রাজশাহী–ঢাকা মহাসড়কে একসময় গুরুত্বপূর্ণ মোড় ও বাসস্ট্যান্ডগুলোতে যাত্রীদের জন্য ছিল একাধিক ছাউনি। কিন্তু সড়ক প্রশস্তকরণ ও চার লেনে উন্নীতকরণের সময় অনেক পুরোনো ছাউনি ভেঙে ফেলা হলেও বেশির ভাগ স্থানে তা পুনর্নির্মাণ করা হয়নি। কোথাও আবার ছাউনির জায়গা দখল হয়ে গেছে। ফলে দীর্ঘ এই মহাসড়কে রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে খোলা আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে বাসের অপেক্ষা করতে হচ্ছে যাত্রীদের।
সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের তথ্য এবং স্থানীয়দের নিকট থেকে পাওয়া তথ্যানুযায়ী,রাজশাহী শহর থেকে যমুনা সেতুর পশ্চিম সংযোগ পর্যন্ত প্রায় ১৫০ কিলোমিটার মহাসড়কে একসময় ৫০ থেকে ৬০টি ছোট-বড় যাত্রী ছাউনি বা বাসস্টপেজ শেড ছিল। বর্তমানে সচল বা চিহ্নিত করার মতো ছাউনি রয়েছে হাতেগোনা কয়েকটি।
সড়ক প্রশস্তকরণের কারণে পুরোনোগুলো সরিয়ে নেওয়ার পর অনেক জায়গায় নতুন করে অবকাঠামো তৈরি হয়নি।
রাজশাহী থেকে পুঠিয়া পর্যন্ত তালাইমারী, কাটাখালী বাজার, বেলপুকুর, বিড়ালদহ ও পুঠিয়া বাসস্ট্যান্ড এলাকায় বিভিন্ন সময়ে যাত্রী ছাউনি ছিল বা রয়েছে।
নাটোরের ঝলমলিয়া, বড়াইগ্রাম ও বনপাড়া এবং বনপাড়া–হাটিকুমরুল অংশের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়েও একই ধরনের সংকটের কথা উঠে এসেছে।
বরাদ্দ আছে, বাস্তবায়ন নাই:-
যাত্রী ছাউনি নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করেই বিভিন্ন সময়ে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো প্রকল্প নিয়েছে। এর সর্বশেষ উদাহরণ পুঠিয়া বাসস্ট্যান্ড।
রাজশাহী জেলা পরিষদের ২০২৪–২৫ অর্থবছরের একটি প্রকল্পে পুঠিয়া বাসস্ট্যান্ডে যাত্রী ছাউনি নির্মাণের কথা রয়েছে। প্রকল্পটির দরপত্রও প্রকাশিত হয়েছিল।
অন্যদিকে, চলতি ২০২৬ সালে কেশরহাট পৌরসভার কেশরহাট বাজারে পুলিশ বক্সসহ যাত্রী ছাউনি নির্মাণের জন্যও দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। প্রয়োজনীয়তা ও বরাদ্দের উদ্যোগ থাকলেও মহাসড়কের গুরুত্বপূর্ণ অনেক স্থানে যাত্রী ছাউনির ঘাটতি এখনো কাটেনি।
ছাউনির জায়গায় দোকান:-
পুঠিয়া উপজেলা পরিষদের প্রধান ফটকের কাছেই রাজশাহী–ঢাকা বাস কাউন্টারের পাশে থাকা একটি পুরোনো যাত্রী ছাউনির জায়গা দখল করে দোকানঘর নির্মাণের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় বাসিন্দা ও যাত্রীরা সরকারি জায়গাটি উদ্ধারের পাশাপাশি সেখানে নতুন করে যাত্রী ছাউনি নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন।
এ ধরনের দখল ও অব্যবস্থাপনার কারণে যাত্রীদের জন্য নির্মিত অবকাঠামো ধীরে ধীরে তার মূল উদ্দেশ্য হারাচ্ছে। কোথাও ছাউনি থাকলেও তা দোকান, টংঘর কিংবা পার্কিংয়ের কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে বলে স্থানীয় পর্যায়ের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
রোদ-বৃষ্টিতে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তি নারী-শিশু ও প্রবীণদের:-
রাজশাহী অঞ্চল দেশের উষ্ণতম এলাকাগুলোর একটি। গ্রীষ্মে তীব্র তাপদাহ এবং বর্ষায় আকস্মিক বৃষ্টির মধ্যে মহাসড়কের পাশে বাসের জন্য অপেক্ষা করা যাত্রীদের জন্য একটি নিরাপদ অপেক্ষাস্থল গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু ছাউনি না থাকায় অনেককে দোকানের সামনে, গাছের নিচে কিংবা সরাসরি সড়কের পাশে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়।
