
একসময় যা ছিল গ্রামীণ বাংলাদেশের জীবনধারার অবিচ্ছেদ্য অংশ, কৃষি অর্থনীতির চালিকাশক্তি এবং গ্রামীণ সংস্কৃতির বাহন—সেই কাঠের চাকার ‘গরুর গাড়ি’ আজ শুধুই স্মৃতি।
বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের রাজশাহীর বিস্তীর্ণ বরেন্দ্র এলাকার প্রত্যন্ত অঞ্চলে একসময় গড়ে উঠেছিল মেহগনি ও বাবলার কাঠ দিয়ে গরুর গাড়ির শক্ত কাঠের চাকা—স্থানীয় ভাষায় যাকে বলা হয় ‘পাইহ্যা।’পাইহ্যা তৈরির এক সমৃদ্ধ হস্তশিল্প। তবে আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়ায় যান্ত্রিক পরিবহনের দাপটে হাজার বছরের প্রাচীন এই কারুশিল্প আজ বিলুপ্তির শেষপ্রান্তে।
নবীন প্রজন্মের কাছে গরুর গাড়ি আজ কেবলই জাদুঘরের প্রদর্শনী বস্তু কিংবা ছবির ফ্রেম। এর সাথে সাথে রাজশাহীর গ্রামীণ অর্থনীতি থেকে হারিয়ে যাচ্ছেন এই চাকা তৈরির শেষ প্রজন্মের দক্ষ কারিগররাও।
ঐতিহ্য ও গ্রামীণ সংস্কৃতির প্রধান বাহন:-
বিংশ শতাব্দীর শেষভাগে পর্যন্ত রাজশাহী জেলার পবা, গোদাগাড়ী, তানোর, মোহনপুর ও বাঘাসহ বিভিন্ন উপজেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে গরুর গাড়িই ছিল যাতায়াত ও পণ্য পরিবহনের প্রধান ভরসা।
মাঠ থেকে কৃষকের সোনালী ফসল ঘরে তোলা, খড় বহন করা এবং দূর-দূরান্তের ঐতিহ্যবাহী গ্রামীণ হাটে কৃষিপণ্য পরিবহনের একমাত্র মাধ্যম ছিল এই বাহন।
শুধু পণ্য পরিবহনই নয়, গ্রামীণ বিয়েতে বর-কনে পারাপার কিংবা সামাজিক উৎসবে আত্মীয়র বাড়িতে যাতায়াতের অন্যতম অভিজাত যান ছিল সাজানো গরুর গাড়ি।
মেধা ও পরিশ্রমের অপূর্ব সমাহারে তৈরি হতো ‘পাইহ্যা’।
একটি ঐতিহ্যবাহী গরুর গাড়ির প্রাণকেন্দ্র ছিল এর মজবুত চাকা বা ‘পাইহ্যা’। একজোড়া নিখুঁত চাকা তৈরি করা কেবল একটি কাঠের কাজ ছিল না, এটি ছিল কারিগরি দক্ষতা ও বৈজ্ঞানিক অনুমানের এক অনন্য সমমিশ্রণ।
চাকা বা ‘পাইহ্যা’ নির্মাণের পর্যায়ক্রমিক ধাপ গুলো হচ্ছে,
উপাদান নির্বাচন (কাঠ নির্বাচন),পাইহ্যা তৈরির জন্য সবচেয়ে উপযোগী ও টেকসই উপাদান হলো বাবলা কাঠ। বাবলা কাঠের ঘনত্ব ও স্থায়িত্ব বেশি হওয়ায় তা ভারী চাপ সহ্য করতে পারে।
প্রক্রিয়াজাতকরণ, বাবলা গাছ কেটে নির্দিষ্ট মাপে টুকরো করে কড়া রোদে ১৫ থেকে ২০ দিন শুকিয়ে নেওয়া হতো, যাতে কাঠের আর্দ্রতা কমে কাঠ শক্ত হয়।
নকশা ও সংযোজন,শুকানো কাঠ সুন্দরভাবে ছেঁটে বা কেটে নির্দিষ্ট আকৃতি দেওয়া হতো। চাকার কেন্দ্রবিন্দু বা ‘নাভি’ (হব)-তে ছিদ্র করে চারপাশে ব্যাসার্ধ বরাবর কাঠের শলাকা (Spokes) বসানো হতো।
গোলাকার চাকা গঠন, শলাকাগুলোর চারপাশে আবার কাঠ কেটে নিখুঁত গোলাকার আকৃতি (Rim) দিয়ে তৈরি হতো পূর্ণাঙ্গ পাইহ্যা। পরবর্তীতে চাকার স্থায়িত্ব বাড়াতে এর ওপর লোহার তৈরি এক স্তর বেড়ি বা পাত (Iron Rim) পরানো হতো।
প্রতিটি একজোড়া পাইহ্যা তৈরি করতে একজন দক্ষ কারিগরের ১৫ থেকে ২০ দিন নিবিড় শ্রম দিতে হতো।
