মানুষের জীবনে প্রাপ্তি ও প্রত্যাশার হিসাব যেন কখনো শেষ হয় না। যা আছে, তার চেয়ে যা নেই অনেক সময় সেটিই আমাদের বেশি ভাবায়। জীবিকার পেছনে ছুটতে গিয়ে মানুষ ভুলে যায় জীবনের প্রকৃত উদ্দেশ্য। সম্পদ, সাফল্য ও ভোগের আকাঙ্ক্ষা কখনো এমন পর্যায়ে পৌঁছে যায় যে, মহান আল্লাহর অগণিত নেয়ামতের কথাই মানুষ ভুলে বসে। মাত্র ১১ আয়াতের সুরা আদিয়াত মানুষের এই দুর্বলতাগুলো অত্যন্ত শক্তিশালী ভাষায় তুলে ধরেছে।
সুরাটি শুরু হয়েছে দ্রুতগতিতে ছুটে চলা ঘোড়ার দৃশ্য দিয়ে। এরপর আল্লাহ মানুষের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্বভাবের কথা বলেছেন—‘নিশ্চয়ই মানুষ তার রবের প্রতি অকৃতজ্ঞ।’ (সুরা আদিয়াত, আয়াত ৬) তাফসিরকাররা ‘কানুদ’ শব্দের ব্যাখ্যায় এমন মানুষকে বোঝান, যে বিপদ-আপদ মনে রাখে, কিন্তু আল্লাহর দেওয়া অসংখ্য নেয়ামত ভুলে যায়।
নেয়ামতের প্রতি কৃতজ্ঞ হতে হবে
সুস্থতা, পরিবার, নিরাপদ জীবন, রিজিক, জ্ঞান ও সময়—এসবই আল্লাহর নেয়ামত। কিন্তু মানুষ অনেক সময় একটি অপূর্ণতার কারণে অসংখ্য প্রাপ্তিকে উপেক্ষা করে। সুরা আদিয়াত আমাদের শেখায়, শুধু মুখে ‘আলহামদুলিল্লাহ’ বলাই যথেষ্ট নয়; বরং আচরণ ও জীবনযাপনের মাধ্যমেও আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে হবে।
কৃতজ্ঞতার অন্যতম প্রকাশ হলো নেয়ামতকে সঠিক কাজে ব্যবহার করা। অর্থ পেয়েছি—তাই অন্যায় পথে ব্যয় করব না; জ্ঞান পেয়েছি—তাই মানুষের উপকারে কাজে লাগাব; ক্ষমতা পেয়েছি—তাই দুর্বলকে দমন করব না।
সম্পদের প্রতি অতিরিক্ত আসক্তি বিপজ্জনক
সুরাটির অষ্টম আয়াতে বলা হয়েছে, মানুষ সম্পদের ভালোবাসায় অত্যন্ত প্রবল। ইসলাম সম্পদ অর্জনকে নিষিদ্ধ করেনি। বরং হালাল উপায়ে উপার্জন ও প্রয়োজনীয় সম্পদ সংরক্ষণ বৈধ। কিন্তু সম্পদের প্রতি এমন আসক্তি, যা মানুষকে আল্লাহর বিধান, দায়িত্ব ও পরকালের কথা ভুলিয়ে দেয়—সেটিই বিপজ্জনক।
আজকের জীবনে এই শিক্ষা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। বেশি আয়, বড় বাড়ি, দামি গাড়ি কিংবা সামাজিক মর্যাদা অর্জনের প্রতিযোগিতা যেন মানুষের বিবেক ও নৈতিকতাকে গ্রাস না করে। সম্পদ মানুষের হাতে থাকবে, কিন্তু মানুষের হৃদয়ের নিয়ন্ত্রক হয়ে যাবে না।
গোপন কাজও একদিন প্রকাশ পাবে
সুরার শেষ আয়াতগুলো মানুষকে আখিরাতের বাস্তবতার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। কবর থেকে মানুষকে পুনরুত্থিত করা হবে এবং অন্তরের গোপন বিষয়গুলো প্রকাশ করা হবে। সেদিন আল্লাহ মানুষের সব কর্মকাণ্ড সম্পর্কে পূর্ণ অবগত থাকবেন।
এই শিক্ষা মানুষকে আত্মসংযমী হতে সাহায্য করে। মানুষের চোখ এড়িয়ে কোনো কাজ করা গেলেও আল্লাহর কাছ থেকে তা গোপন করা সম্ভব নয়। তাই প্রকাশ্য জীবনের পাশাপাশি অন্তরকেও পরিশুদ্ধ করা জরুরি।