Template: 1
Tpl 1 Tpl 2 Tpl 3
বিজয় বাংলা নিউজ
জাতীয় দৈনিক | bijoybangla.news
QR
ই-পেপার / অনলাইন সংস্করণ
Wednesday , ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১১:৪১ পূর্বাহ্ন

রোদ-বৃষ্টি, শীত-গরম উপেক্ষা করে নিরাপদ ট্রেন চলাচল নিশ্চিত করেন, তবুও অবহেলিত তারা

আবুল কালাম আজাদ, বিশেষ প্রতিনিধি:- ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

রেললাইনের ওপর দিয়ে ছুটে চলে ট্রেন। জানালার পাশে বসে যাত্রীরা দেখেন বদলে যাওয়া দৃশ্য, কেউ ব্যস্ত থাকেন গল্পে, কেউ মোবাইল ফোনে। কিন্তু ট্রেনের নিচে যে রেলপথটি নিরাপদ ও চলনসই রাখতে প্রতিদিন ঘাম ঝরান একদল মানুষ, তাদের কথা খুব কমই মনে পড়ে। তারা রেলের ওয়েম্যান—রেলপথের নীরব প্রহরী।

ভোরের কুয়াশা, তীব্র রোদ, ঝুমবৃষ্টি কিংবা শীতের কনকনে ঠান্ডা—কোনোটিই তাদের কাজ থামাতে পারে না। রেললাইন পরীক্ষা, ত্রুটি শনাক্তকরণ, রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামতের কাজে মাঠে থাকতে হয় তাদের। তাদের দায়িত্বে সামান্য গাফিলতিও বড় ধরনের দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

অথচ রেলওয়ের এই গুরুত্বপূর্ণ কর্মীদের কাজের কঠিন বাস্তবতা, কর্মপরিবেশ, নিরাপত্তা ও জীবনযাত্রা নিয়ে আলোচনা তুলনামূলকভাবে কম।

একটি রেললাইন, একেকটি জীবন:-

ওয়েম্যানের কাজ শুধু রেললাইনের ওপর হাঁটা নয়। রেলপথের বিভিন্ন অংশ নিয়মিত পর্যবেক্ষণ, লাইনের ত্রুটি শনাক্ত করা, প্রয়োজনীয় রক্ষণাবেক্ষণ এবং প্রকৌশল বিভাগের নির্দেশনা অনুযায়ী মেরামত কাজে অংশ নেওয়া—সবই তাদের দায়িত্বের অংশ।

রেললাইনে কাজের সময় তাদের চারপাশে থাকে ট্রেন চলাচলের ঝুঁকি। ভারী রেল উপকরণ ও সরঞ্জাম নিয়ে কাজ করতে হয়। অনেক সময় দীর্ঘ পথ পায়ে হেঁটে পরিদর্শন করতে হয়। ফলে একই সঙ্গে শারীরিক পরিশ্রম, দুর্ঘটনার আশঙ্কা এবং মানসিক চাপ বহন করতে হয় তাদের।

অথচ রেলপথের নিরাপত্তা নিয়ে যত কথা হয়, সেই নিরাপত্তার প্রথম সারির কর্মীদের জীবন নিয়ে ততটা কথা হয় না।


বেতন-ভাতার হিসাব:-

বাংলাদেশ রেলওয়ের ২০২৩ সালের নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে ওয়েম্যান পদটি জাতীয় বেতন স্কেল-২০১৫ অনুযায়ী গ্রেড-১৯, বেতনক্রম ৮,৫০০ থেকে ২০,৫৭০ টাকা নির্ধারিত ছিল। ওই বিজ্ঞপ্তিতে ১ হাজার ৩৮৫টি ওয়েম্যান পদে নিয়োগের কথা বলা হয়।

পরে বাংলাদেশ রেলওয়ের নিজস্ব নোটিশে অপেক্ষমাণ তালিকা থেকে ২০৫ জন প্রার্থীর নিয়োগাদেশ দেওয়ার তথ্যও পাওয়া যায়। অর্থাৎ ওয়েম্যান পদে জনবল নিয়োগের প্রয়োজনীয়তা যে রেলওয়ের জন্য গুরুত্বপূর্ণ, সরকারি নিয়োগ কার্যক্রমেই তার প্রতিফলন রয়েছে।

তবে শুধু বেতন স্কেল দিয়ে একজন ওয়েম্যানের জীবনকে বিচার করা যায় না। মাঠপর্যায়ে তাদের কর্মঘণ্টা, বিশ্রামের সুযোগ, নিরাপত্তা সরঞ্জাম, চিকিৎসা সুবিধা, আবাসন এবং কর্মস্থলে অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা কতটা পর্যাপ্ত—সেটিও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