যান্ত্রিকতার অভিঘাত,সেকালের গরুর গাড়ি বনাম এককালের আধুনিক পরিবহন।
কালের পরিক্রমায় পল্লি অঞ্চলের কাঁচা পথঘাট এখন পাকা সড়ক ও পিচের রাস্তায় রূপ নিয়েছে। এসেছে ট্রাক্টর, পাওয়ার টিলার, ট্রলি এবং নসিমন-করিমনের মতো দ্রুতগামী যান্ত্রিক বাহন। ফলে সময় ও খরচের হিসাবে পিছিয়ে পড়ে গরুর গাড়ি ও কাঠের চাকা।
ঐতিহ্যবাহী গরুর গাড়ি ও কাঠের চাকার (পাইহ্যা) গতি ও কার্যকারিতা যেখানে ছিল ধীরগতির এবং দৈনিক স্বল্প দূরত্ব অতিক্রম করতে সক্ষম, সেখানে আধুনিক যান্ত্রিক পরিবহন বা ট্রাক্টর-নসিমন খুব দ্রুতগতিতে দীর্ঘ দূরত্বে অধিক ভারী পণ্য বহন করতে পারে।
উৎপাদন ও সময়ের দিক থেকেও আকাশ-পাতাল তফাত; যেখানে একজোড়া পাইহ্যা তৈরিতে একজন দক্ষ কারিগরের ১৫ থেকে ২০ দিন সময় লাগত, সেখানে আধুনিক যুগের যন্ত্রাংশ কারখানায় দ্রুত ও পাইকারিভাবে উৎপাদিত হয়। পরিবেশ ও স্থায়িত্বের বিবেচনায় পাইহ্যা ছিল পরিবেশবান্ধব ও পুনর্ব্যবহারযোগ্য প্রাকৃতিক উপাদান বা বাবলা কাঠের তৈরি, অথচ আধুনিক বাহনগুলো জীবাশ্ম জ্বালানি নির্ভর এবং শব্দ ও ধোঁয়া সৃষ্টিকারী।
গ্রামীণ সমাজে যেখানে ঐতিহ্যবাহী গরুর গাড়ির চাহিদা বর্তমানে শূন্যের কোঠায় নেমে যাওয়ায় তা আজ কেবল জাদুঘর বা প্রদর্শনী নির্ভর হয়ে পড়েছে, সেখানে আধুনিক যান্ত্রিক পরিবহন কৃষিকাজ ও পণ্য পরিবহনে সর্বোচ্চ ও অপরিহার্য স্থান দখল করে নিয়েছে।
সব মিলিয়ে, পাইহ্যা ও গরুর গাড়ি যেখানে আজ বিলুপ্তপ্রায় ও প্রান্তিক লোকশিল্পের খাতায় নাম লিখিয়েছে, সেখানে যান্ত্রিক পরিবহন বর্তমান গ্রামীণ অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
বিলুপ্তির পথে কারিগর ও ভবিষ্যৎ ভাবনা,
আধুনিকতার এই অগ্রযাত্রার কারণে চাকা তৈরির কারিগররা দীর্ঘদিনের এই পৈতৃক পেশা ছেড়ে জীবন জীবিকার তাগিদে দিনমজুরি, কৃষিকাজ বা অন্য পেশায় চলে যেতে বাধ্য হয়েছেন। রাজশাহী অঞ্চলে এখন আর হাতে গোনা কয়েকজন বৃদ্ধ কারিগর ছাড়া নতুন কেউ এই শিল্পে যুক্ত হচ্ছেন না।
সংস্কৃতি বিশ্লেষক ও ইতিহাসবিদদের মতে, কাঠের তৈরি এই ‘পাইহ্যা’ কেবল একটি যানের যন্ত্রাংশ নয়; এটি বাংলাদেশের লোকশিল্প, স্থাপত্য ও গ্রামীণ ঐতিহ্যের এক জলন্ত দলিল। আন্তর্জাতিক ঐতিহ্যের মানদণ্ডে এই হারিয়ে যেতে বসা লোকশিল্প ও কারুশিল্পকে সংরক্ষণ করা অত্যন্ত জরুরি। নতুন প্রজন্ম যাতে নিজেদের শেকড় ও ইতিহাস সম্পর্কে জানতে পারে, সেজন্য দেশের জাতীয় ও আঞ্চলিক জাদুঘরগুলোতে এই পাইহ্যা ও গরুর গাড়ি যথাযথভাবে সংরক্ষণ করার পাশাপাশি লোকশিল্প মেলায় এই কারিগরদের যথাযথ মর্যাদা দেওয়ার জোরালো দাবি উঠেছে।
বরেন্দ্রভূমির যে মাটির পথ একদিন কাঠের চাকার মচমচ শব্দে মুখরিত থাকত, সেই পথ আজ যান্ত্রিক শব্দে মুখর। তবে গ্রামীণ স্মৃতি ও লোকশিল্পের ইতিহাসে ‘পাইহ্যা’ তার নিজস্ব মহিমায় চিরভাস্বর হয়ে থাকবে।