বিশাল আয়তনের সবুজ চত্বর, সুবিশাল অ্যাকাডেমিক ভবন আর দিন দিন বিস্তার ঘটা নতুন অনুষদ-বিভাগ—বাইরে থেকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের এই রূপ চোখ ধাঁধানো। তবে এই চকচকে অবয়বের ভেতরেই জমে উঠছে দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত সংকট।
গত এক চতুর্থাংশ শতাব্দীতে বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাডেমিক পরিধি বহুগুণ বাড়লেও আবাসন সুবিধা বাড়েনি বললেই চলে। এক পরিসংখ্যানে জানা গেছে, গত ২৫ বছরে ক্যাম্পাসে নতুন ২৩টি বিভাগ ও ৭টি অনুষদ যুক্ত হওয়ার পাশাপাশি বেড়েছে ৯ হাজার শিক্ষার্থী । অথচ একই সময়ে এই বিপুল সংখ্যক নতুন শিক্ষার্থীর বিপরীতে আবাসন সংস্থান হিসেবে তৈরি হয়েছে মাত্র ৩টি আবাসিক হল। ফলে বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের মাত্র ৩২ শতাংশ শিক্ষার্থী হলে থাকার সুযোগ পাচ্ছেন।বাকি ৬৮ শতাংশকেই থাকতে হচ্ছে হলের বাইরে মেসে বা ভাড়াবাড়িতে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বশেষ প্রকাশিত তথ্যকণিকা ও আর্কাইভ সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, ১৯৫৩ সালের ৬ জুলাই মাত্র ১৬১ জন শিক্ষার্থী নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল উত্তরাঞ্চলের সর্বোচ্চ এই বিদ্যাপীঠ। শুরুতে নিজস্ব কোনো ক্যাম্পাস ছিল না। রাজশাহী কলেজ, বড়কুঠিসহ শহরের বিভিন্ন স্থানে অস্থায়ীভাবে চলত ক্লাস ও দাপ্তরিক কাজ।
পরবর্তীতে ১৯৫৮ সালে নিজস্ব ক্যাম্পাস নির্মাণের কাজ শুরু হয় এবং ১৯৬৪ সালে মতিহারের ৭৫৩ একরের বর্তমান ক্যাম্পাসে পূর্ণাঙ্গ রূপে কার্যক্রম শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়টি।
প্রতিষ্ঠার পর বিগত সাত দশকে বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাডেমিক কার্যক্রম বিস্তৃত হয়ে বর্তমানে ১২টি অনুষদের অধীনে ৫৯টি বিভাগ এবং ৬টি উচ্চতর গবেষণা ইনস্টিটিউটে গিয়ে ঠেকেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্কাইভসের হিসাব অনুযায়ী, ২০০০ সালেও যেখানে শিক্ষার্থী সংখ্যা ছিল প্রায় ২১ হাজার, বর্তমানে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩০ হাজারে। বিশেষ করে গত ১৫ বছরেই বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৪টি নতুন বিভাগ ও একটি ইনস্টিটিউট চালু করা হয়েছে।
২০১৫ সালে চারুকলাকে পূর্ণাঙ্গ অনুষদে রূপান্তর করে তার অধীনে চালু করা হয় ৩টি বিভাগ। একই সময়ে জীববিজ্ঞান অনুষদের অধীনে চিকিৎসা মনোবিজ্ঞান ও মাইক্রোবায়োলজি বিভাগ এবং ফিশারিজ ও ভেটেরিনারি অ্যান্ড অ্যানিমেল সায়েন্সেস অনুষদ গড়ে ওঠে।
তবে অ্যাকাডেমিক এই মহাপরিকল্পনা ও দ্রুত সম্প্রসারণের সাথে তাল মেলাতে পারেনি আবাসন অবকাঠামো। বর্তমানে শিক্ষার্থীদের থাকার জন্য মোট ১৭টি আবাসিক হল (ছেলেদের ১১টি ও মেয়েদের ৬টি) এবং ১টি আন্তর্জাতিক ডরমিটরি রয়েছে। এর মধ্যে আন্তর্জাতিক ডরমিটরিতে কেবল বিদেশি শিক্ষার্থী এবং এমফিল ও পিএইচডি পর্যায়ের গবেষকরা অবস্থান করেন। সবকটি হল মিলিয়ে বর্তমানে মোট আসনসংখ্যা ৯ হাজার ৬৭৩টি। অর্থাৎ ৩০ হাজার শিক্ষার্থীর মধ্যে আবাসন সুবিধা পাচ্ছেন ১-তৃতীয়াংশের কিছু বেশি শিক্ষার্থী।
শিক্ষার্থী ও সংশ্লিষ্টদের মতে, বিভাগ ও আসন সংখ্যা বাড়ানোর সাথে সমন্বয় রেখে নতুন আবাসিক হল নির্মাণ না করায় প্রতি বছরই আবাসন সংকট আরও তীব্র হচ্ছে। হলের বরাদ্দ না পেয়ে হাজার হাজার শিক্ষার্থীকে বাধ্য হয়ে ক্যাম্পাসের আশপাশের মেসে অতিরিক্ত খরচ ও নানাবিধ নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে দিন কাটাতে হচ্ছে।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, অ্যাকাডেমিক পরিধি বৃদ্ধির সাথে আবাসন সংকট নিরসনে মাস্টারপ্ল্যান ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন জোরদারের উদ্যোগ আলোচনাধীন রয়েছে। তবে দ্রুত সময়ের মধ্যে নতুন আবাসিক হল নির্মাণ করা না হলে আগামী দিনগুলোতে এই সংকট আরও প্রকট রূপ নেবে বলে আশঙ্কা করছেন শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা।