সরকারি সুযোগের খোঁজে আদিবাসী ঝরেপড়া তরুণরা ॥ পবা উপজেলায় প্রশাসনের সঙ্গে মতবিনিময় সভা

Indigenous youths fleeing
ছোটন সরদার ২৬ জানুয়ারি ২০২৬ ০৪:৪০ অপরাহ্ন সারা বাংলা
ছোটন সরদার ২৬ জানুয়ারি ২০২৬ ০৪:৪০ অপরাহ্ন
সরকারি সুযোগের খোঁজে আদিবাসী ঝরেপড়া তরুণরা ॥  পবা উপজেলায় প্রশাসনের সঙ্গে মতবিনিময় সভা
রাজশাহীর পবা উপজেলায় অনুষ্ঠিত হলো এক ব্যতিক্রমধর্মী মতবিনিময় সভা।

আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ঝরেপড়া শিক্ষার্থী ও বেকার যুবক-যুবতীদের জন্য সরকারের বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা এখনো অনেকটাই অজানা ও অধরা। তথ্যের অভাব, এবং প্রাতিষ্ঠানিক জটিলতার কারণে তারা অনেক ক্ষেত্রেই পিছিয়ে পড়ছে মূলধারা থেকে। এসব বাস্তবতা সামনে রেখে রাজশাহীর পবা উপজেলায় অনুষ্ঠিত হলো এক ব্যতিক্রমধর্মী মতবিনিময় সভা।

সোমবার (২৬ তারিখ) পবা উপজেলা পরিষদের মিনিহলরুমে এই মতবিনিময় সভার আয়োজন করা হয়। এতে রাজশাহীর পবা উপজেলা সহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকার ঝরেপড়া আদিবাসী শিক্ষার্থী ও দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণার্থীরা অংশ নেন। সভায় সরাসরি অংশ নেন উপজেলা প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তারা।

সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পবা উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) আরাফাত আমান আজিজ। বিশেষ অতিথি ছিলেন সহকারী ভূমি কমিশনার মোহাম্মদ মেহেদী হাসান, উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোহাম্মদ মোতাহার হোসেন, উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মোহাম্মদ হোসেন খান। এছাড়া উপস্থিত ছিলেন আইইডি ফেলো আইপি আন্দ্রিয়াস বিশ্বাস, জাতীয় আদিবাসী পরিষদ রাজশাহী জেলা সাধারণ সম্পাদক মুকুল বিশ্বাস, এইচআরডি আহ্বায়ক ছোটন সরদার, কাজল মার্ডি, এলিনা আগ্নেশ তৃনাসহ বিভিন্ন আদিবাসী সংগঠনের প্রতিনিধিরা।

বেসরকারি প্রতিষ্ঠান আইইডি’র সহযোগিতায় অনুষ্ঠানের আয়োজন করে হিউম্যান রাইটস ডিফেন্ডার্স ফোরাম (এইচআরডি)।

“জানি না বলেই বঞ্চিত হচ্ছি” সভায় অংশ নেওয়া একাধিক তরুণ-তরুণী বলেন, সরকারের শিক্ষা উপবৃত্তি, প্রশিক্ষণ ভাতা, সমাজসেবা অধিদপ্তরের অনুদান কিংবা যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের প্রকল্প সম্পর্কে তারা খুব কমই জানেন। জানলেও কোথায় আবেদন করতে হয়, কী কাগজ লাগে—এসব স্পষ্ট না থাকায় তারা সুযোগ থেকে বঞ্চিত হন।

পবা উপজেলার এক আদিবাসী তরুণ বলেন, “আমি এসএসসি পর্যন্ত পড়েছি, তারপর অর্থের অভাবে পড়াশোনা বন্ধ। এখন শুনি অনেক স্কলারশিপ, ট্রেনিং আছে। কিন্তু আমরা জানিই না কোথায় যাব, কার কাছে যাব।”

একজন নারী প্রশিক্ষণার্থী বলেন, “আমাদের জন্য সেলাই, কম্পিউটার, বিউটিফিকেশন কোর্স আছে শুনেছি। কিন্তু ইউনিয়ন পর্যায়ে কেউ এসব তথ্য দেয় না।”

প্রশাসনের বার্তা: ‘দালালের পেছনে না গিয়ে সরাসরি অফিসে আসুন।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে ইউএনও আরাফাত আমান আজিজ বলেন, “আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জন্য সরকার বিশেষভাবে বিভিন্ন কর্মসূচি চালু রেখেছে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে অনেক সময় দালাল বা মধ্যস্বত্বভোগীর কারণে প্রকৃত উপকারভোগীরা সুবিধা পান না। আপনারা সরাসরি উপজেলা অফিসে আসবেন, আমরা তথ্য ও সহায়তা দেব।

তিনি আরও বলেন,ঝরেপড়া শিক্ষার্থীদের আবার শিক্ষায় ফিরিয়ে আনা এবং যুবকদের দক্ষতা উন্নয়নের মাধ্যমে কর্মসংস্থানের সঙ্গে যুক্ত করাই আমাদের লক্ষ্য।

সহকারী ভূমি কমিশনার মোহাম্মদ মেহেদী হাসান বলেন,ভূমি সংক্রান্ত সমস্যায় আদিবাসীরা সবচেয়ে বেশি ভোগে। জমি নামজারি, খতিয়ান, রেকর্ড সংশোধনে আপনারা ভয় না পেয়ে সরাসরি ভূমি অফিসে যোগাযোগ করবেন।সমাজসেবা কর্মকর্তা মোহাম্মদ হোসেন খান বলেন,প্রতিবন্ধী ভাতা, বয়স্ক ভাতা, অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর অনুদান—এসবের জন্য আলাদা কোটা ও বরাদ্দ আছে। আদিবাসীদের ক্ষেত্রে আমরা অগ্রাধিকার দিই।

মানবাধিকারকর্মীদের দাবি: আলাদা তথ্যকেন্দ্র প্রয়োজন,জাতীয় আদিবাসী পরিষদের জেলা সাধারণ সম্পাদক মুকুল বিশ্বাস বলেন, “সমস্যা হলো তথ্যের। আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জন্য ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ে আলাদা তথ্যকেন্দ্র দরকার, যেখানে সহজ ভাষায় সরকারি সুযোগগুলো জানানো হবে।”

এইচআরডি আহ্বায়ক ছোটন সরদার বলেন, “আমাদের তরুণরা শুধু সুযোগ চায় না, তারা চায় সঠিক দিকনির্দেশনা। আজকের এই সভা তারই একটি সূচনা। আমরা চাই প্রশাসন ও আদিবাসী যুবসমাজের মধ্যে নিয়মিত সংলাপ হোক।ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা,সভা শেষে সিদ্ধান্ত হয়।

প্রতিটি ইউনিয়নে আদিবাসী যুবকদের জন্য তথ্যসভা করা হবে,উপজেলা পর্যায়ে একটি ‘হেল্পডেস্ক’ চালুর উদ্যোগ নেওয়া হবে।

প্রশিক্ষণপ্রাপ্তদের একটি ডাটাবেজ তৈরি করা হবে,আয়োজকদের মতে, এই মতবিনিময় সভা শুধু একটি অনুষ্ঠান নয়, বরং আদিবাসী যুবসমাজকে সরকারি ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করার একটি বাস্তব উদ্যোগ। দীর্ঘদিনের বঞ্চনা ও নীরবতার পর এই সংলাপ নতুন আশার দরজা খুলে দিল বলে মনে করছেন।