ইতিহাসবিদ সাংস্কৃতিক অনুরাগী ব্যক্তিত্ব এ্যাডভোকেট অক্ষয় কুমার মৈত্রেয় প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলী
তখন অবিভক্ত বাংলা। অখণ্ড ভারতের পশ্চিম বাংলার নদীয়া জেলার শিমুলিয়া গ্রামে ১৮৬১ সালের ১ মার্চ ইতিহাসবিদ অক্ষয় কুমার মৈত্রেয় জন্ম গ্রহণকরেন । তার ৯৬ তম মৃত্যু বার্ষিক ১০ ফেব্রুয়ারী। বাবা মথুরাম মৈত্রেয় মা সৌদানিয়া দেবীসংস্কৃতিক পণ্ডিত বদ্যনাথের মেয়ে। অক্ষয় কুমার মৈত্রেয় স্কুলে অধ্যয়ন কালেইছিলেন প্রতিভাবান। তৎকালীন এপার বাংলা কুষ্টিয়ার কুমারখালি, কাঙ্গাল হরিনাথ প্রাইমারি স্কুলে অধ্যায়নের সময় পরিবারের সাথে রাজশাহীতে চলে এসে ভর্তি হোন রাজশাহী বোয়ালিয়া স্কুলে(কলেজিয়েট স্কুল) ইংরেজি চর্চার উপর তার আগ্রহ থেকে তিনি যখন ক্লাস সেভেন এর শিক্ষার্থী তখন ইংরেজ কবি গ্রে'র লেখা 'এলজি'র বাংলা অনুবাদ করে সকলকে তাক লাগিয়ে দিলে সাড়া পড়ে যায়। তিনি পেয়ে যান পরিচিতি পরিক্ষাতে ১ম স্থান অধিকার করে বৃত্তিপান ১৫ টাকা। লিখেন 'বঙ্গবিজয়' গ্রন্থ পেয়ে যান ভবিষৎ প্রতিভাবান উজ্জল ব্যক্তিত্বের আভাষ। রাজশাহী কলেজ থেকে ঢলে যান ওপার বাংলা কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজে। সেখানে কৃতিত্ব দেখিয়ে পান ২০ টাকা বৃত্তি ছড়িয়ে পড়তে থাকে তার প্রতিভার বিকাশ। কলেজ শিক্ষার্থী হয়েও ইতিহাস চর্চায় হয়ে উঠেন অনণ্য ব্যাক্তিত্ব হঠাৎ করে সকল কে অবাক করে চলে আসেন এপার বাংলায় রাজশাহী কলেজে। এখানে শেষ করেন তার শিক্ষা জীবন। এই ইতিহাস বিদ বৃটিশ ইতিহাসবিদ গ্রীণ ল্যান্ড মন্তব্য খণ্ডন করে 'গোলাম হোসেন' গ্রন্থে তার জ্ঞান গর্ভে কথা উৎত্থাপন করেন। যা নিয়ে বিশ্ব কবি রবিন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন অক্ষয় কুমার মৈত্রেয় পাঠক সমাজের মাঝে ইতিহাস পড়তে আগ্রহ সৃষ্টি করে। অক্ষয় কুমার মৈত্রেয় এর লেখা সিরাজদৌল্লা, মির কাশেম গ্রন্থ নিয়ে রামেষ চন্দ্র মজুমদার বলেন তার লেখা গুলো বিজ্ঞান সম্মত ও ব্যতিক্রম। সীতারাম ও গৌড়ের কথা লিখে অক্ষয় কুমার মৈত্রেয় পেয়ে যান আরো প্রশংসা। লেখালেখি গবেষণা মূলক কর্মকাণ্ড ছাড়া জনসেবা ও সংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ছিলেন জড়িত। তার চেষ্টায় সংস্কৃত ভাষায় মঞ্চস্থ হয় "শকুনতলা" ও "দেবী সংহার"। তৎকালীন বৃটিশ সরকারের ছোট লাট তার প্রতিভার প্রশংসা করেন। তিনি তৎকালীন রাজশাহী পৌরসভা, রাজশাহী কলেজ পরিচালনা পরিষদ, জেলা বোর্ড, ইন্ডিয়ান এসোসিয়েশন, বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ, লোকাল