বাংলাদেশ পুলিশ জনগণের জন্য নয়!
গত কয়েকদিন ধরে লক্ষ্য করা যাচ্ছে, সাধারণ মানুষের মধ্যে বাংলাদেশ পুলিশের প্রতি আস্থা দ্রুত কমে যাচ্ছে। এই আস্থা সংকট হঠাৎ করে তৈরি হয়নি; বরং দীর্ঘদিনের অনিয়ম, ব্যর্থতা ও জবাবদিহিতার অভাব থেকে এটি গড়ে উঠেছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী হিসেবে পুলিশের মূল দায়িত্ব জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। কিন্তু বাস্তবে বহু ঘটনায় সেই দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার চিত্রই বেশি স্পষ্ট হচ্ছে।
প্রায় এক মাস আগে রাজনৈতিক নেতা ওসমান হাদি গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন। এটার জন্য ইনকিলাব মঞ্চে যারা ছিলো তারা আন্দোলন করে যাচ্ছে। একটি চাঞ্চল্যকর ও জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট হত্যাকাণ্ডের বিচার এখনো দৃশ্যমান নয়। তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে জনগণকে স্পষ্ট কিছু জানানো হয়নি। এই ধরনের ঘটনায় পুলিশের নীরবতা ও ধীরগতি জনগণের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই সন্দেহ ও হতাশা তৈরি করে। মানুষ প্রশ্ন তোলে পুলিশ কি আদৌ নিরপেক্ষভাবে কাজ করছে, নাকি প্রভাবশালীদের চাপেই ন্যায়বিচার থমকে যাচ্ছে?
শুধু এটা নয় হত্যা, চুরি, ডাকাতি এগুলো অনেক অংশ বেড়ে গেছে। কিন্তু পুলিশ নীরব ভূমিকা পালন করছে। এতে জনগণ জানমালের ক্ষতি হচ্ছে। এভাবে চললে মনে হয় দেশের পুলিশ কোনো কাজে আসবে না। তখন আর্মি মোতায়েন করা লাগতে পারে। কয়েকদিন আগে আমার এক পরিচিত লোকের মোবাইল চুরি হয়ে গেছে। পরে সে জিডি করছে এবং এসআই বলছে সে নাকি এই বিষয় দেখবে। তার ঠিক ২ দিন পর তার ফোন অনলাইনে ট্র্যাক করে মিরপুর ১ পাওয়া গেছে। এই কথা পুলিশকে জানানো হলেও পুলিশ কোনো তদন্ত করে নাই। এই হচ্ছে আমাদের দেশের পুলিশের বর্তমান অবস্থা।
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণ অভ্যুত্থানের পর পুলিশের প্রতি অনাস্থা আরও গভীর হয়েছে। ঐ সময় অনেক ঘটনায় পুলিশের ভূমিকা ছিল বিতর্কিত। কোথাও অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ, কোথাও আবার নিষ্ক্রিয়তা দুই মিলিয়ে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা বোধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আন্দোলন-পরবর্তী সময়ে পুলিশ দাবি করেছে যে তারা জনগণের আস্থা ফেরাতে কাজ করছে। কিন্তু বাস্তবে প্রতিটি নতুন ঘটনায় সেই প্রচেষ্টা প্রশ্নের মুখে পড়ছে।
পুলিশের আস্থা ফিরে পেতে হলে শুধু প্রচারমূলক বক্তব্য বা আনুষ্ঠানিক আশ্বাস যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন কার্যকর পদক্ষেপ। অপরাধের দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত, দোষীদের শাস্তি নিশ্চিত করা, এবং প্রতিটি ঘটনায় স্বচ্ছতা বজায় রাখা—এই তিনটি বিষয়ই আস্থা পুনর্গঠনের মূল ভিত্তি। কিন্তু যখন বড় অপরাধের বিচার ঝুলে থাকে, তখন জনগণের মনে এই ধারণাই শক্ত হয় যে পুলিশ আসলে জনগণের জন্য কাজ করছে না।
নির্বাচনের প্রাক্কালে এই আস্থা সংকট আরও উদ্বেগজনক। একটি সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন আয়োজনে পুলিশের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু জনগণ যদি পুলিশের ওপরই ভরসা না করতে পারে, তাহলে নির্বাচনের সময় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি কীভাবে নিয়ন্ত্রিত হবে এই প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই সামনে আসে। মানুষ দ্বিধা দ্বন্দ্বে পড়ে যায়, পুলিশ আদৌ নিরপেক্ষ থাকবে কি না।
সবশেষে বলা যায়, বাংলাদেশ পুলিশ যদি সত্যিই জনগণের জন্য কাজ করতে চায়, তাহলে তাদের আচরণ ও কর্মকাণ্ডেই তার প্রমাণ দিতে হবে। জনগণের আস্থা কোনো উপহার নয়, এটি অর্জন করতে হয়। ন্যায়বিচার, জবাবদিহিতা ও মানবিক আচরণের মধ্য দিয়েই পুলিশ আবারও জনগণের পুলিশ হয়ে উঠতে পারে। না হলে “বাংলাদেশ পুলিশ জনগণের জন্য নয়” এই ধারণা আরও গভীরভাবেই সমাজে গেঁথে যাবে।