শরতের কাশফুলের দোলা, ভোরের শিশির আর শিউলির সুবাসে রাজশাহীতে বইছে শারদীয় দুর্গাপূজার আগমনী আবহ। মৃৎশিল্পীদের নিপুণ হাতের শেষ আঁচড়ে মৃন্ময়ী প্রতিমাগুলো পাচ্ছে পূর্ণাঙ্গ রূপ। মণ্ডপে মণ্ডপে চলছে প্যান্ডেল নির্মাণ, সাজসজ্জা ও আলোকসজ্জার শেষ মুহূর্তের কাজ। অন্যদিকে পূজার পোশাক, উপহার ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী কিনতে বিপণিবিতান ও মার্কেটে ব্যস্ত সময় পার করছেন ভক্তরা।
সব মিলিয়ে পদ্মাপাড়ের রাজশাহীতে এখন উৎসবের আমেজ। জাতি-ধর্ম-বর্ণের ভেদাভেদ ভুলে শারদীয় উৎসবকে ঘিরে সবার মধ্যে তৈরি হয়েছে প্রত্যাশা ও আনন্দের আবহ।
বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ রাজশাহী ও স্থানীয় সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালে রাজশাহী জেলা ও মহানগর মিলিয়ে মোট ৪৮২টি মণ্ডপে দুর্গাপূজার আয়োজন করা হয়েছে। এর মধ্যে রাজশাহী মহানগর পুলিশের (আরএমপি) আওতাধীন এলাকায় ১০৩টি মণ্ডপ রয়েছে। আর রাজশাহী সিটি করপোরেশন এলাকার পূজা আয়োজকদের হিসাবে নগরীতে এবার ৮৫টি মণ্ডপে উৎসব অনুষ্ঠিত হবে।
নগরীর কুমারপাড়া, আলুপট্টি, শেখেরচক, তালাইমারি, ভদ্রা, সাগরপাড়া, হড়গ্রামসহ বিভিন্ন এলাকার মণ্ডপে এখন শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি চলছে। কোথাও বাঁশের কাঠামোয় প্যান্ডেল তৈরির কাজ, কোথাও রঙের কাজ, আবার কোথাও চলছে আলোকসজ্জা ও তোরণ নির্মাণ। সন্ধ্যা নামলেই বিভিন্ন এলাকায় জ্বলে উঠছে রঙিন বাতি।
শেষ আঁচড়ে প্রতিমায় প্রাণের ছোঁয়া।
রাজশাহীর প্রতিমাপল্লিগুলোতেও এখন ব্যস্ততা তুঙ্গে। প্রতিমার অবয়ব নির্মাণের কাজ শেষ করে শিল্পীরা ব্যস্ত রং ও অলংকারের কাজে। দেবীর মুখাবয়ব, চোখ, পোশাক ও অলংকারে দেওয়া হচ্ছে শেষ ছোঁয়া।
মৃৎশিল্পীরা জানান, প্রতিমা তৈরির কাজ শুধু কারিগরি দক্ষতার বিষয় নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য ও শিল্পীদের আবেগ। প্রতিটি প্রতিমাকে আলাদা বৈশিষ্ট্যে ফুটিয়ে তুলতে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত কাজ করতে হচ্ছে তাঁদের।
প্রতিমা তৈরির পাশাপাশি মণ্ডপের থিম ও সাজসজ্জাতেও এসেছে বৈচিত্র্য। কোথাও ঐতিহ্যবাহী নকশা, কোথাও আধুনিক ভাবনা—সব মিলিয়ে দর্শনার্থীদের আকৃষ্ট করতে চলছে নানা আয়োজন। সাম্প্রতিক প্রস্তুতি নিয়ে স্থানীয় শিল্পী ও পূজা-সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, মণ্ডপ ও প্রতিমার কাজ এখন শেষ পর্যায়ে।
পূজার কেনাকাটায় ব্যস্ত ভক্তরা:-
দুর্গাপূজাকে সামনে রেখে রাজশাহীর বাজারেও বেড়েছে ব্যস্ততা। নগরীর সাহেববাজার, নিউমার্কেট, আরডিএ মার্কেটসহ বিভিন্ন বিপণিবিতানে নতুন পোশাক, শাড়ি, পাঞ্জাবি, শিশুদের পোশাক, প্রসাধনী ও উপহারসামগ্রী কিনতে ভিড় করছেন ক্রেতারা।
অনেক পরিবারে চলছে পূজার কেনাকাটার শেষ প্রস্তুতি। কেউ পরিবারের সদস্যদের জন্য পোশাক কিনছেন, কেউ আত্মীয়স্বজনের জন্য উপহার। আবার পূজার বিভিন্ন আনুষ্ঠানিকতার জন্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী কিনতেও বাজারে আসছেন ভক্তরা।ব্যবসায়ীদের প্রত্যাশা, পূজার দিন যত এগিয়ে আসবে, কেনাকাটা আরও বাড়বে।
নিরাপত্তায় বিশেষ নজর পুলিশের:-
দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে আগাম প্রস্তুতি নিয়েছে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। আরএমপি জানিয়েছে, প্রতিমা তৈরির স্থান থেকে শুরু করে পূজা চলাকালীন এবং বিসর্জন পর্যন্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। ঝুঁকি বিবেচনায় মণ্ডপগুলোকে বিভিন্ন শ্রেণিতে ভাগ করে নিরাপত্তা পরিকল্পনা সাজানো হয়েছে।
