Template: 3
Tpl 1 Tpl 2 Tpl 3
অনলাইন ডেস্ক | ২২ অক্টোবর ২০২৬
bijoybangla.news
logo
বিজয় বাংলা নিউজ
জাতীয় দৈনিক

মেয়াদোত্তীর্ণ ট্রলি ব্যবহারে ঝুঁকিতে রেলের কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা

আবুল কালাম আজাদ, রাজশাহী:- Railway officials and employees at risk from using expired trolleys

রেললাইন সচল ও নিরাপদ রাখতে দিনরাত কাজ করেন ওয়েম্যানসহ রেলওয়ের পথ বিভাগের কর্মীরা। রেললাইনের ত্রুটি শনাক্ত, মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম বহন থেকে শুরু করে রেলপথ পরিদর্শন—সব ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ বাহন মোটর ট্রলি। 


এই ট্রলিতে চড়েই রেলপথ পরিদর্শন করেন পথ বিভাগের সুপারভাইজার, ঊর্ধ্বতন উপসহকারী প্রকৌশলী (পিডব্লিউআই) এবং সহকারী প্রকৌশলীরা। কিন্তু ট্রলির চাকা ও কাঠামোর জীর্ণদশা এবং মেয়াদোত্তীর্ণ। ফলে সরঞ্জাম পরিবহন ও ট্রলি যোগে চলাচলে  ঝুঁকির মুখে পড়ছেন রেলওয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। 

চলন্ত অবস্থায় ট্রলি ভেঙে দুর্ঘটনা ঘটছে, আহত হচ্ছেন দায়িত্ব পালনরত কর্মীরা। সম্প্রতি দিনাজপুরের পার্বতীপুর-ফুলবাড়ী-বিরামপুর রেলপথে মোটর ট্রলি ভেঙে পিডব্লিউআইসহ পাঁচজন আহত হওয়ার ঘটনা এ ঝুঁকির বাস্তব চিত্র সামনে এনেছে।


রেললাইন্স সচল রাখতে রেলওয়ের পথ বিভাগের কর্মীদের কাজের বড় একটি অংশই মাঠপর্যায়ে করে থাকেন। রেললাইনের কোথাও ত্রুটি আছে কি না, দুটি রেল সমান স্তরে রয়েছে কি না, জোড়ার আংটা ও নাট-বল্টু ঠিক আছে কি না, রেললাইন বেঁকে গেছে কি না কিংবা স্লিপারের সঙ্গে যুক্ত যন্ত্রাংশে কোনো সমস্যা হয়েছে কি না—এসব নিয়মিত পরীক্ষা করতে হয় তাঁদের। এ কাজে ব্যবহৃত মোটর ট্রলিতে কর্মীদের পাশাপাশি বহন করা হয় ওয়েল্ডিং মেশিন, শাবল, গাইতি, করাত ও কাটিং মেশিনসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম। ফলে ট্রলির চাকা, ফ্রেম ও অন্যান্য যন্ত্রাংশের কার্যক্ষমতা এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।


কিন্তু মাঠপর্যায়ের কর্মীদের অভিযোগ, পুরোনো ও জীর্ণ ট্রলি ব্যবহার করতে গিয়ে তাঁদের প্রায়ই ঝুঁকির মুখে পড়তে হয়। কোনো কোনো ট্রলির চাকা ও কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়ায় চলন্ত অবস্থায় যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দেয়। কখনো ট্রলি বিকল হয়, কখনো ভেঙে পড়ে দুর্ঘটনা ঘটে।এতে ট্রলিচালক, ওয়েম্যান এবং সঙ্গে থাকা কর্মকর্তা-কর্মচারীরা আহত হওয়ার আশঙ্কায় থাকেন। তবে কোন কোন ট্রলির মেয়াদ শেষ হয়েছে, সেগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ কতটা নিয়মিত হচ্ছে এবং দুর্ঘটনার পেছনে যান্ত্রিক ত্রুটি কতটা দায়ী—তা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নাই বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কর্মরত কর্মচারীদের ।


পার্বতীপুরে ট্রলি ভেঙে আহত পাঁচ:-

সাম্প্রতিক দুর্ঘটনাটি ঘটেছে দিনাজপুরের পার্বতীপুর-ফুলবাড়ী-বিরামপুর রেলপথে। ১৪ অক্টোবর বেলা পৌনে ১২টার দিকে ফুলবাড়ী থেকে বিরামপুরের দিকে যাওয়ার পথে ৩৫১/৬-৭ কিলোমিটার এলাকায় আউটার অতিক্রম করার সময় রেল পরিদর্শন মোটর ট্রলিটি ভেঙে যায়। এতে পার্বতীপুর রেলওয়ের ঊর্ধ্বতন উপসহকারী প্রকৌশলী/পথ (পিডব্লিউআই) শেখ আল আমিনসহ পাঁচজন আহত হন।


