পদ্মার পাড়ে লাখ লাখ ভক্তের ঢল। চারদিকে , ভজন, আরতি আর প্রার্থনা। কেউ এসেছেন দূরদেশ থেকে, কেউ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত পেরিয়ে। সবার গন্তব্য রাজশাহীর গোদাগাড়ীর ঐতিহাসিক খেতুরীধাম। প্রেম ও ভক্তির সাধক ঠাকুর নরোত্তম দাসের তিরোভাব তিথি উপলক্ষে তিন দিন ধরে এখানে বসেছিল লাখো মানুষের মিলনমেলা।
শনিবার( ৩১ অক্টোবর) ধর্মীয় আচার, কীর্তন ও প্রার্থনার মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে ঐতিহ্যবাহী এ মহোৎসব।
গত বৃহস্পতিবার রাত ৮টায় অধিবাস কীর্তনের মধ্য দিয়ে উৎসবের সূচনা হয়। পরদিন শুক্রবার সকালে নগরসংকীর্তন ও শ্রীল নরোত্তম দাস ঠাকুরের মহাঅভিষেক অনুষ্ঠিত হয়। দিনভর চলে হরিনাম সংকীর্তন, ধর্মীয় আলোচনা ও নানা আধ্যাত্মিক আয়োজন।
ভক্তদের মধ্যে বিনামূল্যে বিতরণ করা হয় প্রসাদ। সন্ধ্যায় ইসকনের ৬০ জন নেতৃবৃন্দের অংশগ্রহণে বিশেষ আরতি ও দামোদর অনুষ্ঠান হয়। রাতে চলে ভজন-কীর্তন ও সাংস্কৃতিক পরিবেশনা। শনিবারও দিনভর নানা ধর্মীয় কর্মসূচি পালিত হয়।
মহোৎসব ঘিরে খেতুরীধাম ও আশপাশের এলাকা পরিণত হয় উৎসবের নগরীতে। বাস, মাইক্রোবাস, ট্রাকসহ বিভিন্ন যানবাহনে আসেন ভক্ত ও দর্শনার্থীরা। অনেকে মন্দির প্রাঙ্গণ ও আশপাশে অস্থায়ীভাবে থাকার ব্যবস্থা করেন। মন্দিরের আশপাশের সড়কে বসে ঐতিহ্যবাহী মেলা। ধর্মীয় উপকরণ, পোশাক, খাবার, গৃহস্থালি সামগ্রী, কারুশিল্প এবং কামার-কুমারের তৈরি পণ্য নিয়ে বসেন ব্যবসায়ীরা। এতে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের মধ্যেও বাড়ে কর্মচাঞ্চল্য।
আয়োজকদের প্রত্যাশা, তিন দিনব্যাপী এ মহোৎসবে বাংলাদেশ, ভারত, নেপালসহ বিভিন্ন দেশ থেকে প্রায় ২০ থেকে ২৫ লাখ ভক্ত ও পুণ্যার্থীর সমাগম হয়েছে। আন্তর্জাতিক কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘের (ইসকন) পক্ষ থেকে প্রায় চার লাখ ভক্তের মধ্যে প্রসাদ বিতরণ করা হয়েছে। পাশাপাশি খাবার, পানীয় জল ও স্যানিটেশনের ব্যবস্থা করা হয়।
খেতুরীধাম গৌরাঙ্গদেব ট্রাস্টি বোর্ডের সম্পাদক শ্যামাপদ সান্যাল বলেছেন, ‘শত শত বছর ধরে ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য ও সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনায় এ মহোৎসব অনুষ্ঠিত হচ্ছে। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের পাশাপাশি মুসলিমসহ অন্য ধর্মের মানুষও সম্প্রীতির টানে এখানে আসেন। সবার সহযোগিতায় এবারও উৎসব সুন্দরভাবে সম্পন্ন হয়েছে।’
গোদাগাড়ীর শ্রীশ্রী রাধা-ব্রজমোহন ইসকন মন্দিরের সাধক সংকীর্তন রাম দাস বললেন, ‘নরোত্তম দাস ঠাকুর জমিদার পরিবারে জন্ম নিয়েও জাগতিক সম্পদ ও ভোগবিলাস ত্যাগ করে আধ্যাত্মিক সাধনায় আত্মনিয়োগ করেন।