আরএমপির পক্ষ থেকে মণ্ডপে পুলিশ ও আনসার সদস্যদের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে সিসি ক্যামেরা, স্বেচ্ছাসেবক ও পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব বা অপপ্রচার ঠেকাতেও নজরদারি রাখা হচ্ছে।
আরএমপির উপ-পুলিশ কমিশনার (সিটিটিসি ও মিডিয়া) গাজিউর রহমান জানিয়েছেন, নগরীর ৮৫টি পূজামণ্ডপে বিশেষ নজরদারি থাকবে। সাদা পোশাকে পুলিশ সদস্যরা মাঠপর্যায়ে তথ্য সংগ্রহ করবেন। পূজা উদযাপন কমিটিগুলোকে সিসি ক্যামেরা স্থাপন এবং পর্যাপ্ত স্বেচ্ছাসেবক রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, দর্শনার্থীদের নির্বিঘ্ন চলাচল, মণ্ডপের নিরাপত্তা, যানবাহন নিয়ন্ত্রণ এবং প্রতিমা বিসর্জনের সময় বিশেষ ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে।
পূজা কমিটির প্রত্যাশা সম্প্রীতির উৎসব:-
পূজা উদযাপন কমিটির নেতারা বলছেন, নিরাপদ ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে উৎসব শেষ করাই তাঁদের প্রধান প্রত্যাশা। মণ্ডপের নিরাপত্তার পাশাপাশি প্রতিমা তৈরির স্থান, পূজা চলাকালীন দর্শনার্থীদের চলাচল এবং বিসর্জনের সময় পর্যাপ্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়েছে।
রাজশাহী মহানগর হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান কল্যাণ ফ্রন্টের সভাপতি অচিন্ত্য কুমার বিশ্বাস সান্টু বলেন, এবার নগরীতে ৮৫টি মণ্ডপে পূজা অনুষ্ঠিত হবে। শান্তিপূর্ণ পরিবেশে উৎসব আয়োজনের জন্য প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোতে মণ্ডপের তালিকা দেওয়া হয়েছে। প্রতিমা তৈরির স্থান ও মণ্ডপগুলোতে সার্বক্ষণিক নিরাপত্তার বিষয়েও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে আলোচনা হয়েছে।
পূজা-সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, দুর্গাপূজা শুধু একটি ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি রাজশাহীর সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনেরও বড় একটি উৎসব। তাই সব সম্প্রদায়ের মানুষের অংশগ্রহণে সম্প্রীতির পরিবেশে উৎসবটি উদযাপন করতে চান তাঁরা।
পঞ্জিকার হিসাবে পূজার আনুষ্ঠানিকতা:-
২০২৬ সালের পঞ্জিকা অনুযায়ী, ১০ অক্টোবর মহালয়া দিয়ে শুরু হবে দেবীপক্ষের আবহ। এরপর ১৬ অক্টোবর মহাষষ্ঠী, ১৮ অক্টোবর মহাসপ্তমী, ১৯ অক্টোবর মহাষ্টমী, ২০ অক্টোবর মহানবমী এবং ২১ অক্টোবর বিজয়া দশমী পালিত হবে। দশমীর দিন প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হবে শারদীয় দুর্গোৎসব।
তিথির বিস্তারের কারণে এবারের পূজার সময়সূচিতে কিছুটা ব্যতিক্রম রয়েছে। এ নিয়ে মণ্ডপগুলোতে ইতোমধ্যে প্রস্তুতিও নেওয়া হচ্ছে।
উৎসবের অপেক্ষায় রাজশাহী:-
প্রতিমায় শেষ আঁচড়, মণ্ডপে প্যান্ডেল নির্মাণ, আলোকসজ্জা, বাজারে কেনাকাটা আর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রস্তুতি—সব মিলিয়ে দুর্গোৎসবকে ঘিরে রাজশাহীতে এখন উৎসবের পূর্ণ আবহ।
কয়েক দিনের মধ্যেই ঢাকের বাদ্য, শঙ্খধ্বনি, ধূপের সুবাস ও অঞ্জলির ভক্তিতে মুখর হয়ে উঠবে নগরী ও জেলার ৪৮২ মণ্ডপ। দেবীর আগমনের অপেক্ষায় এখন রাজশাহীর মানুষ। প্রত্যাশা—নিরাপদ, শান্তিপূর্ণ ও সম্প্রীতির আবহে উদযাপিত হবে এবারের শারদীয় দুর্গোৎসব।