জনবল সংকটের চাপ:-

রেলওয়ের জনবলসংকটও ওয়েম্যানদের কাজের বাস্তবতা বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৪ সালের একটি প্রতিবেদনে রেলওয়ের অনুমোদিত ৪৭ হাজার ৬৩৭টি পদের বিপরীতে ২৪ হাজার ৪০৩ জন কর্মরত এবং ২৩ হাজার ২৩৪টি পদ শূন্য থাকার তথ্য প্রকাশিত হয়েছিল। অর্থাৎ অনুমোদিত জনবলের প্রায় অর্ধেকই তখন ছিল না।

প্রভাব মাঠপর্যায়ের কাজেও পড়তে পারে:-

একজন কর্মীকে বেশি এলাকা, বেশি দায়িত্ব কিংবা অতিরিক্ত সময় কাজ করতে হলে তার শারীরিক ও মানসিক চাপ বাড়ে। বিশেষ করে রেললাইনের মতো ঝুঁকিপূর্ণ অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণের ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত জনবল গুরুত্বপূর্ণ।

স্বাস্থ্য, শরীর ও মনের ওপর চাপ:-

ওয়েম্যানদের ঝুঁকি শুধু দুর্ঘটনায় সীমাবদ্ধ নয়। দীর্ঘ সময় রোদে, বৃষ্টিতে ও ধুলাবালির মধ্যে কাজ করা তাদের স্বাস্থ্যকে প্রভাবিত করতে পারে। ভারী সরঞ্জাম নিয়ে কাজ করা এবং দীর্ঘ পথ হাঁটার সঙ্গে রয়েছে শারীরিক চাপ।

তার চেয়েও বড় বিষয়—প্রতিদিন এমন একটি জায়গায় কাজ করা, যেখানে কয়েক মিনিট পরপরই দ্রুতগতির ট্রেন ছুটে যেতে পারে।

এই বাস্তবতায় ওয়েম্যানদের কাজকে তিন ধরনের ঝুঁকির মধ্যে দেখা যায়—স্বাস্থ্যঝুঁকি, শারীরিক ঝুঁকি ও মানসিক ঝুঁকি।

নিরাপত্তা সরঞ্জাম, প্রশিক্ষণ, পর্যাপ্ত বিশ্রাম এবং ঝুঁকিভিত্তিক কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা তাই শুধু শ্রমিকের কল্যাণের বিষয় নয়; এটি রেলপথের নিরাপত্তার সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত।

দুর্ঘটনার স্মৃতি বহন করেন অনেকেই:-

ওয়েম্যানদের কাজের ঝুঁকির বাস্তব উদাহরণও রয়েছে। রেলওয়ে নিয়ে প্রকাশিত একটি ফিচারে এক ওয়েম্যানের পায়ের ওপর রেললাইন পড়ে যাওয়ার ঘটনায় তার পা ভেঙে যাওয়ার এবং দীর্ঘ সাত মাস হাসপাতালে থাকার কথা উঠে এসেছে। একই প্রতিবেদনে কাজের সময় ট্রেনের নিচে পড়ে একজন ওয়েম্যানের মৃত্যুর কথাও উল্লেখ করা হয়।

এসব ঘটনা বিচ্ছিন্ন হলেও এগুলো দেখিয়ে দেয়—রেললাইনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গিয়ে যারা কাজ করেন, তাদের নিজেদের নিরাপত্তা কতটা গুরুত্বপূর্ণ।

স্থায়ী-অস্থায়ী বৈষম্যের প্রশ্ন:-

আরও একটি বড় বাস্তবতা হলো রেলওয়ের অস্থায়ী শ্রমিকদের অনিশ্চয়তা। সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে রেলওয়ের অস্থায়ী শ্রমিক পরিষদের নেতারা জানান, বিভিন্ন পদে প্রায় আট হাজার অস্থায়ী শ্রমিক কাজ করছেন,তাদের মধ্যে ওয়েম্যান, গেটকিপার, খালাসি ও পোর্টারও রয়েছেন। 

তাঁদের বেতন মাসে প্রায় সাড়ে ১৫ হাজার থেকে সাড়ে ১৬ হাজার টাকা বলে সংগঠনটির পক্ষ থেকে দাবি করা হয়। একই প্রতিবেদনে বেতন বকেয়া থাকার অভিযোগও উঠে আসে।

অন্য একটি প্রতিবেদনে অস্থায়ী ওয়েম্যান ও অন্যান্য শ্রমিকদের চাকরি স্থায়ী করার দাবির কথা উঠে এসেছে। সেখানে বলা হয়, কেউ কেউ তিন থেকে ১৬ বছর পর্যন্ত অস্থায়ী ভিত্তিতে কাজ করছেন।

অবশ্য অস্থায়ী শ্রমিকদের দাবির পাশাপাশি রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের বক্তব্য, নিয়োগের বিধি ও পদভিত্তিক বাস্তব অবস্থা আলাদাভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।

শ্রমিক সংগঠনগুলোর ভূমিকা :-

শ্রমিকদের অধিকার রক্ষায় ট্রেড ইউনিয়নের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। বেতন, কর্মঘণ্টা, ছুটি, নিরাপত্তা, চিকিৎসা, আবাসন ও চাকরির নিশ্চয়তা—এসব বিষয়ে শ্রমিকদের হয়ে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করা সংগঠনগুলোর দায়িত্বের অংশ।

রেলওয়ের বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠন বিভিন্ন সময়ে নিজেদের দাবি নিয়ে আন্দোলনও করেছে। যেমন রানিং স্টাফদের বেতন-ভাতা ও অবসরকালীন সুবিধা নিয়ে আন্দোলনের খবর প্রকাশিত হয়েছে।

তবে ওয়েম্যানদের মতো মাঠপর্যায়ের শ্রমিকদের নিজস্ব সমস্যাগুলো কতটা গুরুত্ব পাচ্ছে—এ নিয়ে প্রশ্ন ভুক্তভোগী কর্মচারীদের।  

শ্রমিক রাজনীতির মূল লক্ষ্য যদি হয় শ্রমিকের অধিকার, তাহলে সবচেয়ে নিচের সারির শ্রমিকের কণ্ঠও সেখানে সমান গুরুত্ব পাওয়ার কথা কিন্তু বাস্তবে তা উল্টো।

অবসরপ্রাপ্ত সহকারী নির্বাহী প্রকৌশলীর বক্তব্য :-

সহকারী প্রকৌশলী আবু মাসুদ (অবঃ)বলেন,ওয়েম্যানদের কথা উঠলেই আমার চাকরি জীবনের বগুড়ার দিনগুলোর কথা মনে পড়ে।সহকারী নির্বাহী প্রকৌশলী  হিসেবে দায়িত্ব পালনের সুবাদে তাদের সঙ্গে নিয়মিত দেখা হতো। কাজের প্রয়োজনে রেলপথে যেতে হয়েছে, তাদের সঙ্গে কথা হয়েছে, কাছ থেকে দেখেছি তাদের কর্মজীবন।

চাকরিজীবনের সুন্দর সময়গুলোর অনেকটাই কেটেছে বগুড়ায়। তখন হয়তো প্রতিদিনের দায়িত্বের ব্যস্ততায় তাদের জীবন নিয়ে গভীরভাবে ভাবার সুযোগ হয়নি। অবসরে এসে হঠাৎ মনে হলো—রেললাইনের পাশে ঘাম ঝরানো সেই মানুষগুলোর শ্রম ও জীবনের গল্পও তো ইতিহাসের অংশ।

তারা হয়তো বড় কোনো পদে নেই। তাদের নাম ট্রেনের টিকিটে লেখা থাকে না। কোনো যাত্রী গন্তব্যে পৌঁছে তাদের ধন্যবাদও দেন না।কিন্তু রেললাইন নিরাপদ থাকলে, ট্রেন নির্বিঘ্নে ছুটে গেলে—তার পেছনে তাদের শ্রমেরও অংশ থাকে।

নিরাপদ রেলযাত্রার নেপথ্যের মানুষ:-

একটি ট্রেন নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছালে যাত্রীরা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেন। কিন্তু সেই নিরাপত্তার নেপথ্যে যারা দিনের পর দিন কাজ করেন, তাদের জীবন কতটা নিরাপদ—সেটিও  আলোচনার বিষয় হওয়া দরকার।

তিনি আরো বলেন,ওয়েম্যানদের জন্য পর্যাপ্ত জনবল, নিরাপদ কর্মপরিবেশ, প্রয়োজনীয় সুরক্ষা সরঞ্জাম, যথাযথ বিশ্রাম, চিকিৎসা ও আবাসন সুবিধা এবং ন্যায্য শ্রম-সুবিধা নিশ্চিত করা হলে তার সুফল শুধু শ্রমিকের পরিবারই পাবে না; নিরাপদ রেল চলাচলও আরও শক্তিশালী হবে।

রেললাইনের ওপর দিয়ে প্রতিদিন হাজারো মানুষের স্বপ্ন ছুটে চলে। সেই স্বপ্নের পথ নিরাপদ রাখতে যারা রোদে পুড়ছেন, বৃষ্টিতে ভিজছেন, শীতে কাঁপছেন—তাদের শ্রম যেন অদৃশ্য না থাকে।তারা রেলের সবচেয়ে দৃশ্যমান শ্রমিক অথচ সবচেয়ে নীরব শ্রমিকদের একটি অংশ। তাদের ঘাম শুকিয়ে যাওয়ার আগেই তাদের শ্রমের মূল্যায়ন করা জরুরি বলে মনে করনে সংশ্লিষ্টরা।






ছবি