আজকাল মোবাইল ফোন ছাড়া যেন কারও চলেই না। চলবেই বা কেন? গোটা বিশ্বই তো এখন এই ছোট্ট যন্ত্রটির মধ্যে। ফোনের পর্দায় একসঙ্গে বিনোদন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, কাজ কিংবা প্রিয়জনের সঙ্গে যোগাযোগ, সবই পাওয়া যাচ্ছে।
কিন্তু আপনি যখন কারও সঙ্গে আছেন, কোথাও বেড়াতে গেছেন কিংবা বসে আড্ডা দিচ্ছেন, তখন পাশের মানুষটি-সে বন্ধু হোক, কাছের কেউ কিংবা আপনার সঙ্গী যদি সারাক্ষণ ফোন নিয়ে ব্যস্ত থাকেন, কেমন লাগে তখন? কখনও ভেবে দেখেছেন?
একসময় ফোন এত সহজলভ্য ছিল না। প্রিয়জনের দুটো কথা শোনার জন্য মানুষ ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হতো। একটি ফোনকলের জন্য অপেক্ষার সেই সময়টুকুতেও ছিল আলাদা এক ধরনের আনন্দ। সময় বদলেছে। এখন ফোন সব সময় হাতের নাগালে। তাই অপেক্ষার দিনও অনেকটাই ফুরিয়েছে।
তবে ফোন সহজলভ্য হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তৈরি হয়েছে নতুন এক দূরত্ব। একই ঘরে থেকেও মানুষ যেন আলাদা আলাদা জগতে বসবাস করছে।
ধরা যাক, স্বামী অফিস থেকে বাসায় ফিরেছেন। কিন্তু স্ত্রী ফোনে ব্যস্ত, সন্তানও মোবাইল নিয়ে বুঁদ। কিছুক্ষণ পর স্বামীও হাতে তুলে নিলেন ফোন। একই ঘরে থেকেও সবাই ব্যস্ত নিজেদের নিজস্ব জগতে। এমন দৃশ্য এখন খুবই পরিচিত এখনকার সময়ে।
দু’জন পাশাপাশি বসে আছেন। একজন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে স্ক্রল করছেন, অন্যজন কারও সঙ্গে চ্যাট করছেন। মাঝখানে কথাবার্তা নেই। অথচ দু’জনেই হয়তো মনে করছেন, তারা তো পাশাপাশি আছেনই।
স্মার্টফোন মানুষের জীবনকে সহজ করেছে, দূরের মানুষকে কাছে এনেছে। কিন্তু সেই ফোনই কখনও কখনও সবচেয়ে কাছের মানুষটির সঙ্গে দূরত্ব আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
কথা বলার সময় কমে যায়
বর্তমানে অনেক স্বামী-স্ত্রীই চাকরি করেন। কর্মস্থলে থাকলে প্রয়োজন ছাড়া কথা বলার সুযোগ হয় না। তাই দিনের শেষে বাসায় ফিরে একসঙ্গে কিছুটা সময় কাটানো, নিজেদের কথা বলা বা সারাদিনের অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেওয়া সম্পর্কের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বাসায় ফিরেও যদি দুজনই ফোন নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েন, তাহলে কথা বলার সময়টা আর থাকে কোথায়?
বাইরের মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়তে থাকে, অথচ সবচেয়ে কাছের মানুষটির সঙ্গে কথা বলার সময় কমে যায়। অথচ প্রিয়জনের সঙ্গে মানসম্মত সময় কাটানো সম্পর্ককে আরও গভীর ও সুন্দর করে।
সামনের মানুষটিকে উপেক্ষা করা
পাশাপাশি দুজন বসে আছেন। একজন নিজের কথা বলে যাচ্ছেন, আর অন্যজনের চোখ আটকে আছে ফোনের পর্দায়। এতে যিনি কথা বলছেন, তার মনে হতে পারে, তার কথাকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না। অনেক সময় ফোনে ব্যস্ত থেকেও বলা হয়, ‘বলতে থাকো, আমি তো তোমার কথা শুনছি।’ কিন্তু শুধু শোনা আর মনোযোগ দিয়ে শোনা এক বিষয় নয়। প্রিয় মানুষটির দিকে তাকিয়ে কথা বলা, তার অনুভূতিকে গুরুত্ব দেওয়া এসবও সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
কথা না থাকলেই ফোন হাতে চলে আসে
একসঙ্গে বসে আছেন, বিশেষ কিছু কথা নেই। আগে হয়তো এই নীরবতাটুকুও উপভোগ করা যেত। পাশাপাশি বসে থাকা, চুপচাপ থাকা কিংবা একসঙ্গে কিছু দেখা এসবও ছিল একধরনের সময় কাটানো। এখন সামান্য বিরতি হলেই অনেকের হাত চলে যায় ফোনের দিকে। ফলে দ ‘জন পাশাপাশি থাকলেও প্রত্যেকে ঢুকে পড়েন নিজের নিজের ডিজিটাল জগতে। সম্পর্কে সব সময় কথা বলতেই হবে, এমন নয়। কখনও নীরবতাও সম্পর্কের সৌন্দর্য। কিন্তু সেই নীরবতার জায়গা যদি ফোন দখল করে নেয়, তাহলে ধীরে ধীরে মানসিক দূরত্ব তৈরি হতে পারে।
তর্ক-বাকবিতণ্ডা বাড়তে পারে
‘তুমি সারাক্ষণ ফোন নিয়ে পড়ে থাকো। ফোনটাই কি তোমার কাছে সব?’ দু’জন সঙ্গীর মধ্যে এমন অভিযোগ এখন প্রায়ই শোনা যায়। ফোন ব্যবহারের সময় নিয়ে শুরু হওয়া ছোটখাটো বিরোধ কখনও কখনও বড় তর্কেও রূপ নেয়। একজন মনে করেন, অন্যজন তাকে সময় দিচ্ছেন না। অন্যজন আবার মনে করেন, তার ফোন ব্যবহারে অযথা বাধা দেওয়া হচ্ছে। এভাবে ফোন নিজে সমস্যা না হলেও এর অতিরিক্ত ব্যবহার সম্পর্কে অস্বস্তি ও বিরোধের কারণ হয়ে উঠতে পারে।
অপরিচিতদের প্রতি বেশি আগ্রহ
অপরিচিত মানুষের জীবন, ছবি, গল্প কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নানা বিষয় নিয়ে মানুষের কৌতূহল থাকাটা স্বাভাবিক। কিন্তু সেই কৌতূহলের কারণে পাশে থাকা মানুষটির প্রতি মনোযোগ কমে গেলে সমস্যা তৈরি হয়। দূরের মানুষকে জানার আগ্রহের পাশাপাশি কাছের মানুষটিকে জানার, তার কথা শোনার এবং তার অনুভূতিকে বোঝার চেষ্টাও জরুরি। কারণ একটি সুস্থ সম্পর্ক শুধু একই জায়গায় থাকার নাম নয়। একে অপরের প্রতি মনোযোগী থাকাও এর গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
ফোন তো পুরো বাদ দেওয়া সম্ভব নয়, প্রয়োজনও নেই। তবে কাছের মানুষটির সঙ্গে সময় কাটানোর সময় ফোনকে একটু দূরে রাখাই ভালো। একসঙ্গে খাওয়ার সময়, গল্প করার সময় কিংবা দিনের শেষে কিছুটা সময় শুধু নিজেদের জন্য রাখা সুস্থ সম্পর্কের জন্য জরুরি।