আর্কাইভ কনভাটার ঢাকা, সোমবার, মে ২৭, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ | ১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১ বঙ্গাব্দ
Logo

ঘূর্ণিঝড় রেমাল

logo

১মার্চই রাজশাহী কলেজে স্বাধীনতার ডাকের সূচনা

Rajshahi College on March 1


ওয়ালিউর রহমান বাবু প্রকাশিত:  ২৬ মে, ২০২৪, ০১:৫৬ এএম

১মার্চই রাজশাহী কলেজে স্বাধীনতার ডাকের সূচনা
১৯৭১ সালের ৩মার্চ দেওয়ালে রক্তদিয়ে লেখা স্বাধীনতার স্লোাগান। ছবি স্বত্ব: বীর মুক্তিযোদ্ধা মজিবর রহমান, সাবেক ডিজিএম,পিএমজি ছবি সংগ্রহ: বীর মুক্তিযোদ্ধা এ্যাডভোকেট মতিউর রহমান

•‘বাংলা স্বাধীন কর-রক্ত স্বাক্ষর’

•রাতের রাজশাহী গেরিলাদের, উড়ল স্বাধীন বাংলার পতাকা

১৯৭১ এর ১মার্চ। রাজশাহী কলেজ থেকে বেরিয়ে বাড়ি যাওয়ার সময় কলেজের সামনে রাস্তার ধারে ড্রেনের উপর হিরুর দোকানে চা খাচ্ছিলেন রাজশাহী কলেজ ছাত্রলীগ নেতা খুরশিদ বিন আলম ও রুহুল আমিন মঞ্জু। তখন দুপুর ১টা, তারা বেতারে শুনলেন পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের ভাষণে পার্লামেন্ট অধিবেশন স্থগিতের কথা।

তারা মুহূর্তেই বুঝে নিলেন কী হতে যাচ্ছে। দেরি না করে কলেজ গেট বন্ধ করে অফিস ভবনের সামনে ছাত্র-ছাত্রীদের জানান রাজনৈতিক পরিস্থিতি। ছাত্রনেতা মঞ্জুর প্রস্তাবে সাধারণ এক ছাত্রের সমর্থনে ছাত্রনেতা খুরশিদ বিন আলম এ সভায় সভাপতিত্ব করেন। তখনো কেউ জানতে পারেনি কী ঘটেছে। সভা হচ্ছে দেখে সেখানে আসতে থাকলেন নেতা ও সাধারণ ছাত্রছাত্রীরা। বক্তব্য দেন তৎকালীণ ছাত্রলীগ নেতা আবদুল কুদ্দুস (সাবেক মন্ত্রী), ছাত্রলীগ নেতা আবদুস সামাদ, মাহফুজুর রহমান খান, ছাত্র ইউনিয়নের নেতা হাবিবুর রহমান টুকু প্রমুখ। কে কোন দলের সে পরিচয় ভুলে গড়ে উঠে বৃহত্তর ঐক্য। ঘোষণা করা হয় ‘আর কোন দফা নেই, এখন এক দফা স্বাধীনতা’। ছাত্রনেতা খুরশিদ বিন আলম স্পষ্ট বলেন পাকিস্তানের সঙ্গে পূর্ব পাকিস্তানের আর থাকা হল না, গভীর ষড়যন্ত্র হয়ে গেছে। কলেজের আশপাশ থেকে সংগ্রহ করা ছোট পাকিস্তানি পতাকাটিতে আগুন লাগানো হল। রাজশাহী কলেজের পতাকাটিও নামিয়ে পুড়িয়ে দেয়া হয়। ক্যান্টনমেন্ট থেকে পাকিস্তানি এক কর্নেল কলেজ অধ্যক্ষের কাছে টেলিফোনে কৈফিয়ত চাইলে অধ্যক্ষ প্রফেসর শামসুদ্দিন ছাত্রনেতা চৌধুরি খুরশিদ বিন আলমকে ডেকে পাঠিয়ে কথা বলেন। চৌধুরি খুরশিদ বিন আলম কোনো কিছুর তোয়াক্কা না করে ছাত্রনেতাদের নেতৃত্বে কলেজ থেকে মিছিল বের হয়ে কোর্টের দিকে যাওয়ার সময় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও অন্যান্য অফিস থেকে পাকিস্তানি পতাকা নামিয়ে পুড়িয়ে দিতে থাকে ছাত্র জনতা। এসপি অফিস, ডিসি অফিসের পতাকাও নামিয়ে ফেলা হয়। জজ কোর্টের পতাকা নামানো ছিল খুবই ঝুঁকিপূর্ণ । এ কাজটি করেন রাজশাহী কলেজের সাহসী ছাত্র নেতা দরগাপাড়ার  সাব্বির আহমেদ মতি। জজ কোর্টের পতাকায় আগুন লাগিয়ে পোড়া কিছু অংশ লাঠিতে লাগিয়ে ছাত্র-জনতার মিছিল বেতার কেন্দ্রের কাছে আসতেই পতাকা ধরে থাকা ছাত্রনেতা চৌধুরি খুরশিদ বিন আলমের দিকে অস্ত্র তাক করে পাকিস্তানি এক সিপাহী। কয়েক সেকেন্ডের জন্য মিছিলটি থমকে যায়। অবস্থা দেখে অনেকেই আশ্রয় নেন প্রাচীরের ধারে। সাহসী চৌধুরি খুরশিদ বিন আলম পোড়ানো পতাকাটি নিয়ে রাস্তায়ই দাঁড়িয়ে রইলেন। সেনাবাহিনীর এক অফিসার সৈনিকটিকে নিবৃত করেন। দৃঢ়তায় ছাত্র-জনতার মিছিল স্লোগানে উত্তাল করে দিয়ে সিএন্ডবি মোড়ে এলে বর্ণালী সিনেমা হলে উর্দু সিনেমা ‘রোড টু সোয়াত’ প্রদর্শন হচ্ছে। মিছিলটি সেখানে গেলে হল কতৃপক্ষ সিনেমাটি প্রদশন বন্ধ করে একত্বতা প্রকাশ করে টিকেটের মূল্য ফেরত দেয়ার সিদ্ধান্ত নেন। সে বিষেয়ে মূল্য না দিয়ে দর্শকরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে যোগ দেন সেই মিছিলে। মিছিলটি ভুবনমোহন পার্কে আসার পর সভা থেকে বলা হয় আর পাকিস্তান জিন্দাবাদ নয়।