বিশেষ করে নারী, শিশু, প্রবীণ ও অসুস্থ যাত্রীদের ভোগান্তি বেশি। দূরপাল্লার বাসের অপেক্ষায় দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থাকতে গিয়ে তাদের অনেক সময় মহাসড়কের মূল সড়কের কাছাকাছি অবস্থান করতে হয়। এতে যাত্রী নিরাপত্তার পাশাপাশি দুর্ঘটনার ঝুঁকিও তৈরি হচ্ছে।
ছাউনি না থাকায় মহাসড়কে বাস থামছে যেখানে-সেখানে:-
নির্ধারিত বাসস্টপেজ ও যাত্রী ছাউনি না থাকায় অনেক ক্ষেত্রে চালকরা যাত্রী ওঠানামার জন্য সুবিধাজনক জায়গায় বাস থামান। এতে মহাসড়কে যানবাহনের গতি কমে, পেছনে থাকা গাড়ির সঙ্গে সংঘর্ষের আশঙ্কা তৈরি এবং যানজটও বাড়ছে।
সওজের নীতিগত অবস্থান অনুযায়ী, দ্রুতগতির মহাসড়কে যত্রতত্র যাত্রী ছাউনি না করে নির্ধারিত বাসস্টপেজে যাত্রী ওঠানামার ব্যবস্থা করার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। ফলে নতুন ছাউনি নির্মাণের পাশাপাশি কোথায় বাস থামবে—সেটিও পরিকল্পিতভাবে নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
সওজের বক্তব্য:-
রাজশাহী সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী সানজিদা আফরীন ঝিনুক বলেছেন, সড়ক প্রশস্ত করার কারণে অনেক পুরোনো যাত্রী ছাউনি ভেঙে ফেলতে হয়েছে। মহাসড়কে যাত্রী ছাউনি পুনর্নির্মাণের বিষয়টি তদারকির মধ্যে রয়েছে। রাজশাহী নগরীর অভ্যন্তরের যাত্রী ছাউনিগুলো রাজশাহী সিটি করপোরেশন দেখভাল করে বলেও জানান তিনি।
অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক সবুর আলী বলেন, দূরপাল্লার যাত্রীদের জন্য যাত্রী ছাউনি সাময়িক নিরাপদ আশ্রয়স্থল। অনেক ছাউনি দখলে থাকার তথ্য গণমাধ্যমে এসেছে। সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে এগুলো পথচারীদের জন্য উন্মুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে তিনি জানান।
প্রয়োজন সমন্বিত পরিকল্পনা:-
যাত্রী ছাউনি নির্মাণের ক্ষেত্রে শুধু অবকাঠামো তৈরি করলেই হবে না, সেটির অবস্থান, বাস থামার ব্যবস্থা, আলো, বসার জায়গা, নিরাপত্তা, পানি ও শৌচাগারের বিষয়ও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। পাশাপাশি নির্মাণের পর নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ও দখলমুক্ত রাখার ব্যবস্থাও থাকতে হবে।
সওজ, সিটি করপোরেশন, জেলা পরিষদ, উপজেলা প্রশাসন, বিআরটিএ ও হাইওয়ে পুলিশের সমন্বয়ে গুরুত্বপূর্ণ মোড় ও বাসস্ট্যান্ডগুলো চিহ্নিত করে একটি নির্দিষ্ট বাসস্টপেজভিত্তিক পরিকল্পনা নেওয়া যেতে পারে। এতে একদিকে যাত্রীদের নিরাপদ অপেক্ষার সুযোগ তৈরি হবে, অন্যদিকে মহাসড়কে যত্রতত্র বাস থামানোও কমানো সম্ভব হবে।
রাজশাহী–ঢাকা মহাসড়ক উত্তরাঞ্চলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগপথ। এই সড়কে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে উন্নয়নকাজ হলেও যাত্রীদের মৌলিক সুবিধা হিসেবে প্রয়োজনীয় যাত্রী ছাউনিগুলো যদি পরিকল্পনার বাইরে থেকে যায়, তাহলে অবকাঠামো উন্নয়নের সুফলও অসম্পূর্ণ থেকে যায়। তাই যেখানে পুরোনো ছাউনি ভেঙে ফেলা হয়েছে, সেখানে বাস্তব প্রয়োজন ও নির্ধারিত বাসস্টপেজ অনুযায়ী নতুন ছাউনি নির্মাণ এবং দখল হয়ে যাওয়া জায়গা উদ্ধারের দাবি এখন জোরালো হচ্ছে।