
সহজলভ্য ও পুষ্টিকর ফলের তালিকায় কলার অবস্থান বেশ ওপরে। সারা বছরই পাওয়া যায় এই ফল।
দাম তুলনামূলক কম হওয়ায় অনেকের প্রতিদিনের খাদ্যতাদলিকায়ও থাকে কলা। এতে রয়েছে পটাশিয়াম, আঁশ, ভিটামিন বি৬, ভিটামিন সি ও কার্বোহাইড্রেট।
এসব পুষ্টি উপাদান শরীরের বিভিন্ন কাজে সহায়তা করে।
অনেকে মনে করেন, প্রতিদিন অন্তত দুটি কলা খেলে শরীরের নানা সমস্যা দূর হয়।
তবে সবার জন্য প্রতিদিন দুটি কলা খাওয়া জরুরি নয়। বয়স, শারীরিক অবস্থা, খাদ্যাভ্যাস ও দৈনন্দিন ক্যালরির চাহিদার ওপর নির্ভর করে কলা খাওয়ার পরিমাণ।
পরিমিতভাবে খেলে এই ফল থেকে যেসব উপকার পাওয়া যেতে পারে, সেগুলো জেনে নেওয়া যাক।
রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে
কলা পটাশিয়ামের ভালো উৎস। শরীরে সোডিয়ামের প্রভাব সামলাতে এবং রক্তনালির স্বাভাবিক কার্যক্রম বজায় রাখতে পটাশিয়াম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। পর্যাপ্ত পটাশিয়াম গ্রহণ উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হতে পারে। তবে শুধু কলা খেলেই রক্তচাপ স্বাভাবিক হয়ে যাবে, এমন নয়। সুষম খাদ্যাভ্যাস ও স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনও জরুরি।
ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে
কলায় রয়েছে আঁশ ও প্রাকৃতিক শর্করা। আঁশযুক্ত খাবার খেলে দীর্ঘ সময় পেট ভরা অনুভূতি থাকতে পারে। ফলে বারবার ক্ষুধা লাগার প্রবণতা কমতে পারে এবং অতিরিক্ত খাবার গ্রহণ এড়ানো সহজ হয়। ওজন নিয়ন্ত্রণের খাদ্যতালিকায় তাই কলা রাখা যেতে পারে। তবে শুধু কলা খেলে ওজন কমে না, এর জন্য প্রয়োজন সুষম খাবার ও নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম।
রক্তস্বল্পতা প্রতিরোধে পরোক্ষ ভূমিকা
রক্তে হিমোগ্লোবিনের মাত্রা কমে গেলে রক্তস্বল্পতা বা অ্যানিমিয়া দেখা দিতে পারে। এতে ক্লান্তি, দুর্বলতা, ফ্যাকাশে ভাব ও শ্বাসকষ্টের মতো উপসর্গ দেখা দেয়। কলায় ভিটামিন বি৬ থাকে, যা হিমোগ্লোবিন তৈরির প্রক্রিয়ায় ভূমিকা রাখে। তবে কলা আয়রনের উল্লেখযোগ্য উৎস নয়। তাই আয়রনের ঘাটতিজনিত রক্তস্বল্পতা প্রতিরোধে শুধু কলার ওপর নির্ভর করা ঠিক নয়। এ ক্ষেত্রে আয়রনসমৃদ্ধ খাবার গ্রহণ জরুরি।
হজমে সহায়তা করে
কলায় থাকা খাদ্যআঁশ অন্ত্রের স্বাভাবিক কার্যক্রম বজায় রাখতে সাহায্য করে। বিশেষ করে কিছুটা কাঁচা বা কম পাকা কলায় রেজিস্ট্যান্ট স্টার্চ থাকে। এটি সহজে হজম না হয়ে বৃহদন্ত্রে পৌঁছায় এবং উপকারী অন্ত্রের ব্যাকটেরিয়ার খাদ্য হিসেবে কাজ করে। ফলে অন্ত্রের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে সহায়ক হতে পারে। ডায়রিয়ার সময়ও কলা খাওয়া যায়। এতে থাকা পটাশিয়ামসহ কিছু পুষ্টি উপাদান শরীরের জন্য উপকারী। তবে ডায়রিয়ায় পানিশূন্যতা পূরণে খাবার স্যালাইনের বিকল্প নয় কলা।
মেজাজ ও ঘুমে ইতিবাচক ভূমিকা
কলায় রয়েছে ট্রিপটোফ্যান নামের একটি অ্যামিনো অ্যাসিড। শরীর এই উপাদান ব্যবহার করে সেরোটোনিনসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ রাসায়নিক তৈরি করে। সেরোটোনিন মেজাজ নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে। এ ছাড়া কলায় থাকা ভিটামিন বি৬ ও ম্যাগনেশিয়াম স্নায়ু ও পেশির স্বাভাবিক কার্যক্রমে সহায়তা করে। তবে কলা খেলেই মানসিক চাপ কমবে বা ঘুমের সমস্যা দূর হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।
ভিটামিন ও খনিজের চাহিদা পূরণে সহায়ক
কলা ভিটামিন বি৬-এর ভালো উৎস। শরীরে প্রোটিনের বিপাক, স্নায়ুতন্ত্রের কার্যক্রম এবং হিমোগ্লোবিন তৈরিসহ নানা কাজে এই ভিটামিন প্রয়োজন। পাশাপাশি কলায় কিছু পরিমাণ ভিটামিন সি থাকে, যা রোগ প্রতিরোধক্ষমতা ও কোষের সুরক্ষায় ভূমিকা রাখে। পটাশিয়াম ও ম্যাগনেশিয়ামের মতো খনিজ উপাদানও শরীরের স্বাভাবিক কার্যক্রম বজায় রাখতে সাহায্য করে।
শরীরে শক্তি জোগায়
কলায় থাকা প্রাকৃতিক শর্করা শরীরের শক্তির উৎস হিসেবে কাজ করে। তাই ব্যায়ামের আগে বা পরে কলা খাওয়া যেতে পারে। এতে থাকা পটাশিয়াম পেশি ও স্নায়ুর স্বাভাবিক কার্যক্রমে সহায়তা করে। পাশাপাশি কার্বোহাইড্রেট শরীরকে প্রয়োজনীয় শক্তি জোগায়। তবে পেশিতে টান বা ক্র্যাম্প হওয়া ঠেকাতে শুধু কলার ওপর নির্ভর করা উচিত নয়; পর্যাপ্ত পানি পান ও সুষম খাবারও প্রয়োজন।
প্রতিদিন দুটি কলা কি সবার জন্য উপকারী?
কলা পুষ্টিকর ফল হলেও সবার জন্য প্রতিদিন দুটি কলা খাওয়ার প্রয়োজন নেই। যাদের রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে হয়, তারা নিজের খাদ্যতালিকা অনুযায়ী পরিমাণ নির্ধারণ করবেন। আবার কিডনির জটিলতায় যাদের পটাশিয়াম গ্রহণ সীমিত রাখতে বলা হয়েছে, তাদের কলা খাওয়ার বিষয়ে চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
পরিমিত পরিমাণে কলা দৈনন্দিন খাদ্যতালিকায় রাখা যেতে পারে। সুস্থ থাকতে একটি নির্দিষ্ট ফলের ওপর নির্ভর না করে নানা ধরনের ফল, শাকসবজি ও পুষ্টিকর খাবার খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তোলাই ভালো।