
একদিকে শোভাযাত্রা, আলোচনা সভা ও দোয়ার আনুষ্ঠানিকতা; অন্যদিকে মহাসড়ক ও আঞ্চলিক সড়কে অব্যাহত প্রাণহানি ও পঙ্গুত্ব। প্রতি বছরের মতো এবারও নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে রাজশাহীতে পালিত হয়েছে ‘জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস’।
তবে সুশীল সমাজ ও বিশেষজ্ঞদের মতে, সড়ক নিরাপত্তার মূল চ্যালেঞ্জগুলো কাগজে-কলমে ও সচেতনতামূলক বক্তব্যে সীমাবদ্ধ থাকায় বাস্তবে মৃত্যুর মিছিল কমছে না।
বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস উপলক্ষে ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ (নিসচা) রাজশাহী জেলা শাখার উদ্যোগে কাজীহাটাস্থ কার্যালয়ে র্যালি, আলোচনা সভা ও দোয়া মাহফিলের আয়োজন করা হয়।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন রাজশাহী চেম্বার অব কমার্সের সহসভাপতি জিয়াউদ্দিন আহমেদ। সভায় সভাপতিত্ব করেন নিসচা জেলা শাখার সভাপতি অ্যাডভোকেট তৌফিক আহসান টিটু। অন্যান্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন সহসভাপতি প্রকৌশলী জুনায়েদ আহমেদ, সাংস্কৃতিক সম্পাদক অ্যাডভোকেট মুন্সি আবুল কালাম আজাদ ও সাংগঠনিক সম্পাদক ডা. আমানুল্লাহবিন আখতার।
সভায় বক্তারা নিরাপদ সড়ক গড়ে তুলতে আইন মান্য করা এবং চালক ও পথচারীদের সচেতনতার ওপর জোর দেন।
বাস্তবতার চিত্র: -
তবে সচেতনতামূলক নানা কর্মসূচির পরও জেলার বিভিন্ন রুটে সড়ক দুর্ঘটনার সংখ্যা কমেনি। সড়ক নিরাপত্তা পর্যবেক্ষক সংস্থা ও স্থানীয় সূত্রে পাওয়া তথ্যে দেখা যায়, অসতর্কতা, লাইসেন্সবিহীন ও অবৈধ যানবাহন চলাচল, বিপজ্জনক বাঁক এবং বেপরোয়া গতির কারণে রাজশাহী ও তার আশেপাশের সংযোগ সড়কগুলোতে প্রতিদিন নিয়ম করে ঘটছে মারাত্মক দুর্ঘটনা।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত এক বছরে রাজশাহী জেলার মহাসড়ক, নগরী ও আন্তঃউপজেলা রুটগুলোতে ২০০টিরও বেশি ছোট-বড় সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে। এসব দুর্ঘটনায় অন্তত ১৬০ থেকে ১৮০ জন মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন এবং আহত হয়েছেন চার শতাধিক মানুষ।
সাম্প্রতিক বড় দুর্ঘটনার চিত্র:
সম্প্রতি ঘটে যাওয়া কয়েকটি বড় দুর্ঘটনার চিত্র বিশ্লেষণ করলে সড়ক ব্যবস্থার ভয়াবহতা স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে:
১৬ অক্টোবর ২০২৬ (রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা): প্রাইভেট কারের চাপায় এক রিকশাচালক নিহত এবং ২ জন গুরুতর আহত হন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ ও জনবহুল এলাকার প্রধান সড়কেই ঘটেছে এ দুর্ঘটনা।
২০ অক্টোবর ২০২৬ (রাজশাহী-নাটোর রুট/বনপাড়া সীমানা): রাজশাহীগামী নৈশকোচের বেপরোয়া গতির কারণে ঘটে ভয়াবহ সংঘর্ষ। এতে ঘটনাস্থলেই মৃত্যু হয় ১৪ জনের এবং আহত হন অন্তত ২৫ জন। আহতদের বড় একটি অংশকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে ভর্তি করা হয়, যেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় বেশ কয়েকজন স্থায়ী পঙ্গুত্বের মুখোমুখি হয়েছেন।
