Template: 3
Tpl 1 Tpl 2 Tpl 3
অনলাইন ডেস্ক | ০৩ অক্টোবর ২০২৬
bijoybangla.news
logo
বিজয় বাংলা নিউজ
জাতীয় দৈনিক

একটি ভুল সিগন্যালেই ভয়াবহ বিপর্যয়: রেল নিরাপত্তার নেপথ্যে যে ‘নিয়ন্ত্রণ কক্ষ’

আবুল কালাম আজাদ A terrible disaster due to a wrong signal

​রেলস্টেশনের ব্যস্ত প্ল্যাটফর্মে যাত্রীদের যখন ছোটাছুটি। কোথাও ট্রেন ভেড়ার প্রতীক্ষা, কোথাও বা ছাড়ার তোড়জোড়। বাইরে থেকে দেখে বোঝার উপায় নেই—এই আপাতচাঞ্চল্যের আড়ালে স্টেশনের এক কোণে একটি নির্দিষ্ট কক্ষে চলছে শত শত মানুষের জীবন-মৃত্যুর সঙ্গে যুক্ত এক সূক্ষ্ম হিসাব-নিকাশ। 

কোন ট্রেন কোন লাইনে ঢুকবে, কখন ছাড়বে বা কোন রুটটি পুরোপুরি সংঘাতমুক্ত—এসব সিদ্ধান্ত সমন্বিতভাবেই নির্ধারিত হয় এই নিয়ন্ত্রণ কক্ষে।


​রেল বিশেষজ্ঞদের মতে, সিগন্যাল, পয়েন্ট, রুট ও ইন্টারলকিং ব্যবস্থার সমন্বয়ে পরিচালিত এই প্রক্রিয়ায় সামান্যতম ভুলের খেসারত হতে পারে ভয়াবহ দুর্ঘটনা। একটি ট্রেনকে ভুল লাইনে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া বা একই লাইনে দুটি ট্রেনের মুখোমুখি অবস্থান তৈরি হওয়া পুরো ব্যবস্থার নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলে। বাংলাদেশ রেলওয়ের সরকারি নথিতেও সিগন্যালিং ও ইন্টারলকিং ব্যবস্থাকে নিরাপদ ট্রেন পরিচালনার প্রধান শর্ত হিসেবে বলা করা হয়েছে।



​অগোচরে থাকা নিরাপত্তা কক্ষ:-

স্টেশনের সিগন্যালিং বা অপারেশন সংক্রান্ত কক্ষটি সাধারণ যাত্রীদের দৃষ্টির অগোচরেই থেকে যায়। অথচ সেখানে বসেই সংশ্লিষ্ট কর্মীরা প্রতিটি ট্রেনের গতিবিধি, ট্র্যাক বা লাইনের অবস্থান, পয়েন্ট এবং সিগন্যালের অবস্থা সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করেন। কোনো ট্রেন স্টেশনে প্রবেশের ঠিক আগে নির্ধারিত রুটটি সম্পূর্ণ নিরাপদ কি না, কিংবা অন্য কোনো ট্রেনের সংঘাতের ঝুঁকি আছে কি না—তা নিশ্চিত করাই এদের মূল কাজ।


​বর্তমানে দেশের রেলব্যবস্থায় ব্যবহৃত প্রযুক্তি স্টেশনভেদে ভিন্ন। বাংলাদেশ রেলওয়ের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে কম্পিউটারভিত্তিক ইন্টারলকিং (CBI), সেন্ট্রালাইজড ট্রাফিক কন্ট্রোল (CTC), রিলে ইন্টারলকিং, মেকানিক্যাল ইন্টারলকিং এবং নন-ইন্টারলকড সিগন্যালিংসহ কয়েক ধরনের প্রযুক্তি চালু রয়েছে। প্রযুক্তির এই বৈচিত্র্যের কারণে পরিচালনার ক্ষেত্রেও বাড়তি সতর্কতার প্রয়োজন হয়।


​সিগন্যাল শুধুই 'লাল-সবুজ' বাতি নয়:-

সাধারণ চোখে সিগন্যাল বলতে শুধুই লাল, হলুদ বা সবুজ বাতির সংকেত মনে হলেও বাস্তবে এটি একটি সমন্বিত কারিগরি নিরাপত্তাবেষ্টনী। সিগন্যালের সাথে সরাসরি যুক্ত থাকে রুট নির্ধারণ, পয়েন্ট পরিচালনা এবং ইন্টারলকিং ব্যবস্থা।

​ইন্টারলকিংয়ের প্রধান কাজ হলো সাংঘর্ষিক কোনো রুট বা ভুল কমান্ডকে যান্ত্রিকভাবে কার্যকর হতে না দেওয়া। ফলে সিগন্যালিং ব্যবস্থার কোনো ত্রুটি দেখা দিলে তা তাৎক্ষণিকভাবে শনাক্ত ও সংশোধন করা জরুরি হয়ে পড়ে। রেলের নথিতে স্পষ্ট বলা আছে, সিগন্যালিং ব্যবস্থার মূল উদ্দেশ্য কেবল নিরাপত্তা নিশ্চিত করা নয়; বরং ট্রেনের ঘনত্ব ও গতি বাড়াতে সহায়তা করাও এর অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।