বৃন্দাবনে লোকনাথ গোস্বামীর কাছে দীক্ষা নেন এবং জীব গোস্বামীর কাছে শাস্ত্র অধ্যয়ন করেন। পরে খেতুরীতে ফিরে এসে বাংলাসহ বিভিন্ন অঞ্চলে গৌড়ীয় বৈষ্ণব দর্শন প্রচার করেন। তার তিরোধান তিথিতে প্রতিবছর বাংলাদেশ, ভারত, নেপালসহ বিভিন্ন দেশ থেকে ভক্তরা এখানে আসেন। তাঁদের সেবায় ইসকনের পক্ষ থেকে খাবার, পানীয় জল ও স্যানিটেশনের ব্যবস্থা করা হয়।’
গোদাগাড়ীর শ্রীশ্রী রাধা-ব্রজমোহন ইসকন মন্দিরের সভাপতি পার্থসারথি কৃষ্ণ দাস ব্রহ্মচারী বলেছেন, ‘নরোত্তম দাস ঠাকুর প্রেম ও ভক্তির মাধ্যমে মানুষের হৃদয় জয় করেছিলেন। মানুষের মধ্যে কৃষ্ণপ্রেম, মানবতা ও ভক্তির চেতনা জাগিয়ে তুলেছিলেন তিনি। এ কারণে বৈষ্ণব সমাজে তিনি অন্যতম শ্রেষ্ঠ মহাজন হিসেবে শ্রদ্ধার আসনে রয়েছেন। তার তিরোভাব তিথি উপলক্ষে পাঁচ শতাধিক বছর ধরে এ মহোৎসব পালিত হয়ে আসছে। এবারও দেশ-বিদেশের লাখো ভক্ত এতে অংশ নিয়েছেন।’
আয়োজন সফল করতে সহযোগিতা করায় পুলিশ ও প্রশাসনের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান তিনি।
গোদাগাড়ী থানার ওসি মো. সুজন মিয়া বললেন, ভক্ত ও দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে বিভিন্ন বাহিনীর ৬০২ সদস্য মোতায়েনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। পুরো আয়োজন শান্তিপূর্ণ রাখতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সতর্ক অবস্থানে ছিল।
গোদাগাড়ী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইসরাত জাহান বললেন, ঐতিহ্যবাহী এ উৎসব সুন্দর ও শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করতে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছিল। এ কাজে জেলা প্রশাসন ও জেলা পুলিশের সহযোগিতা ছিল।
ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী, ঠাকুর নরোত্তম দাস ১৫৩১ খ্রিস্টাব্দে তৎকালীন গড়েরহাট পরগণার পদ্মাতীরবর্তী গোপালপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। এলাকাটি বর্তমানে রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলায় অবস্থিত। তার বাবা জমিদার কৃষ্ণনন্দ দাস মজুমদার এবং মা নারায়ণী রাণী। সচ্ছল পরিবারে জন্ম নিয়েও তিনি ধর্মসাধনা ও মানবকল্যাণের পথ বেছে নেন। পরবর্তী সময়ে বৃন্দাবনে সাধনা শেষে খেতুরীতে ফিরে আশ্রম প্রতিষ্ঠা করেন।
প্রচলিত বৈষ্ণব ঐতিহ্য অনুযায়ী, ১৬১১ খ্রিস্টাব্দে কার্তিক মাসের কৃষ্ণপক্ষের পঞ্চমী তিথিতে তিনি নিত্যলীলায় প্রবেশ করেন। তার স্মরণেই যুগ যুগ ধরে খেতুরীধামে এ মহোৎসব পালিত হয়ে আসছে।