পরদিন ছিল হরতাল। ৩মার্চ হরতাল চলাকালে রাজশাহী টেলিফোন অফিসে সেনাবাহিনী দেখে ছাত্রজনতার মিছিল উত্তেজিত হয়ে উঠে। গুলিবিদ্ধ হয়ে এখানে শহিদ হন রাজশাহী শিরোইল হাইস্কুলের শিক্ষার্থী নুরুল ইসলাম খোকা  যে বিষয়টি আজও অজানা, তথ্যদাতা সানডাইল কোচিং সেন্টারের পরিচালক হাসানুর)। আহত হয় কলেজিয়েট হাইস্কুলের শিক্ষার্থী আনোয়ার, লোকনাথ হাইস্কুলের শিক্ষার্থী সিদ্দিক সহ অনেকেই। অজ্ঞাত এক যুবক  তার গুলিবিদ্ধ শরীরের রক্ত দিয়ে গনকপাড়া মোড়ে ততকালীন মুসলিম কমার্শিয়াল ব্যাংকের দেয়ালে লিখেন ‘বাংলা স্বাধীন কর-রক্ত স্বাক্ষর’। আহতদের রক্ত দিতে হাসপাতালে ভিড় বাড়তে থাকে। বিকালে ছাত্র জনতা লক্ষীপুর মোড়ে সেনাবাহিনীর একটি অফিসের (পাকিস্তানের সাবেক যোগযোগ মন্ত্রী সবুর খানের আত্মীয়র বাড়ি) দিকে গেলে অনেকে আহত হন। ভুবনমোহন পার্কে সভা চলাকালে সেনাবাহিনীর গুলিতে সদর হাসপতালের মোড়ে রিক্শা চালক বিসু শহিদ হন। গুলিবিদ্ধ মিষ্টি ব্যবসায়ী ওমর আলী একাই পেট ধরে দৌড়াতে দৌড়াতে হাসপাতালে গিয়ে অজ্ঞান হয়ে যান, গুলিবিদ্ধ হন তার শ্যালক বজলুও। গণকপাড়ার মোড়ে বেতারের গিটারিস্ট নিজামুল হুদা সহ অনেকে গুলিবিদ্ধ হন। সেনাবাহিনীর কারফিউ ও ঝুকি উপেক্ষা করে নিজের শরীরের রক্ত দিয়ে লেখা ‘বাংলা স্বাধীন কর-রক্ত স্বাক্ষর’ দেয়ালের সেই লেখাটি দেখতে জনস্রোত সৃষ্টি হয়। আন্দোলন তীব্র হতে থাকে। পাকিস্তানি সৈন্যরা রাজশাহী কলেজের ছাত্রনেতা চৌধুরী খুরশীদ বিন আলমকে না পেয়ে মুসলিম লীগ সমর্থক খুরশীদ আলমকে ধরে নিয়ে গেলে মুসলিম লীগ নেতা অ্যাডভোকেট আয়েনউদ্দীন তাকে ছাড়িয়ে নেন। ৭মার্চ বঙ্গবন্ধুর দিক নির্দেশনায় অসহযোগ আন্দোলন-প্রতিরোধের প্রস্তুতি শুরু হয়ে যায়। রাজশাহী কলেজ মাঠসহ পাড়া মহল্লায় চলতে থাকে ট্রেনিং। শিক্ষক, আইনজীবী, সাংবাদিক খোলায়াড় লেখক শিল্পীসহ নারী ও অন্যান্যরা কর্মসূচি পালন করতে থাকে। ছোট ছোট শিশুরা ঘর থেকে বেরিয়ে এসে কর্মসূচিতে অংশ নেয়। রাজশাহী কলেজ ছাত্রাবাস বিশ^বিদ্যালয়, ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ, মেডিকেল কলেজে স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের সভা হতে থাকে। ঢাকা থেকে আসেন ছাত্রনেতা মার্শাল মণি ও তার সঙ্গী। এর মাঝে রাজশাহী কলেজ টেনিস গ্রাউন্ডে নিষিদ্ধ ইস্ট পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টি (এমএল) নেতা ফেরদৌসদৌল্লাহ খান বাবলু (শহিদ বীর মুক্তিযোদ্ধা কবি, লেখক) ও স্বাধীন বাংলা ছাত্র সমাজের নেতা মাহফুজার রহমান খানের গোপন বৈঠকের পর কলেজ ইউওটিসির পোষাক, ড্যামি রাইফেল নিয়ে নেয়া হয়। বিভিন্ন ল্যাবরোটরি থেকে রাসায়নিক দ্রব্য সংগ্রহ করে নেয়া হয়। ছাত্র তরুণ যুবকদের কাছে চলে আসে মার্কস, লেনিন, মাওসেতুং, ফিদেল কাস্ত্রো, চেগুয়েভরা, নেতাজী সুভাস চন্দ্র বসু প্রমুখের বিপ্লবী বই। গেরিলারা রাতে বিস্ফোরক ফাটিয়ে পাকিস্তান সেনাবাহিনী ও তাদের সমর্থকদের কাপন ধরিয়ে দিল। রাতের রাজশাহী হয়ে গেলো গেরিলাদের।