বোর্ড, ছাত্র সভা, জাতীয় মহা সমিতির রাজশাহী শাখার সাথে যুক্ত থেকে ভূমিকা রাখেন। ১৮৯৭ সালে রাজশাহীতে রেশম শিল্প বিদ্যালয় ও ১৯১০ সালে শরৎ কুমার রায়ের উদ্দ্যেগে প্রতিষ্ঠিত বরেন্দ্র অনুসন্ধান সমিতি গঠনে বিশেষ ভূমিকা রাখার জন্য তাকে কৈসর-ই-হিন্দ ও সি আই-ই উপাধী দিয়ে আর্ন্তজাতিক সম্মানে ভূষিত করে। তার সাথে পরিচিত হয় আরেক প্রতিভাবান ব্যক্তিত্ব রাজশাহী কলেজের শিক্ষার্থী সাংস্কৃতিক পণ্ডিত পঞ্চকবির একজন উৎসব রাজ রজনীকান্ত সেনের সাথে। অক্ষয় কুমার মৈত্রেয় তাকে তার প্রতিভা বিকাশে সহযোগিতা করে তার "বাণী" গ্রন্থটি প্রকাশে প্রেরণা যোগান। অক্ষয় কুমার মৈত্রেয় বিশিষ্ট আইন জীবি হিসেবে ভূমিকা রাখেন। ১৯২৯ সালের ডিসেম্বর মাসে রাজশাহী হোসেনীগঞ্জ পাড়ায় মসলিম ক্লাব গঠন অনুষ্ঠানে কলকাতা থেকে আমন্ত্রিত হয়ে আসা বিপ্লবী কবি কাজী নজরুল ইসলাম তিন দিনের সফরে শেষ দিন ঘোড়ামাড়াস্থ পাড়ায় অক্ষয় কুমার মৈত্রেয় বাড়িতে গেলে দুইজন আবেগে আপ্লুত হয়ে যান। অক্ষয় কুমার মৈত্রেয়ের প্রতি কাজি নজরুল ইসলামের শ্রদ্ধার কমতি ছিল না। আলাপ চারিতার পর কাজি নজরুল ইসলাম বিদায় নেবার সময় অক্ষয় কুমার মৈত্রেয় তাকে আশির্বাদ করেন। তার আশির্বাদ নিয়ে কবি কলকাতায় যাওয়ার জন্য নাটোর রওনা হন।
১৯৩০ সালের ১০ ফেব্রুয়ারী উপমহাদেশের প্রখ্যাত অক্ষয় কুমার মৈত্রেয় এর জীবনাবসান ঘটে। রাজশাহীর গর্ব ইতিহাসবীদ অক্ষয় কুমার মৈত্রেয় পরিবারের সাথে রাজশাহী নগরীর ঘোড়ামাড়া পাড়ায় বসবাস করতেন তাকে স্বরণীয় করে রাখতে ভবনটির নাম তার নামে নামকরণে দাবি উঠে তবে তা ছিল খুবই ধীরগতির ফলে তা হয়নি বর্তমানে ভবনটি ডাকবিভাগের। রাজশাহী বরেন্দ্র জাদুঘর নিয়ে তার ব্যাপক ভূমিকা থাকায় বরেন্দ্র জাদুঘরের সামনের রাস্তাটি তার নামে নামকরণ করা হয়। কিন্তু সেই নাম ফলকটি ভেঙ্গে ফেললে প্রতিবাদ হলেও কোন কাজ হয়নি। তার জন্ম, মৃত্যু দিবসে বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘর অনুষ্ঠানের আয়োজন করে থাকে। এছাড়াও রাজশাহী থিয়েটার সেমিনার, সম্মাননা স্বারক প্রদান নাট্য অনুষ্ঠানের আয়োজন করে ।
তথ্য সূত্র : প্রফেসর ড. কাজী মোস্তাফিজুর রহমান, পরিচালক বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘর, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় “রাজশাহীর প্রতিভা”, গবেষক মাহাবুব সিদ্দিকি, নিতাই কুমার সরকার রাজশাহী থিয়েটার।
লেখক : তথ্যসংগ্রাহক, সামাগিক ও সাংস্কৃতিকর্মী, রাজশাহী।