যে শিশুটি একটু আগেও হাসি-আনন্দে ঘর মাতিয়ে রাখত, সে হঠাৎ চুপচাপ হয়ে গেছে। বন্ধুদের সঙ্গে খেলতে চাইছে না, পরিবারের কারো সঙ্গে মন খুলে কথা বলছে না, এমনকি প্রিয় খেলনাটিও আর টানছে না। অনেক অভিভাবক ভাবেন, হয়তো বড় হচ্ছে বলেই এমন পরিবর্তন। কিন্তু শিশুর আচরণে হঠাৎ বদল এলে তার পেছনে কী কারণ রয়েছে, তা বোঝার চেষ্টা করা জরুরি। কারণ, সব সময় মুখে বলতে না পারলেও শিশুর আচরণ দিয়েও প্রকাশ পেতে পারে তার মনের ভেতরের নানা অনুভূতি।
চুপচাপ হওয়ার পেছনে যেসব কারণ থাকতে পারে
শিশুরা সব সময় নিজেদের অনুভূতি গুছিয়ে প্রকাশ করতে পারে না। কোনো ঘটনা তাকে কষ্ট দিলে, ভয় পেলে কিংবা দুশ্চিন্তায় থাকলে সে আগের মতো কথা বলা বা খেলাধুলা করা কমিয়ে দিতে পারে। স্কুলে বন্ধুদের সঙ্গে মনোমালিন্য, সহপাঠীদের ঠাট্টা, পড়াশোনার চাপ কিংবা শিক্ষকের বকুনি-এসব অভিজ্ঞতাও শিশুর মনে প্রভাব ফেলতে পারে।
আবার পরিবারের পরিবেশেও থাকতে পারে কারণ। মা-বাবার মধ্যে ঝগড়া, পরিবারের কোনো সদস্যের অসুস্থতা, নতুন পরিবেশে মানিয়ে নেওয়া কিংবা প্রিয়জনের কাছ থেকে দূরে থাকা শিশুর মনে অস্বস্তি তৈরি করতে পারে। তবে সব শিশুর প্রতিক্রিয়া এক রকম হয় না। কেউ কান্না করে, কেউ রেগে যায়, আবার কেউ চুপচাপ হয়ে নিজের মধ্যে গুটিয়ে নেয়।
শিশুর আচরণে যেসব পরিবর্তন খেয়াল করবেন
শিশু আগের তুলনায় কম কথা বলছে কি না, একা থাকতে চাইছে কি না কিংবা বন্ধুদের সঙ্গে খেলাধুলায় আগ্রহ হারাচ্ছে কি না, খেয়াল করুন। তার ঘুম ও খাওয়ার অভ্যাসে পরিবর্তন এসেছে কি না, স্কুলে যেতে অনীহা দেখাচ্ছে কি না, সহজেই রেগে যাচ্ছে কি না, সেদিকেও নজর দিন।
কখনো কখনো শিশুর মাথাব্যথা, পেটব্যথা বা ক্লান্তির মতো শারীরিক অভিযোগও দেখা দিতে পারে। এসব উপসর্গের নানা কারণ থাকতে পারে। তাই এগুলোকে শুধু মানসিক চাপের লক্ষণ ধরে না নিয়ে প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
মনে রাখতে হবে, একা থাকতে চাওয়া বা কিছু সময় চুপচাপ থাকা সব সময় উদ্বেগের কারণ নয়। শিশুর বয়স, স্বভাব এবং পরিস্থিতি বিবেচনা করতে হবে। তবে আচরণের পরিবর্তন দীর্ঘস্থায়ী হলে, তীব্র হলে কিংবা তার স্বাভাবিক জীবনযাপনে ব্যাঘাত ঘটালে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন।
বকাঝকা না করে কথা বলার সুযোগ দিন
শিশুকে চুপচাপ দেখে বারবার ‘কী হয়েছে?’, ‘কথা বলছ না কেন?’ বলে চাপ দেবেন না। এতে সে আরও অস্বস্তি বোধ করতে পারে। বরং তার পাশে বসুন, একসঙ্গে সময় কাটান এবং শান্তভাবে কথা বলার সুযোগ তৈরি করুন।
বলতে পারেন, ‘তোমাকে আজকাল একটু চুপচাপ লাগছে। তোমার যদি কিছু বলার থাকে, আমি শুনব।’ সে তখনই কিছু বলতে না চাইলে জোর করবেন না। তাকে বোঝান, মন খারাপ হওয়া স্বাভাবিক এবং নিজের অনুভূতি প্রকাশ করার জন্য তাকে বকা দেওয়া হবে না। শিশু কথা বলতে শুরু করলে মাঝখানে থামিয়ে দেওয়া, সঙ্গে সঙ্গে উপদেশ দেওয়া কিংবা তার অনুভূতিকে ছোট করে দেখা এড়িয়ে চলুন। ‘এত ছোট বিষয় নিয়ে মন খারাপ করছ কেন?’ বা ‘এতে আবার কষ্ট পাওয়ার কী আছে?’-এ ধরনের কথায় শিশু নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে নিরুৎসাহিত হতে পারে।
পরিবারের নিরাপদ পরিবেশ শিশুর জন্য জরুরি
শিশুর মানসিক স্বস্তির জন্য পরিবারের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিদিন কিছুটা সময় তার সঙ্গে কাটান। পড়াশোনার পাশাপাশি খেলাধুলা, গল্প করা এবং নিজের পছন্দের কাজ করার সুযোগ দিন। শুধু ভালো ফল বা ভালো আচরণের জন্য নয়, তার অনুভূতি ও চেষ্টাকেও গুরুত্ব দিন।
শিশুর সামনে পারিবারিক বিরোধ হলে পরিস্থিতি অনুযায়ী তাকে আশ্বস্ত করুন। তাকে যেন কোনো সমস্যার জন্য নিজেকে দায়ী মনে করতে না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখুন। স্কুলে কোনো সমস্যা হচ্ছে কি না, প্রয়োজন হলে শিক্ষক বা স্কুল কাউন্সেলরের সঙ্গেও কথা বলুন।
যখন বিশেষজ্ঞের সাহায্য প্রয়োজন
শিশুর মন খারাপ বা চুপচাপ থাকার প্রবণতা দীর্ঘদিন চলতে থাকলে, আগের পছন্দের কাজ থেকে দূরে সরে গেলে, ঘুম-খাওয়ায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এলে কিংবা পড়াশোনা ও দৈনন্দিন জীবনে সমস্যা তৈরি হলে শিশু বিশেষজ্ঞ বা যোগ্য মানসিক স্বাস্থ্য পেশাজীবীর পরামর্শ নিন।
নিজেকে আঘাত করার কথা বললে বা নিরাপত্তা নিয়ে আশঙ্কা তৈরি হলে দ্রুত পেশাদার সহায়তা নেওয়া জরুরি।শিশু হঠাৎ চুপচাপ হয়ে গেলে তাকে জোর করে আগের মতো হাসিখুশি করার চেষ্টা না করে বোঝার চেষ্টা করুন, তার মনের ভেতর কী চলছে। মন দিয়ে শোনা, অনুভূতির প্রতি সম্মান দেখানো এবং প্রয়োজনে সঠিক সহায়তা নেওয়ার মধ্য দিয়েই শিশুর পাশে থাকা সম্ভব।
সূত্র: মিডিয়াম, সাইকোলজি টুডে