রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার খেতুর গ্রামে সনাতন ও বৈষ্ণব ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম বৃহৎ ধর্মীয় উৎসব ঠাকুর নরোত্তম দাসের তিন দিনব্যাপী তিরোভাব তিথি মহোৎসব আনুষ্ঠানিকভাবে সমাপ্ত হয়েছে। আজ শনিবার (৩১ অক্টোবর ২০২৬) দুপুরে দধিভাণ্ড ভঞ্জন, মহাপ্রসাদ বিতরণ ও অশ্রুসজল চোখে দূর-দূরান্ত থেকে আসা ভক্তদের বিদায়ের মধ্য দিয়ে এই মিলনমেলার সাঙ্গ হয়।
প্রতি বছর লক্ষ্মী পূর্ণিমার পাঁচ দিন পর কার্তিক মাসের পঞ্চমী তিথিতে শ্রীপাট খেতুরীধামে এই ঐতিহ্যবাহী উৎসব অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। এবারের উৎসবকে কেন্দ্র করে দেশ-বিদেশের (বিশেষ করে ভারত ও বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলা) লাখ লাখ ভক্তের পদচারণায় মুখরিত হয়ে ওঠে পুরো খেতুর গ্রাম।
গত ২৯ অক্টোবর ২০২৬ (বৃহস্পতিবার) বিকেলে অধিবাস ও ভক্তিমূলক কীর্তনের মধ্য দিয়ে তিন দিনব্যাপী এই উৎসবের সূচনা হয়েছিল। গতকাল ৩০ অক্টোবর ২০২৬ (শুক্রবার) ছিল উৎসবের মূল দিন। এদিন ভোর থেকেই মঙ্গল আরতি, খেতুরীধাম পরিক্রমা ও অষ্টপ্রহরব্যাপী ভাবকীর্তন অনুষ্ঠিত হয়।
উৎসবের দিনগুলোতে ধারাবাহিক ধর্মীয় আচারের অংশ হিসেবে মঙ্গল আরতি, প্রভুপাদ গুরুপূজা, শ্রীমদ্ভাগবত পাঠ এবং নামসংকীর্তনের বিশেষ আয়োজন করা হয়। আজ সমাপনী দিনে দুপুরের পর মহাপ্রসাদ বিতরণের পর বিকেলের দিকে ভক্তরা মহাপুরুষ নরোত্তম দাসের স্মৃতিবিজড়িত এই ধাম ছেড়ে নিজ নিজ গন্তব্যে ফিরতে শুরু করেন।
এই তিরোভাব তিথিকে কেন্দ্র করে স্থানীয় প্রেমতলী ও খেতুরীধাম এলাকা জুড়ে বসেছিল এক বিশাল ঐতিহ্যবাহী গ্রামীণ মেলা। মেলায় বিভিন্ন ধরনের কুটির শিল্প, মাটির তৈরি জিনিসপত্র, ধর্মীয় সামগ্রী, খেলনা এবং মুখরোচক খাবারের দোকানপাটে দর্শনার্থী ও ক্রেতাদের উপচে পড়া ভিড় লক্ষ্য করা গেছে।
উৎসবের সার্বিক সফলতায় সন্তোষ প্রকাশ করে খেতুরীধাম ট্রাস্টি বোর্ডের সম্পাদক শ্যামাপদ সান্যাল বলেন, "দেশ-বিদেশের দূর-দূরান্ত থেকে আসা লাখ লাখ ভক্তের আবাসন, মহাপ্রসাদ ও নিরাপত্তার জন্য ট্রাস্টের পক্ষ থেকে সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। সকলের আন্তরিক সহযোগিতায় অত্যন্ত আনন্দ ও ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে এবারের মহোৎসব সম্পন্ন হয়েছে।"
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির বিষয়ে গোদাগাড়ী মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) সুজন মিয়া জানান, "উৎসবকে কেন্দ্র করে পুরো খেতুরীধাম ও মেলা প্রাঙ্গণে আইনশৃঙ্খলার কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছিল। উৎসবের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পোশাকে ও সাদা পোশাকে পুলিশসহ অন্যান্য নিরাপত্তা বাহিনী সার্বক্ষণিক মোতায়েন ছিল। কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ছাড়াই শান্তিপূর্ণভাবে উৎসব শেষ হয়েছে।"
প্রশাসনিক প্রস্তুতির বিষয়ে গোদাগাড়ী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ইসরাত জাহান জানান, "খেতুরীধামের এই ঐতিহ্যবাহী তিরোভাব মহোৎসব সুন্দর ও নির্বিঘ্ন করতে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সার্বক্ষণিক তদারকি করা হয়েছে। জেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন এবং খেতুরীধাম কমিটির যৌথ সমন্বয়ে পানীয় জল, স্যানিটেশন ও জরুরি স্বাস্থ্যসেবাসহ সব ধরনের প্রশাসনিক সহযোগিতা নিশ্চিত করা হয়েছিল, যার ফলে দূর-দূরান্ত থেকে আসা ভক্তরা স্বস্তিতে উৎসব শেষ করে ফিরে যাচ্ছেন।"
আজ শনিবার বিকেলের পর থেকে খেতুরীধাম প্রাঙ্গণ ফাঁকা হতে শুরু করলেও ভক্তদের মনে রয়ে গেছে আগামী বছর আবারও এই পুণ্যভূমিতে ফিরে আসার আকুলতা।