​স্টেশন মাস্টারের বহুমাত্রিক দায়িত্ব:-

যাত্রীদের কাছে স্টেশন মাস্টারের দৃশ্যমান কাজ ট্রেন ছাড়ার সবুজ পতাকা দেখানো বা সংকেত দেওয়া হলেও, মূল অপারেশনাল ব্যবস্থাপনায় তার ভূমিকা অত্যন্ত ব্যাপক। রেল পরিচালনার নিয়মকানুন বাস্তবায়ন, বিভিন্ন বিভাগের কর্মীদের কাজের সমন্বয় এবং লাইনের সুরক্ষার মতো জটিল কাজ তাকে সামলাতে হয়।


​পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের চিফ অপারেটিং সুপারিনটেনডেন্টের (COPS) কার্যালয় সূত্র জানায়, ট্রেন পরিচালনায় নির্ধারিত বিধিমালা বাস্তবায়ন, স্টেশনভিত্তিক কার্যপ্রণালি (Station Working Rules) প্রস্তুত, সময়সূচি বজায় রাখা এবং যাত্রী ও মালবাহী ট্রেন চলাচলে সার্বক্ষণিক নজরদারি করাই তাদের মূল দায়িত্ব। 

ফলে একটি স্টেশনে ট্রেন প্রবেশ বা প্রস্থানের সংকেত দেওয়া কেবল একটি সুইচ চাপার বিষয় নয়; এর পেছনে কাজ করে লিখিত নিয়মাবলী, সময়সূচি এবং সংশ্লিষ্ট জনবলের পারস্পরিক সমন্বয়।


​পশ্চিমাঞ্চলে আধুনিকীকরণের চলমান উদ্যোগ

পশ্চিমাঞ্চল রেলে সিগন্যালিং ব্যবস্থা ঢেলে সাজানোর প্রক্রিয়া চলছে। বাংলাদেশ রেলওয়ের হালনাগাদ বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (ADP) তথ্য অনুযায়ী, ‘ঈশ্বরদী– পার্বতীপুর সেকশনের স্টেশনগুলোর সিগন্যালিং ও ইন্টারলকিং ব্যবস্থা প্রতিস্থাপন ও আধুনিকীকরণ’ শীর্ষক একটি প্রকল্প বর্তমানে বাস্তবায়নাধীন। ২০২৩ সালের জুলাই থেকে শুরু হওয়া এই প্রকল্পের কাজ ২০২৭ সালের জুনে শেষ হওয়ার কথা রয়েছে।


​পশ্চিমাঞ্চল রেলের সংকেত ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের প্রধান প্রকৌশলীর কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের পাশাপাশি স্টেশনগুলোর ইয়ার্ড লেআউট, রুল ডায়াগ্রাম প্রস্তুত এবং আধুনিক প্রযুক্তির সংযোগ ঘটানো তাদের দৈনন্দিন কাজের অংশ।


 বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কেবল চালকের সতর্কতাই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন উন্নত সিগন্যালিং অবকাঠামো, নির্ভুল ইন্টারলকিং এবং দক্ষ জনবল।


​প্রযুক্তি ও রক্ষণাবেক্ষণের সমীকরণ:-

কম্পিউটারভিত্তিক প্রযুক্তির প্রবর্তন হলেও সরঞ্জামের নিয়মিত পরিদর্শন ও রক্ষণাবেক্ষণ ছাড়া শতভাগ নিরাপত্তা সম্ভব নয়। ভর ও গতির কারণে তীব্র গতিতে থাকা একটি ট্রেনের ক্ষেত্রে হঠাৎ ব্রেক চেপে দুর্ঘটনা এড়ানো প্রায় অসম্ভব। তাই দুর্ঘটনা ঘটার পর ব্যবস্থা নেওয়ার চেয়ে সম্ভাব্য সংঘাত প্রতিরোধ করাই সিগন্যালিং প্রযুক্তির প্রধান দর্শন।

​রেলপথ পরিদর্শন অধিদপ্তরের (GIR) তথ্যমতে, নিরাপদ সেবা নিশ্চিত করতে ট্র্যাক, পয়েন্ট, সিগন্যাল, লোকোমোটিভ এবং স্টেশন ব্যবস্থা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ ও আকস্মিক পরিদর্শন করা হয়। যেকোনো বড় ধরনের দুর্ঘটনার ক্ষেত্রেও নিরপেক্ষ তদন্তের দায়িত্বে থাকে এই বিভাগ।


​ভুলের সুযোগ কমানোই মূল লক্ষ্য:-

রেলের সিগন্যালিং নিয়ন্ত্রণ কক্ষটি মূলত শত শত যাত্রীর সুরক্ষাকবচ। একটি ভুল পয়েন্ট সেটিং বা ভুল সময়ে দেওয়া ছাড়পত্র নিমেষেই বড় বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। বিপরীতে, সঠিক সিগন্যালিং ও ইন্টারলকিং ব্যবস্থার মাধ্যমে একই ট্র্যাকে তুলনামূলক বেশি সংখ্যক ট্রেনও নিরাপদে চালনা করা সম্ভব।


​প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে যাত্রীরা যখন সিগন্যালের আলো বদলাতে দেখেন, তার পেছনে সচল থাকে একটি অত্যন্ত জটিল ও সুনির্দিষ্ট নিয়মে বাঁধা নিরাপত্তা কাঠামো। হাজারো মানুষের যাতায়াত নিরাপদ রাখতে এই কাঠামোর প্রতিটি ধাপে প্রয়োজন সর্বোচ্চ নির্ভরতা, প্রযুক্তিগত দক্ষতা এবং কর্মীদের সার্বক্ষণিক সতর্কতা।






© বিজয় বাংলা নিউজ
bijoybangla.news