রুট ও এলাকাভিত্তিক প্রাণহানির করুণ চিত্র:-
রাজশাহী-নাটোর মহাসড়ক (পবা, কাটাখালী ও পুঠিয়া অংশ):-
জেলার সবচেয়ে ব্যস্ত ও ঝুঁকিপূর্ণ এই রুটে কাটাখালী, মোল্লাপাড়া, বেলপুকুর, বাইপাস এবং বানেশ্বর বাজার এলাকায় গত এক বছরে প্রায় ৫০ জন প্রাণ হারিয়েছেন। দূরপাল্লার বেপরোয়া গতির বাস ও ইট-বালুবাহী ড্রাম ট্রাকের সাথে সিএনজি ও মোটরসাইকেলের মুখোমুখি সংঘর্ষেই এসব দুর্ঘটনা ঘটেছে।
রাজশাহী-চাঁপাইনবাবগঞ্জ মহাসড়ক (পবা ও গোদাগাড়ী রুট):-
পবার নওদাপাড়া থেকে শুরু করে গোদাগাড়ীর প্রেমতলী ও বিজয়নগর পর্যন্ত এলাকায় গত এক বছরে প্রায় ৪৫ জনের সলিল সমাধি ঘটেছে। অতিরিক্ত গতিতে ওভারটেকিং এবং অদক্ষ চালকদের কারণেই এই রুটে মর্মান্তিক দুর্ঘটনা বাড়ছে।
রাজশাহী মহানগরী ও আরএমপি এলাকা:-
রাজশাহী নগরীর কাজলা, তালাইমারী, চৌদ্দপায়, ভদ্রা মোড় ও বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন প্রধান সড়কে সিএনজি-ইজিবাইক উল্টে এবং মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় প্রাণ গেছে প্রায় ২৫ জনের।
গ্রামীণ ও আন্তঃউপজেলা সড়ক (বাঘা, চারঘাট, তানোর, মোহনপুর ও বাগমারা): -
আঞ্চলিক সংযোগ সড়কগুলোতে অবাধে চলাচলকারী নসিমন, করিমন, ভটভটি ও ইজিবাইকের সাথে কাভার্ডভ্যান ও মিনিবাসের সংঘর্ষে বছরজুড়ে প্রাণ হারিয়েছেন আরও প্রায় ৫০ জন। নিহতদের বড় একটি অংশই শিশু, শিক্ষার্থী ও অসচেতন পথচারী।
হাসপাতাল ও চিকিৎসাসেবার চাপ:-
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালের জরুরি বিভাগ ও অর্থোপেডিকস ওয়ার্ড সূত্র জানায়, প্রতিদিন গড়ে ১৫ থেকে ২০ জন সড়ক দুর্ঘটনায় আহত রোগী হাসপাতালে ভর্তি হন। চিকিৎসকদের মতে, সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণে বেঁচে গেলেও মাথার গুরুতর আঘাত ও অঙ্গহানির কারণে আহতদের মধ্যে বছরে অন্তত ৭০ থেকে ৮০ জন মানুষ স্থায়ীভাবে পঙ্গুত্ববরণ করছেন।
বিশেষজ্ঞ ও সুশীল সমাজের অভিমত:-
সড়ক পরিবহন বিশেষজ্ঞ ও স্থানীয় বিশ্লেষকরা বলছেন, কেবল র্যালি ও আলোচনা সভার আনুষ্ঠানিকতায় সড়ক দুর্ঘটনা কমানো সম্ভব নয়। রাজশাহী-ঢাকা মহাসড়কসহ জেলার অভ্যন্তরীণ রুটগুলোতে আধুনিক গতি নিয়ন্ত্রণ প্রযুক্তি নিশ্চিত করা, ফিটনেসবিহীন ও অবৈধ যানবাহন উচ্ছেদ এবং ট্রাফিক আইনের কঠোর প্রয়োগ ছাড়া এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ অসম্ভব।
নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলনরত স্থানীয় নাগরিকদের দাবি, দিবসভিত্তিক সচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি রাজশাহী জেলার চিহ্নিত দুর্ঘটনাপ্রবণ স্থানগুলো (ব্ল্যাক স্পট) দ্রুত সংস্কার করতে হবে এবং হাইওয়ে ও জেলা পুলিশের টহল ও তৎপরতা আরও জোরদার করতে হবে।