Template: 2
Tpl 1 Tpl 2 Tpl 3
logo
বিজয় বাংলা নিউজ
bijoybangla.news
০৬ অক্টোবর ২০২৬
০৬:২০ অপরাহ্ন

নক্ষত্রের মৃত্যুর পর জন্ম নতুন গ্রহের, বিরল আবিষ্কার বিজ্ঞানীদের

অনলাইন ডেস্ক New planets are born after the death of a star

মৃত নক্ষত্রের ধ্বংসাবশেষ থেকে নতুন একটি গ্রহ তৈরি হয়েছে—এমন সম্ভাবনার প্রথম প্রমাণ পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা। তাদের ধারণা, পৃথিবী থেকে প্রায় ২৭০ আলোকবর্ষ দূরে থাকা একটি মৃত নক্ষত্রকে ঘিরে এই নতুন গ্রহের সৃষ্টি হয়ে থাকতে পারে।


গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে নেচার অ্যাস্ট্রোনমি সাময়িকীতে। বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, গ্রহটি সম্ভবত একটি গ্যাসীয় দৈত্য। এটি ‘এইচএস ০২০৯+০৮৩২’ নামের একটি শ্বেত বামন নক্ষত্রকে কেন্দ্র করে ঘুরছে।


বিজ্ঞানীরা হাবল মহাকাশ দূরবিনসহ বিভিন্ন যন্ত্রের সাহায্যে ওই নক্ষত্রের পর্যবেক্ষণ চালান। সেখানে তারা এমন কিছু ভারী মৌলের অস্তিত্ব খুঁজে পেয়েছেন, যা ইঙ্গিত দেয়—নক্ষত্রটি মারা যাওয়ার সময় যে পদার্থ ছড়িয়ে পড়েছিল, সেখান থেকেই নতুন গ্রহটির জন্ম হতে পারে।


সাধারণত সূর্যের মতো কোনো নক্ষত্রের জীবন শেষ হওয়ার সময় প্রথমে সেটি দ্রুত ফুলে উঠে লাল দানবে পরিণত হয়। পরে নক্ষত্রটির বাইরের স্তরগুলো মহাকাশে ছিটকে যায়। শেষ পর্যন্ত সেখানে থেকে যায় অত্যন্ত ঘন ও উত্তপ্ত একটি ছোট কেন্দ্র, যাকে বলা হয় শ্বেত বামন।


নক্ষত্রের সঙ্গে একই সময়ে তৈরি হওয়া কিছু পুরোনো গ্রহ অবশ্য এই ভয়াবহ পরিবর্তন থেকে বেঁচে যেতে পারে। এ ধরনের গ্রহকে প্রথম প্রজন্মের গ্রহ বলা হয়। এর আগে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা শ্বেত বামনকে ঘিরে এমন কয়েকটি টিকে থাকা গ্রহের সন্ধান পেয়েছেন। কিন্তু মৃত নক্ষত্রের ধ্বংসাবশেষ থেকে তৈরি দ্বিতীয় প্রজন্মের কোনো গ্রহের প্রমাণ এবারই প্রথম পাওয়া গেল বলে গবেষকদের দাবি।


গবেষণার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র এসেছে শ্বেত বামনটির পৃষ্ঠে পাওয়া অস্বাভাবিক ভারী মৌল থেকে। গবেষকরা সেখানে ‘নিওবিয়াম’ নামের একটি মৌলের অস্তিত্ব শনাক্ত করেছেন।


গবেষণার প্রধান লেখক ও ইংল্যান্ডের ওয়ারউইক বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞানের গবেষক জেমি উইলিয়ামস বলেন, শ্বেত বামনের পৃষ্ঠে এর আগে এই মৌল দেখা যায়নি। তার মতে, নক্ষত্রটির মৃত্যুর সময় তৈরি হওয়া পদার্থ থেকেই গ্রহটি গঠিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।


মৃত নক্ষত্রের ক্ষেত্রে ভারী মৌল সাধারণত দ্রুত নিচের দিকে চলে যায়। ফলে শ্বেত বামনের বাইরের অংশে প্রধানত হাইড্রোজেন ও হিলিয়ামের মতো হালকা মৌল থাকার কথা। তাই গবেষকদের ধারণা, সেখানে পাওয়া ভারী মৌল নক্ষত্রটির বাইরের কোনো উৎস থেকে এসেছে।


উইলিয়ামসের ব্যাখ্যা, শ্বেত বামনটি অত্যন্ত উত্তপ্ত এবং প্রচুর শক্তিশালী অতিবেগুনি রশ্মি ছড়াচ্ছে। এই বিকিরণের কারণে কাছাকাছি থাকা কোনো গ্রহের বায়ুমণ্ডল ক্ষয় হয়ে তার উপাদান শ্বেত বামনের পৃষ্ঠে গিয়ে জমা হতে পারে।


এ ছাড়া নাসার ট্রানজিটিং এক্সোপ্ল্যানেট সার্ভে স্যাটেলাইটের তথ্য বিশ্লেষণ করেও গুরুত্বপূর্ণ সংকেত পেয়েছেন গবেষকরা। সেখানে প্রতি ৪ দশমিক ৪ দিন পরপর নক্ষত্রটির উজ্জ্বলতায় সামান্য পরিবর্তন দেখা গেছে। গবেষকদের মতে, এটি শ্বেত বামনকে ঘিরে কোনো বিশাল গ্রহের ঘূর্ণনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।


