও, অর্থ আদায়ের খবরটি প্রকাশের পর পুরো আয়োজনটির ভাবমূর্তি ও মূল উদ্দেশ্য এখন ঢাকা পড়েছে বিতর্কের আড়ালে।