২৩মার্চ পাকিস্তান দিবসে স্বাধীন বাংলা পতাকা তোলার সিদ্ধান্ত হলে স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতারা এই সিদ্ধান্তকে সমর্থন দিলে ছাত্রনেতা মাহফুজার রহমান খান সঙ্গী আবদুল করিমকে সঙ্গে নিয়ে ২২মার্চ বোয়ালিয়া থানা পাড়ার একটি বাড়ি থেকে ঢাকা থেকে আসা স্বাধীন বাংলা পতাকার নমুনা ও ইশতেহার সংগ্রহ করে সংগ্রাম পরিষদের নেতা শরীফ উদ্দিনদের দোকান থেকে কাপড় সংগ্রহ করে সাহেববাজারের দর্জি শামসুল হককে দিয়ে পতাকা তৈরি করান। ২৩মার্চ সকালে রাজশাহী কলেজের ছাত্রনেতা জাহাঙ্গীর হোসেন (বীর মুক্তিযোদ্ধা) হাতে তরবারি নিয়ে স্বাধীন বাংলার পতাকা ও কালো পতাকা উড়িয়ে বাদক দলের সাথে জয় বাংলা বাহিনীর নেতৃত্ব দিয়ে জেলা সদরে শোডাউন দেন। এরপর ভুবনমোহন পার্কে পতাকা তুলতে সহযোগিতা দেন আওয়ামীলীগ জেলা ট্রেজারার অবাঙালি নেতা হাফেজ আব্দুস সাত্তার (শহিদ) ও নিষিদ্ধ ইস্ট পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টির (এম. এল) নেতা ফেরদৌসদৌল্লাহ খান বাবলু (শহিদ)। রাজশাহী কলেজ অফিস ভবনে ছাত্রনেতা মাসুদুল হক দুলু মোহম্মদ আলী, মমিনুল হক কাজল, বিমল, আনোয়ারুল হক বাদল পুলিশ লাইনে ডিআইজি মামুন মাহমুদের (শহিদ) সহযোগিতায় পতাকা তোলেন হাবিলদার আতিয়ার রহমান (শহিদ)। শিরোইল এলাকায় রাজনৈতিক কর্মী মনিরুজ্জানের নেতৃত্বে পাকিস্তানি পতাকা নামানোর সময় অবাঙালির গুলিতে আহত হয় অন্য এক অবাঙালি মাহবুব সিদ্দিকী সহ সকলে নিরাপদে ফিরে আসেন। রাজনৈতিক নেতাকর্মী ও ছাত্রনেতাদের নেতৃত্বে মিছিল কোর্ট চত্তরে গেলে জয় বাংলা শ্লোগানে জজ কোর্টে পতাকা তোলেন ছাত্রনেতা আফজাল হোসেন চৌধুরী। আবদুল মান্নান, কাজী নুরুল নবী (শহিদ, নওগাঁ) জাহাঙ্গীর হোসেন, আবদুল মতিন, আবদুল করিম, নুরুল ইসলাম, শরীফ উদ্দীন, ছোট শরীফ পতাকা তুলতে ভূমিকা রাখেন। বিশ^বিদ্যালয় মেডিকেল কলেজে ও পতাকা তোলা হয়।

লেখক মুক্তিযুদ্ধের তথ্য সংগ্রাহক, রাজশাহী।

 


google.com, pub-6631631227104834, DIRECT, f08c47fec0942fa0