Template: 3
Tpl 1 Tpl 2 Tpl 3
অনলাইন ডেস্ক | ২৮ অক্টোবর ২০২৬
bijoybangla.news
logo
বিজয় বাংলা নিউজ
জাতীয় দৈনিক

বিষাক্ত ভাগাড়ের গ্রাসে রাজশাহী সিটি হাট: জনস্বাস্থ্য ঝুঁকিতে শিক্ষার্থী-ব্যবসায়ী ও স্থানীয় বাসিন্দারা

আবুল কালাম আজাদ, রাজশাহী প্রতিনিধি:- Students, businessmen and local residents at risk of public health

আধুনিক নগরায়ণের যুগে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা যখন উন্নত বিশ্বের নগর পরিকল্পনার অন্যতম চালিকাশক্তি, ঠিক তখন শিক্ষা নগরী,নির্মল বায়ু ও সবুজের শহর খ্যাতি রাজশাহী মহানগরী উপকন্ঠ সিটি হাট সংলগ্ন ১৬ একরের একটি উন্মুক্ত এলাকা পরিণত হয়েছে এক ভয়ংকর ময়লার পাহাড়ে।

দীর্ঘ ২৩ বছর ধরে অপরিকল্পিতভাবে জমা হওয়া বর্জ্যের এই ভাগাড় এখন শুধু পরিবেশই ধ্বংস করছে না, বরং হাজার হাজার শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী ও স্থানীয় বাসিন্দার জীবনকে ঠেলে দিয়েছে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকির মুখে।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে এক দীর্ঘস্থায়ী জনদুর্ভোগ ও জনস্বাস্থ্য বিপর্যয়ের চিত্র।


উন্মুক্ত ভাগাড় থেকে ছড়াচ্ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি ও মরণব্যাধি রোগ:-

প্রায় দুই দশক আগের শহরের উপকণ্ঠের এই এলাকাটি জনবসতিপূর্ণ ও ফাঁকা বিল ও মাঠ ছিলো।কিন্তু নগরীতে জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে নগর সম্প্রসারিত হচ্ছে। ফলে একসময়ের পরিত্যক্ত জায়গাটির আশপাশের এলাকা গুলো জনবহুল জনপদ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সংলগ্ন একটি ব্যস্ত অঞ্চলে রূপ নিয়েছে।


রাজশাহী সিটি করপোরেশনের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিদিন নগরীর প্রায় ৩৫০ টন বর্জ্য ট্রাকে করে এখানে ফেলা হয়। গৃহস্থালির সাধারণ বর্জ্য ও পশুর অবশিষ্টাংশের পাশাপাশি এই ভাগাড়ে ঝুঁকিপূর্ণ চিকিৎসাবর্জ্য (Medical Waste) ফেলারও গুরুতর অভিযোগ রয়েছে।


চিকিৎসাবর্জ্য ও পচা ময়লা পচে বাতাসে সালফাইড, অ্যামোনিয়া ও ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া ছড়াচ্ছে। ফলে স্থানীয় বাসিন্দারা নিউমোনিয়া, হাঁপানি (Asthma), শ্বাসকষ্ট, ত্বকের প্রদাহ এবং দীর্ঘমেয়াদি গ্যাস্ট্রোইনটেস্টাইনাল জটিলতায় আক্রান্ত হচ্ছেন। বিশেষ করে সংলগ্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কোমলমতি শিক্ষার্থীরা প্রতিদিন চরম অস্বাস্থ্যকর ও দুর্গন্ধময় পরিবেশে ক্লাস করতে বাধ্য হচ্ছে, যা তাদের শারীরিক ও মানসিক বৃদ্ধিতে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।



স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের দৃষ্টিভঙ্গি: ‘এটি নীরব মহামারি ডেকে আনছে’:-

এ বিষয়ে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জনস্বাস্থ্য ও রোগতত্ত্ব বিভাগের জ্যেষ্ঠ বিশেষজ্ঞ ডা. মো. জাওয়াদুল হক এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে জানান,

"একটি আবাসিক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সংলগ্ন এলাকায় এভাবে উন্মুক্ত স্থানে চিকিৎসাবর্জ্যসহ হাজার হাজার টন বর্জ্য স্তূপীকৃত রাখা এক প্রকার নীরব মহামারির শামিল।


পচা বর্জ্য থেকে ছড়ানো বায়ুবাহিত রোগ এবং বৃষ্টির পানির সঙ্গে মিশে ভূগর্ভস্থ পানির দূষণ পুরো জনপদের কিডনি রোগ, হেপাটাইটিস ও চর্মরোগের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। জরুরি ভিত্তিতে আধুনিক ইনসিনারেটর স্থাপন এবং বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়ায় এই বর্জ্য অপসারণ করা না হলে এটি বড় ধরনের স্বাস্থ্যবিপর্যয় ডেকে আনবে।"


জীবিকার তাগিদে বিষাক্ত আবর্জনার সঙ্গে লড়াই:-

পরিবেশগত ও স্বাস্থ্যগত এই চরম সংকটের মাঝেও এলাকার বহু প্রান্তিক ও দরিদ্র মানুষ জীবিকার তাগিদে এই বিষাক্ত স্তূপের ওপর নির্ভরশীল। প্রতিদিন সকাল থেকে নারী ও শিশুরা খালি হাতে এই ভাগাড় থেকে প্লাস্টিক, লোহা ও কাচের মতো ভাঙারি সামগ্রী কুড়িয়ে জীবিকা নির্বাহ করে। স্বাস্থ্য সুরক্ষাসামগ্রী বা গ্লাভস ছাড়াই এই বিপজ্জনক বর্জ্য নাড়াচাড়ার কারণে তারা প্রতিনিয়ত নানা সংক্রামক ব্যাধিতে আক্রান্ত হচ্ছেন, যা তাদের স্বাস্থ্যসেবার আওতার বাইরে থেকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে।



কর্তৃপক্ষের বক্তব্য ও স্থায়ী সমাধানের রূপরেখা:-

রাজশাহী সিটি করপোরেশনের প্রধান পরিচ্ছন্নতা কর্মকর্তা শেখ মো. মামুন জানিয়েছেন, দীর্ঘদিন ধরে শহরের বর্জ্য ফেলার ফলে স্থানটি পুরোপুরি পূর্ণ হয়ে গেছে। বর্জ্য ফেলার জন্য বিকল্প নতুন জায়গা খোঁজার পাশাপাশি বর্জ্য প্রক্রিয়াজাতকরণের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে।

তবে পরিবেশবাদীদের মতে, কেবল ভাগাড়টি অন্য কোথাও স্থানান্তর করলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান মিলবে না। এর জন্য প্রয়োজন-বর্জ্য উৎসে পৃথকীকরণ (Source Segregation)।নিরাপদ ও ঢাকা ট্রাকের মাধ্যমে পরিবহন।

রিসাইক্লিং ও বৈজ্ঞানিক উপায়ে সার বা বিদ্যুৎ উৎপাদনে রূপান্তর।বর্ধিত নগরায়ণের এই যুগে সিটি হাটের ময়লার পাহাড় কেবল একটি ভাগাড় নয়, এটি সমগ্র জনপদের স্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য এক প্রচ্ছন্ন অ্যালার্ম বেল। সময়মতো আন্তর্জাতিক মানের বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনা গ্রহণ করা না হলে এই জনপদের স্বাস্থ্যসেবা খাত বড় ধরনের সংকটের মুখোমুখি হতে পারে।



© বিজয় বাংলা নিউজ
bijoybangla.news