তবে বিজ্ঞানীরা এখনই এটিকে নিশ্চিত গ্রহ হিসেবে ঘোষণা করছেন না। উইলিয়ামস স্পষ্ট করে বলেছেন, এটি আপাতত শুধু একটি গ্রহের প্রার্থী। আরও পর্যবেক্ষণের পরই এর অস্তিত্ব নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।


নতুন ধরনের গ্রহের সম্ভাবনা


মৃত নক্ষত্রকে ঘিরে দ্বিতীয় প্রজন্মের গ্রহ তৈরির ধারণা নতুন নয়। এর আগে দ্রুত ঘূর্ণনশীল মৃত নক্ষত্র বা পালসারকে ঘিরে গ্রহের সন্ধান পাওয়া গেছে। পালসার সাধারণত বিশাল নক্ষত্রের বিস্ফোরণের পর তৈরি হয়। সেই বিস্ফোরণে পুরোনো গ্রহ ধ্বংস হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকায় ওই গ্রহগুলোকে দ্বিতীয় প্রজন্মের বলে মনে করা হয়।


তবে শ্বেত বামন সুপারনোভার মাধ্যমে তৈরি হয় না। নক্ষত্রটি যখন লাল দানব থেকে শ্বেত বামনে পরিণত হয়, তখন তার চারপাশে বিপুল পরিমাণ ধ্বংসাবশেষ, গ্যাস ও ধূলিকণা ছড়িয়ে পড়ে। সেই উপাদানগুলো একত্র হয়ে নতুন গ্রহ তৈরি করতে পারে বলে বিজ্ঞানীদের ধারণা।


গবেষক ডেভিড জে. উইলসনের মতে, নক্ষত্রের বিশাল পর্যায় পার হওয়ার পরও কিছু পুরোনো গ্রহ টিকে থাকতে পারে। আবার কিছু গ্রহ সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে তাদের ধ্বংসাবশেষ ছড়িয়ে দিতে পারে। নক্ষত্র থেকে বেরিয়ে আসা গ্যাস ও ধূলিকণাও সেখানে থাকে। এসব উপাদান একত্র হয়ে নতুন গ্রহ তৈরির সম্ভাবনা রয়েছে।


তবে কীভাবে এই গ্রহ তৈরি হয়েছে, তা এখনও পরিষ্কার নয়। গবেষকদের একটি ধারণা হলো, নক্ষত্রটির সঙ্গে অন্য কোনো মহাজাগতিক বস্তুর সংঘর্ষ বা ঘনিষ্ঠ মিথস্ক্রিয়ার কারণে এই প্রক্রিয়া শুরু হয়ে থাকতে পারে।


উইলিয়ামসের মতে, ওই বস্তুটি সূর্যের ভরের প্রায় ২০ শতাংশের একটি ছোট নক্ষত্র কিংবা বাদামি বামনও হতে পারে। সেটি নক্ষত্রের লাল দানব পর্যায়ে তার ভেতরে ঢুকে গেলে গ্যাস ও ধূলিকণাকে সরাসরি বাইরে ছিটকে পড়া থেকে কিছুটা আটকে দিতে পারে। তখন সেগুলো ঘূর্ণায়মান একটি চাকতির মতো কাঠামো তৈরি করতে পারে। পরবর্তী সময়ে সেই চাকতি থেকেই নতুন গ্রহের জন্ম হতে পারে।


গবেষকরা আগামী এক বছরে হাবল মহাকাশ দূরবিন এবং নাসার চন্দ্র এক্স-রে মানমন্দিরের সাহায্যে এই নক্ষত্রব্যবস্থাটি আরও পর্যবেক্ষণ করবেন। পাশাপাশি তাঁরা জেমস ওয়েব মহাকাশ দূরবিন ব্যবহার করার জন্যও সময় চেয়েছেন। আরও শক্তিশালী এই দূরবিনের মাধ্যমে গ্রহটির অস্তিত্ব এবং বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেতে পারে।


গ্রহটির অস্তিত্ব শেষ পর্যন্ত নিশ্চিত হলে এটি হবে সম্পূর্ণ নতুন ধরনের একটি গ্রহ। একই সঙ্গে শ্বেত বামনকে ঘিরে এমন আরও দ্বিতীয় প্রজন্মের গ্রহ থাকতে পারে বলেও ধারণা জোরালো হবে।


গবেষক ডেভিড উইলসন মনে করেন, এই গবেষণার সঙ্গে আমাদের সৌরজগতের ভবিষ্যতেরও একটি সম্পর্ক রয়েছে। কারণ কোটি কোটি বছর পর সূর্যও একসময় শ্বেত বামনে পরিণত হবে। সেই অর্থে, দূরের এই নক্ষত্রব্যবস্থায় নতুন গ্রহ তৈরির সম্ভাবনা ভবিষ্যতে আমাদের সৌরজগতের কী হতে পারে, সে সম্পর্কেও বিজ্ঞানীদের নতুন ধারণা দিতে পারে।


সূত্র: সিএনএন

© বিজয় বাংলা নিউজ
bijoybangla.news