আহত শেখ আল আমিনকে প্রথমে বিরামপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। অবস্থার অবনতি হলে তাঁকে দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। তাঁর হাত, পা ও কপালে গুরুতর জখম হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। দুর্ঘটনায় আহত অন্য চারজন হলেন ট্রলিম্যান আবু তাহের লিটন, মোস্তাফিজুর রহমান, জিকরুল হক ও হাসান আলী। তাঁদের বিরামপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা দেওয়া হয়।


রেলের হ্যামারম্যান মোস্তাফিজুর রহমানের ভাষ্য অনুযায়ী, নিয়মিত রেলপথের ত্রুটি-বিচ্যুতি অনুসন্ধানের জন্য তাঁদের মোটর ট্রলি নিয়ে বের হতে হয়। ওই দিন ট্রলিটি চলন্ত অবস্থায় হঠাৎ দুমড়েমুচড়ে ভেঙে পড়ে। এতে ট্রলির সামনের দিকে বসা পিডব্লিউআই শেখ আল আমিন রেললাইনের ওপর পড়ে গুরুতর আহত হন এবং জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। ট্রলিতে থাকা অন্যরাও আহত হন।


পার্বতীপুর রেলওয়ের সহকারী নির্বাহী প্রকৌশলী আবু জাফর মো. রাকিব হাসান দুর্ঘটনাটিকে গুরুতর বলে উল্লেখ করেন। আহত প্রকৌশলীকে দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি।


নিরাপত্তা সরঞ্জাম নিয়ে প্রশ্ন:-

রেলপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব যাঁদের, তাঁদের কাজের পরিবেশ ও ব্যবহৃত সরঞ্জামের নিরাপত্তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। ট্রলি ভেঙে দুর্ঘটনা ঘটলে শুধু কর্মীদের জীবন ও শারীরিক নিরাপত্তাই ঝুঁকিতে পড়ে না, রেলপথ পরিদর্শন ও রক্ষণাবেক্ষণের কাজও ব্যাহত হতে পারে। নিয়মিত পরিদর্শনের মাধ্যমে ত্রুটি শনাক্ত করা না গেলে তা পরবর্তী সময়ে বড় ধরনের দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়াতে পারে।


বিশেষ করে ওয়েম্যানদের রেললাইন মেরামতের সরঞ্জাম বহন, দুর্গম এলাকায় যাতায়াত এবং দীর্ঘ সময় মাঠে কাজ করতে হয়। তাঁদের ব্যবহৃত ট্রলি নিরাপদ না হলে কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনার আশঙ্কা থেকেই যায়। একই সঙ্গে পিডব্লিউআই ও অন্যান্য প্রকৌশলীরাও ট্রলিতে বসে রেলপথের বিভিন্ন অংশ পর্যবেক্ষণ করেন। তাই ট্রলির যান্ত্রিক সক্ষমতা যাচাই, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ এবং ঝুঁকিপূর্ণ ট্রলি চিহ্নিত করে ব্যবহার বন্ধ করা জরুরি।


প্রয়োজন নিয়মিত পরীক্ষা ও জবাবদিহি:-

রেলওয়ের মোটর ট্রলিগুলোর বয়স, বর্তমান অবস্থা, মেরামতের ইতিহাস এবং নিরাপত্তা পরীক্ষার নথি পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। যেসব ট্রলির চাকা, ফ্রেম বা অন্য গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ ক্ষতিগ্রস্ত, সেগুলো মেরামত না করে চলাচলে ব্যবহার করা হচ্ছে কি না, তা খতিয়ে দেখা দরকার। পাশাপাশি দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ নির্ধারণে কারিগরি তদন্তের মাধ্যমে ট্রলির যান্ত্রিক ত্রুটি, রক্ষণাবেক্ষণের ঘাটতি কিংবা অন্য কোনো কারণ দায়ী কি না, তা নিশ্চিত করা জরুরি।


রেলওয়ের কর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নিয়মিত কারিগরি পরীক্ষা, সময়মতো যন্ত্রাংশ পরিবর্তন, ত্রুটিপূর্ণ ট্রলি চলাচল থেকে বিরত রাখা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী নতুন ট্রলি সরবরাহের উদ্যোগ নিতে হবে। একই সঙ্গে দুর্ঘটনায় আহত কর্মীদের চিকিৎসা ও কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা-সংক্রান্ত দায়িত্ব পালনে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।


রেললাইন নিরাপদ রাখতে যাঁরা প্রতিদিন ঝুঁকি নিয়ে কাজ করেন, তাঁদের জীবন ও নিরাপত্তা উপেক্ষা করে নিরাপদ রেলব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব নয়। তাই মোটর ট্রলির বর্তমান অবস্থা যাচাই, দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধান এবং প্রয়োজনীয় সংস্কার ও প্রতিস্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া এখন সময়ের দাবি।





© বিজয় বাংলা নিউজ
bijoybangla.news