শীতের লাল-সবুজ সবজিতে ভরপুর বাজারেও কিনতে গেলে হিসাব মিলেনা
★শীতে সবজির জোগান বেড়েছে, কমেছে দামও
★গত বছরের সঙ্গে দামের ফারাক স্পষ্ট
★ উৎপাদন খরচ বাড়ায় দামে চাপ
★ পরিবহন ও আড়ত খরচের প্রভাব।
মাঠে ফলন ভালো, বাজারে মধ্যস্বত্বভোগীর দাপট,
বাজার নজরদারির ঘাটতিতে ভোক্তার হতাশা।
শীতের সকাল। কাঁচাবাজারে ভিড় আছে, সবজির ঝুড়ি ভরা। ফুলকপি, বাঁধাকপি, লাউ, শিম, গাজর—সবই চোখে পড়ে। বাইরে থেকে দেখলে মনে হয়, শীতের বাজার বুঝি স্বস্তিই ফিরিয়ে এনেছে। কিন্তু দাম জিজ্ঞেস করতেই সেই স্বস্তি মিলিয়ে যায়। শীত এলেও সবজির দামে ফিরেনি গত বছরের মতো স্বস্তি।
প্রতি বছর শীত মৌসুম মানেই সবজির প্রাচুর্য। মাঠে ফলন বাড়ে, সরবরাহ বাড়ে, আর তার সরাসরি প্রভাব পড়ে বাজারে। কিন্তু এবার সেই চেনা চিত্র পুরোপুরি মিলছে না। দাম কিছুটা কমেছে ঠিকই, তবে তা ক্রেতাদের প্রত্যাশার ধারেকাছেও নেই।
রাজশাহীর সাহেব বাজার, কোট বাজার,শালবাগা বাজার,বিনোদপুর বাজার, শিরোইল কাঁচা বাজার ঘুরে দেখা গেছে, গত মাসের তুলনায় সবজির দাম কিছুটা কম। বাজারে এখন ফুলকপি প্রতিটি ৪০ থেকে ৫০ টাকা, বাঁধাকপি ৩০ থেকে ৩৫ টাকা, শিম কেজি ৫০ থেকে ৬০ টাকা, লাউ প্রতিটি ৪০ থেকে ৫০ টাকা এবং বেগুন কেজি ৫০ থেকে ৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
সবজি আছে, সরবরাহেও ঘাটতি নেই। কিন্তু দাম শুনে অনেকেই থমকে যাচ্ছেন। কারণ এই সময়টাতে দাম আরও নিচে নামার কথা ছিল—এমনটাই প্রত্যাশা ছিল সাধারণ মানুষের।
ক্রেতারা বলছেন, ঠিক এক বছর আগেও একই সবজি আরও কম দামে পাওয়া যেত। এবার শীতকালীন সবজির ভরা মৌসুমেও কেজিপ্রতি ১০ থেকে ৩০ টাকা পর্যন্ত বেশি গুনতে হচ্ছে।
সাহেব বাজারে বাজার করতে আসা রুপালী আক্তার বলেন, শীত এলেই ভাবি সবজির দামে একটু স্বস্তি পাব। কিন্তু এবার সেটা হচ্ছে না। বাজারে সবজি আছে, কিন্তু দামের কারণে ইচ্ছামতো কেনা যাচ্ছে না।
বিক্রেতারা বলছেন, দামের এই স্থবিরতার পেছনে মূল কারণ উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি।কোট বাজারের সবজি বিক্রেতা আলম বলেন, মাঠে সবজি আছে, কোনো ঘাটতি নেই। কিন্তু কৃষকের খরচ আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে। সেই চাপ শেষ পর্যন্ত বাজারে এসে পড়ে।
শুধু উৎপাদন নয়, পরিবহন ও আড়ত খরচও দামের ওপর বড় প্রভাব ফেলছে। শ্রমিক মজুরি, ট্রাক ভাড়া এবং আড়তের কমিশন—সব মিলিয়ে সবজির দাম নিচে নামতে বাধা পাচ্ছে বলে জানান সবজি ব্যবসায়ীরা।
ফলন ভালো হলেও সার, বীজ ও কীটনাশকের দাম বেড়েছে। পাশাপাশি মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাবের কারণে মাঠপর্যায়ে কম দামের সুফল ভোক্তা পর্যন্ত পৌঁছায় না।
এছাড়া মাঠে ফলন ভালো, বাজারে মধ্যস্বত্বভোগীর দাপট সবজির দাম না কমার অন্যতম কারন বলে মনে কোরছেন ভোক্তারা।
তবে,কৃষি বিপণন সংশ্লিষ্টদের মতে, সমস্যা শুধু খরচ নয়, বাজার ব্যবস্থাপনাও বড় ফ্যাক্টর।রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড.ইফতিখায়ের আলম মাসুদ বলেন, মাঠে ফলন ভালো হলেও সার, বীজ ও কীটনাশকের দাম বেড়েছে। পাশাপাশি মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাবের কারণে মাঠপর্যায়ে কম দামের সুফল ভোক্তা পর্যন্ত পৌঁছায় না।
তিনি আরো বলেন, কৃষক কম দামে বিক্রি করলেও ভোক্তা পর্যায়ে এসে দাম অনেক বেড়ে যায়। এতে করে শীত মৌসুমেও কাঙ্ক্ষিত দরপতন দেখা যায় না।এছাড়া, বাজারে কার্যকর নজরদারি না থাকায় এই পরিস্থিতি দীর্ঘ হচ্ছে। যার ফলে সরবরাহ পর্যাপ্ত হলেও ব্যবস্থাপনার দুর্বলতায় ক্রেতারা প্রত্যাশিত সুফল পাচ্ছেন না।
সব মিলিয়ে শীতের মৌসুমে বাজারে সবজির রঙ-বেরঙের বাহার সবজির উপস্থিতি চোখে পড়লেও দামের হিসেবে স্বস্তি এখনও অধরা। শীতের সবজি যেন শুধু দেখার, কিনতে গেলে হিসাব কষতেই হচ্ছে বেশি। ফলে শীত এলেও সবজির বাজারে স্বস্তির অপেক্ষা এখনও শেষ হয়নি।