
কোরআনে হজরত আদমের (আ.) দুই পুত্র হাবিল ও কাবিলের ঘটনা খুব সংক্ষিপ্তভাবে এসেছে। কয়েকটি আয়াতেই তাদের মধ্যকার বিরোধ, কোরবানির ঘটনা এবং সেই বিরোধের ভয়াবহ পরিণতি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘(হে নবী) আপনি আদমের দুই ছেলের কাহিনি তাদেরকে যথাযথভাবে শোনান। যখন তারা উভয়ে কোরবানি করেছিল অতঃপর একজনের কোরবানি কবুল করা হল এবং অন্যজনের কবুল করা হল না। সে বলল, অবশ্যই আমি তোমাকে হত্যা করব। অন্যজন বলল, আল্লাহ তো কেবল মুত্তাকিদের পক্ষ হতে কবুল করেন। আমাকে হত্যা করার জন্য তুমি আমার দিকে হাত বাড়ালেও আমি তোমাকে হত্যা করার জন্য তোমার দিকে হাত বাড়াব না; নিশ্চয় আমি সৃষ্টিকুলের রব আল্লাহকে ভয় করি। আমি চাই তুমি আমার ও তোমার পাপ নিয়ে ফিরে যাও, ফলে তুমি আগুনের অধিবাসী হও এবং এটা জালেমদের প্রতিদান।’ (সুরা মায়েদা: ২৭-৩০)
কোরআনে তাদের দ্বন্দ্বের সূত্রপাত ও কোরবানির কারণ নিয়ে বিস্তারিত বলা হয়নি। হাদিসেও এই বিষয়ে কোনো বক্তব্য পাওয়া যায় না। তবে একাধিক সাহাবির সূত্রে তাফসিরে ইবনে কাসিরে এই ঘটনার প্রেক্ষাপট এভাবে উল্লেখ করা হয়েছে:
হজরত আদম ও হাওয়ার (আ.) ঘরে প্রতিবার জোড়া জোড়া সন্তান জন্মগ্রহণ করত, তাদের একজন হতো ছেলে, অপরজন মেয়ে। সেই সময় যেহেতু দুনিয়ায় আর কোনো মানুষ ছিল না, তাই পরিস্থিতির কারণে ভাই-বোনের মাঝেই বিয়ে হতো। তবে নিয়ম ছিল একই জোড়ায় জন্ম নেওয়া ভাই-বোন নিজেদের মধ্যে বিয়ে করতে পারবে না।
কাবিল ছিল আদম-হাওয়ার (আ.) প্রথম সন্তান। তার সঙ্গে জন্ম নেওয়া বোন ছিল অত্যন্ত সুন্দরী। তার নাম বলা হয় আকলিমা। অন্যদিকে হাবিলের সঙ্গে জন্ম নেওয়া বোন লুবুদা ছিলেন তুলনামূলক কম সুন্দরী। নিয়ম অনুযায়ী হাবিলের বিয়ে হওয়ার কথা ছিল আকলিমার সঙ্গে, আর কাবিলের লুবুদার সঙ্গে। কিন্তু কাবিল এই সিদ্ধান্ত মেনে নিতে পারল না। সে নিজের সঙ্গে জন্ম নেওয়া সুন্দরী বোনকেই বিয়ে করতে চাইল। এ নিয়ে দুই ভাইয়ের মধ্যে বিরোধ তৈরি হলো। বিষয়টি যখন মীমাংসার প্রয়োজন হলো, তখন হজরত আদম (আ.) তাদের কোরবানি করার নির্দেশ দিলেন; যার কোরবানি কবুল হবে, তার দাবিই সঠিক বলে গণ্য হবে।
দুই ভাই কোরবানি নিয়ে হাজির হলো। হাবিল আনলো মোটাতাজা ছাগল, আর কাবিল আনলো এক আঁটি শস্য। এরপর আকাশ থেকে আগুন নেমে এসে হাবিলের কোরবানি গ্রহণ করল। এতে কাবিলের ক্রোধ আরও বেড়ে গেল। সে হাবিলকে বলল, ‘আমি তোমাকে অবশ্যই হত্যা করব, যাতে তুমি আমার বোনকে বিয়ে করতে না পারো।’ হাবিল শান্তভাবে বলল, ‘আল্লাহ তো কেবল মুত্তাকিদের কোরবানিই কবুল করেন।’
কিন্তু ইবনে কাসির (রহ.) এই ঘটনাকে গ্রহণযোগ্য বলেননি। তার মতে হাবিল ও কাবিলের কোরবানি পেশ করার পেছনে কোনো নারী বা বিবাহসংক্রান্ত বিরোধ ছিল না। বরং ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত অন্য একটি ঘটনাকে তিনি ‘গ্রহণযোগ্য’ রায় দেন। সেটি হলো:
সেই আমলে কোরবানির অংশ গ্রহণ করার মতো কোনো মিসকিন বা গরিব মানুষ ছিল না। তাই কেউ কোরবানি পেশ করলে আকাশ থেকে আগুন এসে তা পুড়িয়ে ফেলত। এভাবে কোরবানি কবুল হয়েছে কি না, তা বোঝা যেত। একদিন হাবিল ও কাবিল নিজেরাই বলল, ‘চলো, আমরা কোরবানি করি।’ হাবিল তার সেরা ছাগলটি নিয়ে এল। আর কাবিল কিছু শস্য নিয়ে এলে। এরপর আগুন এসে হাবিলের ছাগলটি গ্রহণ করে নিল, কিন্তু কাবিলের কোরবানি পড়ে রইল।
এতে কাবিলের মনে হিংসা জাগল। সে বলল, ‘তুমি কি সবাইকে বলে বেড়াবে যে তোমার কোরবানি কবুল হয়েছে, আমারটা হয়নি? আল্লাহর কসম, তুমি আমার চেয়ে ভালো হয়ে থাকবে আর মানুষ আমার দিকে (আড়চোখে) তাকাবে, এটা হতে পারে না।’ শেষপর্যন্ত সে হাবিলকে হত্যা করে ক্ষান্ত হয়।
কোরআনের কোনো ঘটনার ব্যাখ্যায় একাধিক বর্ণনা পাওয়া গেলে আয়াতের প্রকাশ্য অর্থের সঙ্গে যে বর্ণনা বেশি মেলে, সেটিকেই প্রাধান্য দেওয়া কোরআন ব্যাখ্যার সঠিক পদ্ধতি। তাই হাবিল-কাবিলের ঘটনাকে নারীর সঙ্গে যুক্ত করার চেয়ে কোরবানি প্রত্যাখ্যাত হওয়া থেকে জন্ম নেওয়া হিংসাকেই তাদের দ্বন্দ্বের মূল কারণ হিসেবে দেখা বেশি সঙ্গত।
সূত্র : জাগোনিউজ